বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিলনকেন্দ্র ‘বাদল স্টলের’ সেই সমীর দাস আর নেই

জেলা প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম

শেয়ার করুন:

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিলনকেন্দ্র ‘বাদল স্টলের’ সেই সমীর দাস আর নেই
বাদল স্টল ও সমীর দাসের কোলাজ ছবি। ছবি: ঢাকা মেইল

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ট্যাংকেরপাড় অন্নদা স্কুল রোডের ঐতিহ্যবাহী ‘বাদল স্টল’-এর কর্ণধার সমীর দাস (৬০) আর নেই। 

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। 

বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। 

সমীর দাসের মৃত্যুতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করছেন এবং বাদল স্টলকে ঘিরে নিজেদের পুরোনো স্মৃতি তুলে ধরছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মানুষের কাছে ‘বাদল স্টল’ শুধু একটি চায়ের দোকান নয়; এটি দীর্ঘদিনের স্মৃতি, আড্ডা ও আন্তরিকতার এক পরিচিত ঠিকানা। নবীন থেকে প্রবীণ— রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নিয়মিত আড্ডাস্থল ছিল এই স্টল। শহরের অনেক মানুষের দিনের কোনো না কোনো সময়ে এখানে বসে চা পান, গল্প কিংবা মতবিনিময়ের স্মৃতি রয়েছে।

বিশেষ করে অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অসংখ্য সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর শৈশব-কৈশোরের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাদল স্টল। চা, পুরি, সমুচা, সিঙ্গারা, লাড্ডুসহ নানা খাবারের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে জায়গাটি ছিল অত্যন্ত পরিচিত। অনেকের কাছে এটি ছিল স্কুলজীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ।

শহরের প্রবীণদের ভাষ্য, বাদল স্টলের রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও ইতিহাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই স্থানটি মানুষের মিলনস্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অনেকটা কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কফি হাউসের মতোই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের কাছে বাদল স্টল ছিল আড্ডা, পরিচিতি ও স্মৃতিচারণের একটি প্রাণকেন্দ্র।

সমীর দাস তাঁর বাবার রেখে যাওয়া এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখে দীর্ঘদিন মানুষের সেবা করে গেছেন। তাঁর সদালাপী, আন্তরিক ও হাস্যোজ্জ্বল আচরণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন শহরের মানুষের অতি পরিচিত মুখ। নিয়মিত আড্ডায় আসা মানুষদের অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন আপনজনের মতো।

সমীর দাসের আকস্মিক মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে কাটানো পুরোনো দিনের নানা স্মৃতি তুলে ধরছেন অনেকে। কেউ শৈশবের স্মৃতি মনে করছেন, কেউ স্কুলজীবনের আড্ডা, আবার কেউ বাদল স্টলের চায়ের কাপকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের কথা স্মরণ করছেন।

স্থানীয়দের মতে, সময়ের সঙ্গে শহরের অনেক কিছু বদলে গেলেও বাদল স্টল তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছিল। সেই ঐতিহ্যের অন্যতম পরিচিত মুখ সমীর দাসের চলে যাওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের জন্য একটি প্রজন্মের স্মৃতির অবসানের মতো।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আল আমিন শাহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক শোকবার্তায় লেখেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী বাদল স্টল ছিল শহরের প্রবীণ-নবীন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বদের আড্ডাস্থল। অন্নদা স্কুল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্কুলের শিক্ষার্থীদের সিঙ্গারা-লাড্ডুর স্মৃতিও এই স্টলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। 

তাঁর ভাষায়, কলকাতার কফি হাউসের মতোই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাদল স্টল ছিল একটি পরিচিত আড্ডাস্থল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি জহিরুল ইসলাম খোকন বলেন, সমীরের মৃত্যুর সংবাদ শুনেই তাকে শেষবারের মতো দেখতে ছুটে আসি। তার বাবার মৃত্যুর পর সমীরই ‘বাদল স্টল’-এর দায়িত্বে ছিলেন। তার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এই বাদল স্টলটি শুধু একটি চায়ের দোকান ছিল না; এটি ছিল আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আড্ডার অন্যতম কেন্দ্রস্থল। এখানেই আমরা সকলে একসঙ্গে বসে নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা ভাগাভাগি করতাম।

তিনি বলেন, সমীর ১৯৮২ ব্যাচের ছাত্র ছিল। আমরা একসঙ্গে লেখাপড়া করেছি। তার এভাবে চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। বাদল স্টলকে ঘিরে সমীরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো বলে শেষ করা যাবে না। সমীর অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল, সহজ-সরল ও আন্তরিক মানুষ ছিলেন।

জহিরুল ইসলাম খোকন আরও বলেন, রাজনৈতিক মাঠে আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য বা বিরোধিতা থাকলেও বাদল স্টলে এসে সবাই যেন সব বিভেদ ভুলে যেতাম। এক কাপ চায়ের চুমুকে সবাই আবার এক হয়ে যেতাম। সমীরের চলে যাওয়া সেই দীর্ঘদিনের আড্ডা ও স্মৃতির একটি বড় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছে।

সময় পেরিয়ে যাবে, শহর বদলাবে, নতুন প্রজন্ম আসবে, কিন্তু বাদল স্টলকে ঘিরে থাকা সেই চিরচেনা আমেজ ও সমীর দাসের আন্তরিক মুখ অনেকের স্মৃতিতে থেকে যাবে।

সমীর দাসের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করেছেন স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও বাদল স্টলের দীর্ঘদিনের পরিচিতজনরা।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর