করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর সময় বন্ধ হয়ে যায় ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী রেলস্টেশন। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন রুটে রেল যোগাযোগ চালু হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও স্টেশন দুটিতে আগের মতো যাত্রীসেবা ফেরেনি। ফলে স্টেশন দুটি এখন অনেকটাই অচল।
একসময় ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী স্টেশনে টিকিট কাউন্টারের সামনে থাকত দীর্ঘ সারি। প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকতেন নানা বয়সী মানুষ। কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের যাতায়াতের অন্যতম সহজ ও সাশ্রয়ী মাধ্যম ছিল রেল।
এখন স্টেশন আছে, প্ল্যাটফর্ম আছে, আছে স্টেশন ভবন ও রেললাইনের অবকাঠামো। কিন্তু নেই যাত্রীদের কোলাহল, টিকিট বিক্রির ব্যস্ততা কিংবা ট্রেন থামার শব্দ।
দীর্ঘদিন স্টেশন দুটি বন্ধ থাকায় যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া দিয়ে সড়কপথে চলাচল করতে হচ্ছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হচ্ছে স্টেশনের বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামো। কোথাও প্ল্যাটফর্মে ময়লার স্তূপ, আবার কোথাও গরু-ছাগল বাঁধা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিত্যক্ত স্টেশন এলাকায় দিনে ও রাতে অপরাধীদের আড্ডাও বসে। এতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
_20260826_111647854.jpg)
ঈশ্বরগঞ্জের বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, একসময় ঈশ্বরগঞ্জ রেলস্টেশনে সবসময় মানুষের ভিড় লেগে থাকত। স্টেশন ছিল জমজমাট। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, ততই স্টেশনটির অবস্থা খারাপ হয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবন ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। দেখভালের অভাবে মূল্যবান অনেক জিনিসপত্রও চুরি হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, একসময় এ স্টেশনে আন্তঃনগর ও লোকালসহ কয়েকটি ট্রেন থামত। করোনাকালে স্টেশনটি বন্ধ হওয়ার পর আর আগের অবস্থায় ফেরেনি। দ্রুত স্টেশনটি চালু করে ট্রেন থামানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী সাদমান বিন ওমর বলেন, আগে ট্রেনে করে ময়মনসিংহ যাওয়া যেত। কাজ শেষ করে সময় অনুযায়ী আরেকটি ট্রেনে ঈশ্বরগঞ্জে ফেরা সম্ভব হতো। ট্রেনের সময়সূচি অনুযায়ী চলাচল করায় শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের অনেক সুবিধা ছিল।
তিনি বলেন, স্টেশন ও ট্রেন বন্ধ থাকায় এখন বাধ্য হয়ে সড়কপথে চলাচল করতে হচ্ছে। যানজটের কারণে অনেক সময় কলেজে সময়মতো পৌঁছানো যায় না। এ ছাড়া সড়কপথে যাতায়াতও অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ।
শুধু ঈশ্বরগঞ্জ নয়, একই অবস্থা সোহাগী রেলস্টেশনেরও। দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনটি কার্যত অচল থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
সোহাগী রেলস্টেশন এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, স্টেশনটি বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী এলাকা থেকে ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। আগে স্থানীয় স্টেশন থেকেই ট্রেনে ওঠার সুযোগ ছিল। এখন ময়মনসিংহে গিয়ে ট্রেনে উঠতে হয়।
তিনি আরও বলেন, বাস ও সিএনজি অটোরিকশার ব্যবসার স্বার্থে রেল যোগাযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে স্থানীয়দের মধ্যে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে সাধারণ মানুষের স্বার্থে স্টেশন দুটি পুনরায় চালু করা দরকার।
পথচারী সেলিম আকন্দ বলেন, শুধু রাতেই নয়, দিনেও পরিত্যক্ত স্টেশন এলাকায় অপরাধীদের আড্ডা বসে। তাদের ভয়ে স্থানীয়রা অনেক সময় কিছু বলতে সাহস পান না। স্টেশনের বিভিন্ন লোহার সামগ্রী চুরি করে মাদক কেনার টাকা জোগাড় করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। রাতে স্টেশন এলাকা অন্ধকার থাকে।
দীর্ঘদিন রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। ঈশ্বরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদিত সবজি ও কৃষিপণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে এখন সড়ক পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ বেড়েছে। যানজট ও দীর্ঘ সময়ের কারণে দ্রুত পণ্য পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় অনেক সময় পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

কৃষক সোহরাব মিয়া বলেন, ময়মনসিংহ জেলার মধ্যে ঈশ্বরগঞ্জে প্রচুর সবজি উৎপাদন হয়। এসব সবজি ট্রাকে করে ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতে হয়। পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় কৃষকের লাভ কমে যায়।
তিনি বলেন, পরিবহন সুবিধা না থাকায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে ফসল ব্যবসায়ীদের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হয়। রেল যোগাযোগ চালু থাকলে কম খরচে দ্রুত দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিপণ্য পাঠানো সম্ভব হতো। এতে কৃষকেরা লাভবান হতেন।
সোহাগী এলাকার বাঁশের তৈরি পাটি কারিগর আবুল মনসুর বলেন, এ এলাকায় পাটিসহ বিভিন্ন পণ্য ও খাদ্যপণ্যের একাধিক গুদাম রয়েছে। রেলস্টেশন চালু থাকলে এসব মালামাল সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া যেত। ব্যবসায়ীদের পরিবহন খরচও কমত।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, কৃষিপণ্য ও ব্যবসায়িক মালামাল পরিবহনের জন্যও ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী রেলস্টেশন গুরুত্বপূর্ণ। স্টেশন দুটি পুনরায় চালু হলে এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে।
ময়মনসিংহ রেল বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী নাজমুল হক বলেন, ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী রেলস্টেশন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। স্টেশনগুলোর অবকাঠামোর বর্তমান অবস্থা, প্রয়োজনীয় জনবল ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে এগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/এসএস




