শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মোহনগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি বন্ধ দেড়যুগ, গায়েব বাদ্যযন্ত্র-বরাদ্দের টাকা

জেলা প্রতিনিধি, নেত্রকোনা
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৯ পিএম

শেয়ার করুন:

মোহনগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি বন্ধ একযুগ, গায়েব বাদ্যযন্ত্র-বরাদ্দের টাকা
দীর্ঘ বছর ধরে তালাবদ্ধ মোহনগঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি। ছবি- ঢাকা মেইল

একসময় বিকেল হলেই জমে উঠত গান, তবলা, আবৃত্তি ও নাটকের চর্চা। পলাশ-শিমুল, মুক্তস্বর, মুকুল ফৌজ, অনির্বাণসহ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীদের পদচারণে মুখর থাকত নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গন। কে নতুন কিছু করবে, কার আয়োজন ভালো হবে- এ নিয়ে সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিল প্রতিযোগিতা।

কিন্তু সেই মোহনগঞ্জে এখন অনেকটাই নীরবতা। প্রায় দেড়যুগ ধরে কার্যত বন্ধ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম। একসময় একাডেমিতে থাকা হারমোনিয়াম, কিবোর্ড, তবলা ও অন্যান্য বিপুল পরিমাণ বাদ্যযন্ত্রের এখন হদিস নেই। কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে- তা জানেন না বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও (ইউএনও)।

শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়, শিল্পকলা একাডেমির নামে বিভিন্ন সময়ে আসা সরকারি বরাদ্দ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট একজনের অভিযোগ, প্রতিবছরের বরাদ্দের টাকা তুলে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশির দশকে ‘শিল্পকলা পরিষদ’ নামে মোহনগঞ্জে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের যাত্রা শুরু হয়। উপজেলা পরিষদের একটি হলরুমের জন্য বরাদ্দ ছিল। পদাধিকার বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন সভাপতি। একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিকে করা হতো সাধারণ সম্পাদক। পরে এটি উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে রূপ নেয়।

Locked_Mohanganj_Upazila_Shilpakala_Academy_1
দীর্ঘ  বছর ধরে বন্ধ মোহনগঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি। ছবি- ঢাকা মেইল

নব্বইয়ের দশকে মোহনগঞ্জে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিল বেশ প্রাণবন্ত। বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগেও চলত গান, তবলা, হারমোনিয়াম, নাটক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদেরও এসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হতো।

গান, তবলা ও হারমোনিয়াম শেখানোর জন্য অমল সরকার, রুকনুজ্জামান, আরিফাসহ কয়েকজন প্রশিক্ষকও ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। একপর্যায়ে ২০১০ সাল থেকে প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় শিল্পকলা একাডেমির কর্মকাণ্ড।

একাডেমির চালুর উদ্যোগও থমকে

শিল্পকলা একাডেমি ও স্থানীয় শিল্প সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আশি-নব্বইয়ের মোহনগঞ্জ ছিল শিল্প সংস্কৃতির চর্চায় সমৃদ্ধ উপজেলা। শহর কেন্দ্রিক এ চর্চা আরও জমজমাট ছিল। বিভিন্ন দিবস ঘিরে নানা সংগঠনের সাংস্কৃতিক আয়োজন নজর কাড়তো সকলের। সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন আবার শিল্পকলা একাডেমির সাথে যুক্ত ছিল।

২০০০ সালের পরে সেই ধরায় ধীর গতি চলে আসে। নানা কারণে ২০১০ সালে একেবারে স্তিমিত হয়ে যায় শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম। সেইসাথে শিল্প সংস্কৃতির চর্চাও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এর নানা কারণ থাকলেও এজন্য সংশ্লিষ্টরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাকেই দায়ী করেছেন।

তবে ২০১৮-১৯ সালের দিকে শিল্পকলা একাডেমি আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। সেসময় একটি আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অমল সরকারকে আহ্বায়ক করা হয়। শিক্ষার্থী ভর্তি করার জন্য ফরমও ছাড়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন: সুস্থ সংস্কৃতির ধারা ফেরাতে কাজ করছে সরকার: সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

একাডেমির প্রশিক্ষক অমল সরকার বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে তাঁরা শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম চালু করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি। শিল্পকলা একাডেমির কমিটি গঠনের পদ্ধতিতেও সমস্যা রয়েছে ‘

অমল সরকার বলেন, ‘ইউএনও সভাপতি, আর একজন সরকারি কর্মকর্তা সদস্যসচিব। তাঁরা শিল্পী বা শিক্ষার্থীদের কতটা চেনেন? সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালাতে হলে স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা দরকার।’

বারহাট্টাসহ অন্য কিছু উপজেলায় স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিটি করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেখানে কার্যক্রম ভালো হচ্ছে।’

কোথায় গেল একাডেমির এত বাদ্যযন্ত্র?

একসময় মোহনগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে ছিল বেশ কিছু দামি বাদ্যযন্ত্র। হারমোনিয়াম, কিবোর্ড, তবলা ছাড়াও বিভিন্ন সরঞ্জাম ছিল। বিভিন্ন সরকারের সময়ে শিল্পকলা একাডেমির জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দও এসেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু এখন এসবের কোনো হদিস নেই।

অমল সরকার বলেন, ‘কোন বাদ্যযন্ত্র কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে- কেউ জানে না। অনেক কিছু এখানে-সেখানে পড়ে থেকে নষ্ট হয়েছে। কিছু জিনিস কেউ কেউ বাড়িতে নিয়ে গেছেন বলেও শুনেছি। ইউএনওর প্রশাসনিক ভবনের পরিত্যক্ত মালামালের গুদামে কিছু বাদ্যযন্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে।’

তার দাবি, একাধিকবার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ‘চালুর চেষ্টা’ করেও সফল হননি তিনি।

একাডেমির বরাদ্দের টাকা গেল কোথায়?

শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও বিভিন্ন সময়ে এর নামে সরকারি বরাদ্দ এসেছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সেই টাকা কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত শিল্পকলা একাডেমির কক্ষে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সূর্যমুখী থিয়েটার। ৫ আগস্টের পর সংগঠনটি ওই কক্ষ ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়।

আরও পড়ুন: মিশিগানে বাংলা সংস্কৃতি কেন্দ্র, একখণ্ড বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়

সূর্যমুখী থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম পিয়াস বলেন, ‘বর্তমানে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বন্ধই বলা যায়। আগে কবি রইস মনরমের বাসায় সাপ্তাহিক সাংস্কৃতিক আয়োজন হতো। সেটিও এখন অনেকটা কমে গেছে। তিনি নিজের বাসায় স্বল্প পরিসরে সাংস্কৃতিক চর্চার আলোটা ধরে রেখেছেন।’

সেই দিন ফেরাতে চান সংস্কৃতিজনেরা

হাওরাঞ্চলের কবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক রইস মনরম বলেন, ‘একসময় মোহনগঞ্জ শিল্প-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ ছিল। অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পীর চর্চায় মুখর থাকত শহরটি। সময়ের ব্যবধানে সেই পরিবেশ হারিয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আগের সেই সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অঙ্গন আবার দেখতে চাই। তরুণদের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা দরকার। এতে তাদের মনের বিকাশ ঘটবে, মানবিক মূল্যবোধ তৈরি হবে। পাশাপাশি খেলাধুলার সুযোগও বাড়াতে হবে। সাংস্কৃতিক চর্চা ও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকলে তরুণেরা মাদক থেকেও দূরে থাকবে।’

একাডেমির এক সময়ের প্রশিক্ষক অমল সরকারও মনে করেন, নতুন প্রজন্মকে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে সাংস্কৃতিক চর্চার বিকল্প নেই।

এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ভাষায়, ‘মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে বাঁচাতে হলে দ্রুত শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম চালু করা দরকার।’

একাডেমির সম্পর্কে জানেন না ইউএনও

মোহনগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমির বিপুল বাদ্যযন্ত্রের হদিস ও বরাদ্দের টাকার বিষয়ে কিছুই জানেন না উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা খাতুন।

তিনি বলেন, শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। আগের কার্যক্রম সম্পর্কে তার বিস্তারিত জানা নেই। বাদ্যযন্ত্রসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কোথায় আছে, সেটিও তিনি জানেন না।

আরও পড়ুন: মুন্সিগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমির বেহাল দশা, সাংস্কৃতিক চর্চা স্থবির

ইউএনও বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সারা দেশেই শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর আগে প্রতিবছর শিল্পকলা একাডেমির জন্য সরকারি বরাদ্দ আসত। সেই টাকা কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।’

তিনি জানান, কিছুদিনের মধ্যে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম চালু করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চিঠি আসার কথা রয়েছে।

একাডেমি বন্ধের মধ্যেও নতুন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ

এদিকে উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমি ও শিল্প ও সাংস্কৃতিক চর্চা বন্ধ থাকলে ২০২৩ সালে শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।

৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সোয়া দুই একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে তিন তলা বিশিষ্ট একাডেমি ভবন, মিলনায়তন, একটি জাদুঘর, ৩১০ সিটের মাল্টিপারপাস কনফারেন্স হল এবং মুক্তমঞ্চ রয়েছে।

রবীন্দ্রসংগীতের প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি চর্চার উদ্দেশ্যে এটি করা হলেও নির্মাণের তিন বছর পার হলেও আজ পর্যন্ত সেখনে একটি আয়োজনও করা যায়নি। পড়ে আছে তালাবদ্ধ হয়ে।

মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রাণ ফেরার আশা

স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রত্যাশা, শুধু একটি কমিটি গঠন বা সরকারি বরাদ্দ দেওয়ার মধ্যেই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও তরুণদের সম্পৃক্ত করে নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করা হবে। এতে একসময়কার সমৃদ্ধ মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আবারও প্রাণ ফিরবে।

আরও পড়ুন: সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে মননশীল সমাজ গড়ার আহ্বান মন্ত্রীর

একসময় যে প্রতিষ্ঠানটি মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ছিল, সেটি এখন কার্যত নিষ্ক্রিয়। তাই হারিয়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্র ও আগের বরাদ্দের হিসাবের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- কবে আবার শিশু-কিশোর ও তরুণদের পদচারণে মুখর হবে মোহনগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি?

প্রতিনিধি/এএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর