শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

‘সবাইকে প্রভাবিত করছে, আমার শ্যালককে হত্যা করা হয়েছে’

জেলা প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম

শেয়ার করুন:

‘সবাইকে প্রভাবিত করছে, আমার শ্যালককে হত্যা করা হয়েছে’

নিরাময় কেন্দ্র থেকে পালিয়ে আসা রোগীরা জানিয়েছেন সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করায় আমার শ্যালককে আটক করে তাকে ৫০-৬০টি বারি দেওয়া হয়। কয়েক দফায় তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে সে বাথরুমে অচেতন হয়ে পড়ে। চিকিৎসা না দিয়ে তাকে মেঝেতে ফেলে রাখে। সন্ধ্যায় শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলে আবার মারধর করেন। নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকরা প্রভাবশালী ও সবাইকে প্রভাবিত করছে। পুলিশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সুরতহাল প্রতিবেদনে এসব কিছুই উল্লেখ করেনি। আমার শ্যালককে নির্যাতন ও মারধর করে হত্যা করা হয়েছে। আমরা আদালতে মামলা দায়ের করব। কথাগুলো বলছিলেন, মারা যাওয়া ফোরকানের ভগ্নিপতি ইমন হোসেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চিকিৎসাধীন এক রোগীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠা ওই মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রটির অনুমোদন থাকলেও অনিয়মসহ নিয়ম বহির্ভূতভাবে চলছিল। চিকিৎসক ছাড়াই চলছিল পুনর্বাসন করা রোগীদের চিকিৎসা। জেলা প্রশাসনের পরিদর্শনে কেন্দ্রটির পরিচালনায় অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ এবং রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্যসংবলিত নথির ঘাটতি পাওয়া গেছে। চিকিৎসাধীন রোগীদের প্রায়ই নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ করেন পালিয়ে আসা রোগীরা। 

জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এন এম কায়সার বলেন, পরিদর্শনে অনেক কিছুই পায়নি। এটি পরিচালনায় কিছু ব্যত্যয় রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নিয়ামানুসারে রোগীদের ভর্তি সম্বলিত রেজিস্ট্রার ও মারা যাওয়া ফোরকান সম্পর্কে কোনো তথ্য বা নথি পাওয়া যায়নি। নিয়মের লঙ্ঘন হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ এর ১৫,১৬ ও ১৭ ধারায় নিরাময় কেন্দ্রের লাইসেন্স বাতিল করতে পারে। তাছাড়া গত জুলাই মাসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিদর্শনের প্রতিবেদন যা জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়ার কথা সেটি আমি পায়নি। পরিদর্শনের প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে জমা দেওয়া হবে।

ওই রোগীর নাম মো. ফোরকান (২৯)। তিনি জেলার নবীনগর উপজেলার কুড়িঘর গ্রামের মো. রশিদ মিয়ার ছেলে। তিনি কাতারপ্রবাসী ছিলেন। গত ছয় মাস আগে কাতার থেকে ছুটিতে দেশে আসেন। দেশে আসার দুই মাস পর তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন।

আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিলনকেন্দ্র ‘বাদল স্টলের’ সেই সমীর দাস আর নেই

জেলা শহরের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন একটি ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় ‘প্রয়াস’ নামে মাদক নির্ভরশীলদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রটি অবস্থিত। এই মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালকদের বিরুদ্ধে চিকিৎসাধীন ফোরকান নামে এক রোগীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত বুধবার দুপুরে সেখানে চিকিৎসাধীন প্রায় ৪০ রোগী একসঙ্গে পালিয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে সরেজমিনে ওই মাদক নিরাময় কেন্দ্রে জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এন এম কায়সার ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের লোকজনদের দেখা যায়। কেন্দ্রে ঢুকতেই প্রথমে দুটি দফতরিক কক্ষ। ভেতরে তৃতীয় তলায় দুটি ছোট ছোট ও একটি বড় কক্ষ এবং একটি রান্নাঘর। এসব কক্ষে চিকিৎসাধীন রোগীদের কাপড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। বড় কক্ষের উত্তর-পূর্বদিনের জানালার গ্রীল ভাঙা। চতুর্থ তলায় বিশালাকার ও একটি ছোট কক্ষ। চতুর্থ তলায় রোগীদের থাকার পৃথক পৃথক শয্যাগুলো একত্র জড়ো করা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। চতুর্থ তালার উত্তর-পূর্বদিনের জানালার গ্রীড ভাঙা রয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ তলার এই জানালাগুলো দিয়ে গত বুধবার চিকিৎসাধীন রোগীরা পালিয়ে যায়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সাজেদুল হাসান বলেন, প্রয়াস মাদক নিরাময় কেন্দ্রটি ২০ শয্যার অনুমোদন রয়েছে। গত জুলাই মাসে পরিদর্শনের সময় নিরাময় কেন্দ্রটিতে চিকিৎসাধীন ৩১ রোগী পাওয়া গেছে। তাদের স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০ শয্যার নিরাময় কেন্দ্রে একজন খণ্ডকালীন চিকিৎসক ও স্থানীয় নার্স থাকা অবশ্যক। পরিদর্শনের সময় নার্সকে পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, জেলায় প্রয়াসসহ অনুমোদিত ছয়টি মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে।

আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নববধূর রহস্যজনক মৃত্যু, স্বামী আটক

বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র ও মাদকাসক্তি পরামর্শ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনা বিধিমালা, ২০২১ অনুযায়ী একজন সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, একজন সার্বক্ষণিক অথবা খণ্ডকালীন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, একজন কাউন্সেলর, দুইজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা বয়, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকা অবশ্যক। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রয়াস মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে পালিয়ে আসা একাধিক রোগী বলেন, ওই মাদক নিরাময় কেন্দ্রে কোনো চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও নার্স কেউ ছিল না। আমরাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতাম। প্রায়ই চিকিৎসাধীন থাকা রোগীদের নির্যাতনসহ মারধর করা হতো।

এর আগে, ২০১৪ সালের ৯ আগস্ট শহরের কান্দিপাড়ার আতিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল (৩০) নামের এক যুবককে হত্যার পর লাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের বারান্দায় রেখে যাওয়ার অভিযোগ আছে ‘প্রয়াস’-এর বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগের বিষয়ে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের ইনচার্জ প্রমোদ বর্মণ বলেন, ‘সে সময় আমি ছিলাম না, বিষয়টি জানি না। অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক ফোরকানকে মৃত ঘোষণা করেন। নিরাময় কেন্দ্রে খণ্ডকালীন চিকিৎসক রয়েছে বলে জানান তিনি।

সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সঞ্জীব কুমার পাল বলেন, ফোরকানের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রভাবিত করার অভিযোগ মোটেও সত্য না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম জানান,এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। এছাড়া প্রভাবিত হওয়ার বিষয়টি সঠিক নই। আমরা তদন্ত করছি। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আসার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। 

প্রতিনিধি/ এজে

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর