বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

নীলফামারীতে কমছে না বাল্যবিবাহ, ১০ মেয়ের ৪ জনেরই বিয়ে ১৮-এর আগে

জেলা প্রতিনিধি, নীলফামারী
প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১০ এএম

শেয়ার করুন:

নীলফামারীতে কমছে না বাল্যবিবাহ, ১০ মেয়ের ৪ জনেরই বিয়ে ১৮-এর আগে

আইন আছে, প্রশাসনের অভিযান আছে, সচেতনতামূলক প্রচারও চলছে। বাল্যবিবাহের খবর পেলে কোথাও ভ্রাম্যমাণ আদালত গিয়ে বিয়ে বন্ধ করছে, কোথাও নেওয়া হচ্ছে আইনি ব্যবস্থা। এরপরও নীলফামারীতে বাল্যবিবাহের প্রবণতা কমছে না। দারিদ্র্য, পারিবারিক চাপ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়া এবং বয়সের তথ্য জালিয়াতির মতো নানা কারণে গোপনে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, নীলফামারীতে ১৫ বছরের আগে বাল্যবিবাহের হার ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ জেলার প্রতি ১০ জন মেয়ের মধ্যে চারজনের বেশি ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসছে।

এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো কিশোরীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ।

আইন অনুযায়ী, মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। কিন্তু আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায়ও রয়েছে নানা দুর্বলতা।

0f8d2ff3-a645-451e-bbf3-b27384fefc1f

জন্মনিবন্ধনেই বদলে যাচ্ছে বয়স

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বয়স প্রমাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল জন্মনিবন্ধন। কিন্তু এই জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থাকে ঘিরেই উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।

স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের বয়স না হওয়া কিশোরীর জন্মনিবন্ধনের তথ্য অর্থের বিনিময়ে পরিবর্তন করে কাগজে বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি দেখানো হচ্ছে। পরে সেই জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ বাস্তবে মেয়েটি অপ্রাপ্তবয়স্ক হলেও সরকারি কাগজে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় বিয়েটি বৈধতার একটি আবরণ পাচ্ছে।

নীলফামারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আসাদুজ্জামান খান রিনো বলেন, ‘ভোটের কারণেই হোক কিংবা অভাবের কারণে, অনেকেই অসাধু উপায়ে জন্মনিবন্ধনে বয়স পরিবর্তন করে মেয়ের বয়স ১৮ বছর দেখিয়ে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। আমরা অনেক কমিটিতে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকায় সামাজিকভাবে কোথায় কী ঘটছে, তার সব তথ্য আমাদের কাছে সবসময় পৌঁছায় না। তবে এটি একটি উদ্বেগজনক বিষয়।’

আরও পড়ুন

ব্রিজ থেকে নারীর নদীতে ঝাঁপ, জীবন বাজি রেখে বাঁচালেন পুলিশ সদস্য

দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক চাপ

বাল্যবিবাহের কারণ শুধু জন্মনিবন্ধন জালিয়াতি নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দরিদ্র পরিবারের অনেক অভিভাবক মেয়েকে পরিবারের ওপর বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। সংসারের ব্যয় কমানো, মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা ভবিষ্যতে ভালো পাত্র পাওয়া যাবে না—এমন আশঙ্কা থেকেও অল্প বয়সে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন তারা।

অনেক পরিবারে এখনো ধারণা, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে পরিবারের একটি বড় দায়িত্ব শেষ। ফলে মেয়েটির ইচ্ছা, পড়াশোনা কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চেয়ে পারিবারিক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে ওঠে।

এমনই এক কিশোরী জানান, মাত্র ১৪ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়ে যায়। স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে চিকিৎসক হওয়ার। কিন্তু অকাল বিয়ের কারণে সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নেওয়ার সুযোগ হয়নি।

আরেক কিশোরীর অভিজ্ঞতা আরও বেদনাদায়ক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী জানান, তার এক বান্ধবীর পরিবার জোর করে বিয়ের আয়োজন করেছিল। বিয়ে ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে হতাশায় ওই কিশোরী নিজের হাত ব্লেড দিয়ে কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত বিয়ে ঠেকানো যায়নি; পরে তার খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়।

4eb7ee00-8c10-46ec-a4d3-2848ae7195ad

বিয়ে ঠেকানোর পরই কি শেষ প্রশাসনের দায়িত্ব?

বাল্যবিবাহ বন্ধ করা নিঃসন্দেহে একটি সাফল্য। কিন্তু কোনো কিশোরীর বিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ হওয়ার পর সে কতটা নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবন পাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিয়ে বন্ধের পর যদি পরিবার তাকে পড়াশোনা করতে না দেয়, আবার বিয়ের চাপ সৃষ্টি করে অথবা আর্থিক ও মানসিকভাবে একঘরে করে রাখে, তাহলে বিয়ে বন্ধের তাৎক্ষণিক সাফল্য কতটা টেকসই—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সুমনা আক্তারের অভিজ্ঞতাও সেই প্রশ্ন সামনে আনে। নিজের বিয়েতে রাজি না হয়ে তিনি সাহস করে বিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হন। কিন্তু এরপর পরিবার তার পড়াশোনার খরচ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা পেলেও শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়ে তার নিজের ওপর।

বিয়ে বন্ধের পর কিশোরীর শিক্ষা অব্যাহত রাখা, পরিবারকে কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা, প্রয়োজন হলে আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং পুনরায় বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

আরও পড়ুন

এক বছরে ৫১৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, বেশি মেয়েরা

মাঠে কাজ করতে গিয়ে প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা

নীলফামারী জেলা প্রশাসন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত, সচেতনতামূলক সভা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচারণা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় লোকবল ও লজিস্টিক সুবিধার ঘাটতি থাকায় সব এলাকায় সমানভাবে নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না।

নীলফামারী জেলা প্রশাসক ও জেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মো. নায়িরুজ্জামান বলেন, ‘বাল্যবিবাহ এখনো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। সরকারি যে প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কাজ হওয়ার কথা, সেখানে লোকবলের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে সব জায়গায় কার্যকর নজরদারি করা সম্ভব হয় না। আমরা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে কাজ করছি।’

নীলফামারী জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উপপরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, ‘জনবল সংকট এবং লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে অনেক সময় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা ভুক্তভোগীদের কাছে সময়মতো পৌঁছাতে পারি না। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় বিয়ে বন্ধ করা গেলেও পরবর্তী ফলোআপ বা তদারকি করা কঠিন হয়ে পড়ে।’

38c70e39-1d42-4620-945f-e1861e589273

বাল্যবিবাহের স্বাস্থ্যঝুঁকি

বাল্যবিবাহের বড় ক্ষতিগুলোর একটি পড়ে কিশোরীর স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশে। অল্প বয়সে বিয়ে এবং এরপর দ্রুত গর্ভধারণ একটি অপরিণত শরীরের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করে।

নীলফামারীর গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. ই. ইউ. রওশন আরা ইসলাম বলেন, ‘অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের ফলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-একলাম্পসিয়া ও একলাম্পসিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। সময়ের আগে সন্তান জন্ম, অপুষ্ট শিশু জন্মগ্রহণ, প্রসবজনিত জটিলতা এমনকি মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়। তাই বাল্যবিবাহ শুধু আইনগত অপরাধ নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি।’

প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রশাসনের তৎপরতা থাকলেও গত তিন বছরে মাত্র ১১টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করার তথ্য পাওয়া গেছে।

এই সংখ্যা একদিকে প্রশাসনের হস্তক্ষেপের চিত্র তুলে ধরে, অন্যদিকে নতুন প্রশ্নও তৈরি করে—প্রশাসনের কাছে পৌঁছানো ১১টি ঘটনাই কি প্রকৃত চিত্র?

গ্রামাঞ্চলে অনেক বাল্যবিবাহ পরিবারের মধ্যেই গোপনে সম্পন্ন হয়। কোথাও রাতের আঁধারে, কোথাও বাড়িতে, আবার কোথাও বয়সের কাগজপত্র ঠিকঠাক দেখিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে দেওয়া হয়। ফলে প্রশাসনের অভিযানে বন্ধ হওয়া বিয়ের সংখ্যা দিয়ে জেলার প্রকৃত বাল্যবিবাহের চিত্র নির্ধারণ করা কঠিন।

বিশেষ করে ১৮ বছরের আগে বাল্যবিবাহের হার যেখানে ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে তিন বছরে মাত্র ১১টি বিয়ে বন্ধ হওয়ার তথ্য প্রশাসনিক নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

a974144b-72bf-4008-8266-7d4a96c3425b

সমাধান শুধু অভিযানে নয়

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও আইন প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন প্রতিরোধ, নজরদারি, সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত উদ্যোগ।

জন্মনিবন্ধনের তথ্য পরিবর্তনের প্রতিটি ঘটনা কঠোরভাবে যাচাই ও তদন্ত করতে হবে। বয়স জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা চক্র শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রেকর্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র ও বিয়ের নিবন্ধনের তথ্যের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা জরুরি।

বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে আগেই শনাক্ত করে দরিদ্র পরিবার, স্কুল থেকে ঝরে পড়া কিশোরী এবং অল্প বয়সে বিয়ের প্রবণতা রয়েছে—এমন পরিবারকে বিশেষ নজরদারিতে আনা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিয়ে বন্ধ হওয়ার পর কিশোরীকে পরিবারের হাতে ফিরিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ, প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা, মানসিক কাউন্সেলিং ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

c28fa7c4-73ac-4645-8385-96d323716457

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, কাজি, এনজিও, নারী সংগঠন ও অভিভাবকদের নিয়ে ইউনিয়নভিত্তিক কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।

নীলফামারীতে ১৮ বছরের আগে বাল্যবিবাহের হার ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে গত তিন বছরে প্রশাসনের হাতে বন্ধ হয়েছে মাত্র ১১টি বাল্যবিবাহ। এই দুই তথ্য পাশাপাশি রাখলে স্পষ্ট হয়, দৃশ্যমানভাবে বন্ধ হওয়া বিয়ের সংখ্যা দিয়ে সমস্যার গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সাফল্য শুধু বিয়ের আসর ভেঙে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সাফল্য তখনই আসবে, যখন একটি কিশোরী বিয়ে থেকে রক্ষা পাওয়ার পরও নিরাপদে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে, নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবে এবং পরিবার ও সমাজের চাপের কাছে আবার পরাজিত হবে না।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর