মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

১১৩০ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে প্রশ্ন

তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ভাঙন

জেলা প্রতিনিধি, শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৪ পিএম

শেয়ার করুন:

তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ভাঙন

পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে শরীয়তপুরের জাজিরায় চলছে কোটি টাকার তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ। তবে কাজ শেষ হওয়ার আগেই নির্মাণাধীন বাঁধের বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে তিনটি এলাকায় প্রায় ২০০ মিটার বাঁধ নদীতে বিলীন হয়েছে। একই সঙ্গে নদীগর্ভে গেছে দোকানপাট ও গ্রামীণ সড়কের অংশ। ভাঙনের মুখে অন্তত ২৫টি পরিবার বসতবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও প্রায় ৩০০ পরিবার।

এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অনেকে ঘরবাড়ি ও মূল্যবান মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ বসতভিটার গাছপালাও কেটে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের প্রশ্ন, পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও কাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি বাঁধ ভেঙে যায়, তাহলে এর স্থায়িত্ব কতটা?

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু এলাকার নাওডোবা থেকে জাজিরা ইউনিয়নের পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত নদীর দক্ষিণ তীরে ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। ৩৯টি প্যাকেজে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা।

e5b9a9d5-103d-4fda-a623-3bee0036d92c

পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের জিরো পয়েন্ট থেকে পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত ৮ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার অংশের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের মার্চে। ২০২৫ সালে প্রকল্পের একটি অংশে ভাঙন দেখা দিলে আরও দুই কিলোমিটার এলাকা প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয়। এরপরও নতুন করে ভাঙন দেখা দেওয়ায় প্রকল্পের কার্যকারিতা ও কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া ও ফরাজীকান্দি এবং নাওডোবা ইউনিয়নের পৈলান মোল্যারকান্দি ও আলম খারকান্দি এলাকায় ভাঙন তীব্র হয়েছে। এসব এলাকায় অন্তত সাতটি দোকান নদীতে বিলীন হয়েছে। কাথুরিয়া-মাঝিরঘাট সড়কের প্রায় ৫০ মিটার অংশও নদীগর্ভে চলে গেছে। এতে ওই সড়কে অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

কাথুরিয়া এলাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের তিনটি খুঁটি তারসহ নদীতে পড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। হঠাৎ নদীর তীর ভাঙতে থাকায় দিন-রাত আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

কাথুরিয়া গ্রামের রাহিমা বেগমের (৫৫) চার শতক বসতভিটা গত সোমবার পদ্মায় বিলীন হয়েছে। ১৮ বছর আগে স্বামীকে হারানো রাহিমা দুই সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকতেন। সংসারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় ঢাকায় হকারি করে কাপড় বিক্রি করেন তিনি।

292f4f8e-16ed-4a1d-b31f-7d554d15b7da

বাড়ির শেষ মালামাল সরানোর সময় রাহিমা বলেন, ‘পরিবারে আয় করার মতো কেউ নাই। ঢাকায় হকারি কইরা কাপড় বিক্রি করি। বাড়ি ভাইঙা নিতে এলাকায় আইছি।’

কাথুরিয়ায় জ্বালানি তেল, এলপিজি ও মুদিপণ্য বিক্রি করতেন রেজাউল করিম। গত রোববার রাতে তার দোকানটি মালামালসহ নদীতে তলিয়ে যায়। রেজাউল বলেন, কয়েক বছর ধরে বাঁধের কাজ চললেও নদীভাঙন থামেনি। চোখের সামনে দোকানসহ সব হারিয়ে তিনি এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

কাথুরিয়া গ্রামের নাজমা বেগমের (৬৫) জীবনেও পদ্মার ভাঙন বারবার বিপর্যয় ডেকে এনেছে। গত দুই দশকে ছয়বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে প্রায় ১০ বিঘা ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। এবার শেষ সম্বল হিসেবে থাকা ২০ শতক জমির বাড়িটিও ভাঙনের মুখে।

বাড়ির মালামাল সড়কের পাশে সরিয়ে রেখেছেন নাজমা। তিনি বলেন, ‘মধ্যবিত্ত কৃষি পরিবার ছিল আমাদের। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়েছি। শেষ আশ্রয়ের বাড়িটিও বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সন্তান ও অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না।’

আরও পড়ুন

সিলেটে হামের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু

ভাঙনের খবর পেয়ে পাউবোর কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কর্মকর্তারা বলছেন, আকস্মিকভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে। বাঁধসংলগ্ন প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা বর্তমানে ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পাউবো সূত্র জানায়, তীর রক্ষা বাঁধের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার এলাকায় নদীতীরে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছিল। বর্ষায় নদীর পানি ও স্রোত বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে নদীতে ওই কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্পের প্রয়োজনীয় ব্লক তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

শরীয়তপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, প্রকল্পের কাজ চলার সময় গত বছরও কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছিল। পরে ওই অংশের নকশা পরিবর্তন করা হয়। নকশা অনুমোদনের পর বর্ষার আগেই সেখানে আবার কাজ শুরু করা হয়েছিল। এর মধ্যেই নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

আরও পড়ুন

নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারীর বিস্তারে মারাত্মক হুমকিতে জলজ জীববৈচিত্র্য

স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, পদ্মার তীব্র স্রোত ও ভাঙন বিবেচনায় নিয়েই যখন তীর রক্ষা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তখন কাজ শেষ হওয়ার আগেই নির্মাণাধীন বাঁধের বড় অংশ ভেঙে পড়ল কেন এবং এর দায় কার? তাদের মতে, হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও যদি মানুষের বসতভিটা ও যোগাযোগব্যবস্থা রক্ষা করা না যায়, তাহলে প্রকল্পের নকশা, বাস্তবায়ন ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বর্ষায় পানি ও স্রোত আরও বাড়লে ভাঙন কোন দিকে গড়াবে, তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন নদীতীরের বাসিন্দারা। তাদের দাবি, স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে আরও পরিবারকে বসতভিটা হারিয়ে পথে বসতে না হয়।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর