রোববার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

হবিগঞ্জ জেলায় ১ বছরে পানিতে ডুবে ২৭ শিশুর মৃত্যু

জেলা প্রতিনিধি, হবিগঞ্জ
প্রকাশিত: ০২ আগস্ট ২০২৬, ১২:২২ এএম

শেয়ার করুন:

হবিগঞ্জ জেলায় ১ বছরে পানিতে ডুবে ২৭ শিশুর মৃত্যু

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ। চলছে কনে বিদায়ের প্রস্তুতি। বাড়িজুড়ে তখন উৎসবের আমেজ, স্বজনদের ব্যস্ততা। হাসি-আনন্দে মুখর বাড়িতে হঠাৎ নেমে আসে শোকের ছায়া। বাড়ির পুকুরে ভেসে ওঠে তিন শিশুর নিথর দেহ। খেলতে গিয়ে পানিতে ডুবে তাদের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, এ খবর জানার পর মুহূর্তে থেমে যায় আনন্দ-উৎসব। গত বছরের ১৪ অক্টোবর হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চানপুর এলাকায় ঘটে হৃদয়বিদারক এ ঘটনা।

এরপর চলতি বছরের ১০ জুলাই লাখাই উপজেলায় ঘটে আরও একটি বেদনাদায়ক ঘটনা। দুই সন্তানকে নিয়ে ইতালি থেকে দেশে ফিরেছিলেন এক প্রবাসী দম্পতি। দেশে ফেরার আনন্দে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রাতের আড্ডা চলছিল। এরই মধ্যে সবার অগোচরে বাড়ির সামনের পানিতে ডুবে মারা যায় তাদের এক সন্তান। দেশে ফেরার আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় কান্নায়। সন্তানকে দেশের মাটিতে দাফন করে আবার ইতালিতে ফিরে যেতে হচ্ছে ওই বাবা-মাকে।

এ দুটি ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়। গত এক বছরে হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পুকুর, নদী, ডোবা, খাল ও অন্যান্য জলাশয়ে ডুবে অন্তত ২৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে উঠে এসেছে। অধিকাংশ ঘটনাতে দেখা গেছে, পরিবারের সদস্যদের অগোচরে খেলতে গিয়ে পানিতে পড়ে কিংবা সাঁতার কাটতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে শিশুরা।

হবিগঞ্জে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর বিষয়ে সরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ বিশ্লেষণ করে অন্তত ২৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে শায়েস্তাগঞ্জের ডোবার পানিতে পড়ে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনা যুক্ত হলে সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ২৭।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নবীগঞ্জ ও মাধবপুরে পাঁচজন করে, চুনারুঘাট ও লাখাইয়ে চারজন করে, হবিগঞ্জ সদরে তিনজন, শায়েস্তাগঞ্জ, বাহুবল এবং বানিয়াচংয়ে দুজন করে শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে।

মৃত শিশুদের মধ্যে নবীগঞ্জ উপজেলার তাকরিম আহমেদ (৫), তাহরিম চৌধুরী (৪), সাফওয়ান আহমেদ (২), রিহান আহমেদ (২) ও মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ (৮); বাহুবলের হাবিব উল্যা (৪) ও মোস্তাকিম বিল্লাহ (৬); বানিয়াচংয়ের দুই সহোদর সাদিয়া আক্তার (৭) ও জুবায়ের মিয়া (৫); লাখাইয়ের আব্দুল আজিজ (২), রুকন উদ্দিন (১৫), আরিশা আহমেদ (৮) ও আনাছ মিয়া (২); হবিগঞ্জ সদরের ইন্দ্রানী দাস (১০), জান্নাতুল ইসলাম শিমু (৬) ও রায়হান মিয়া (১২); চুনারুঘাটের শামীমা আক্তার (১৩), সানিয়া আক্তার (৯), মুসকান আক্তার (১৩) ও সামিয়া আক্তার (৬); মাধবপুরের তামান্না আক্তার (৭), একরাম মিয়া (৭), ইয়ামিন মিয়া (৩), মোস্তাকিম মিয়া (১২), ইজাজুর চৌধুরী (১২), শায়েস্তাগঞ্জের শ্রাবণ সরকার (৮) ও সৌরভ সরকার (৬) রয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুদের বড় একটি অংশ নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী পরিবারের। জীবিকার প্রয়োজনে পরিবারের বড়রা যখন কর্মস্থলে থাকেন, তখন অনেক শিশু বাড়ির আশপাশে একা কিংবা দলবেঁধে খেলতে বের হয়। আর বাড়ির পাশের পুকুর, ডোবা কিংবা খাল হয়ে ওঠে তাদের জন্য ভয়ংকর ঝুঁকির স্থান।

অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা বুঝে ওঠার আগে ঘটে যায় দুর্ঘটনা। শিশুটি কোথায় খেলছে, কার সঙ্গে আছে কিংবা কতক্ষণ ধরে বাড়ির বাইরে, এসব বিষয়ে নজরদারি না থাকায় কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটে যেতে পারে অপূরণীয় ক্ষতি।

একটি শিশু পানিতে পড়ে যাওয়ার পর তাকে খুঁজে পেতে সামান্য সময়ের বিলম্বও অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অভিভাবকদের সতর্কতা এবং শিশুদের প্রতি সার্বক্ষণিক নজরদারি এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হবিগঞ্জ হাওর ও জলাশয়বহুল জেলা হওয়ায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। জেলার গ্রামীণ জনপদে অসংখ্য বাড়ির আশপাশে রয়েছে পুকুর, ডোবা, খাল, বিল কিংবা নদী। বর্ষা মৌসুমে এসব জলাশয়ের পরিধি আরও বেড়ে যায়।

অথচ অধিকাংশ জলাশয়ের চারপাশে নেই কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী। অনেক পুকুরের পাড় অত্যন্ত অরক্ষিত ও পিচ্ছিল। কোথাও কোথাও বাড়ির উঠান থেকে কয়েক হাত দূরে রয়েছে গভীর পানি। শিশুদের জন্য এসব জলাশয় পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়ির আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় চিহ্নিত করে বেড়া দেওয়া, শিশুদের একা জলাশয়ের কাছে যেতে না দেওয়া এবং ছোটবেলা থেকে সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি পানিতে ডুবে গেলে জরুরি করণীয় সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের প্রশিক্ষিত করা জরুরি।

এক বছরে একের পর এক শিশুর মৃত্যু হলেও পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে হবিগঞ্জে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কর্মসূচির ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষ করে গ্রামীণ ও হাওরাঞ্চলের পরিবারগুলোকে শিশুদের প্রতি বাড়তি নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় সম্পর্কে সতর্কতা এবং পানিতে ডুবে গেলে তাৎক্ষণিক করণীয় বিষয়ে নিয়মিত প্রচারণার প্রয়োজন থাকলেও তেমন কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জের সহ-সভাপতি বাহার উদ্দিন বলেন, বছরের পর বছর পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যু ঘটছে। অধিকাংশ ঘটনায় অভিভাবকদেরও গাফিলতি দেখা যাচ্ছে। অথচ হাওরাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় এ বিষয়ে সরকারের তেমন কোনো সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেই।

তিনি বলেন, গত ২৫ জুলাই ছিল ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’। এ দিনটি উপলক্ষে অন্তত সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও প্রচারণা আয়োজন করা যেত। একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয় না, বদলে দেয় পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ। যে সন্তানকে ঘিরে বাবা-মায়ের অসংখ্য স্বপ্ন, কয়েক মিনিটের অসতর্কতায় সেই সন্তান যখন নিথর হয়ে ঘরে ফেরে তখন সেই শূন্যতা কোনো কিছুর বিনিময়ে পূরণ হওয়ার নয়।

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য। বাড়ির আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী দেওয়া। শিশুদের একা বাইরে যেতে না দেওয়া। পানির কাছে খেলতে না দেওয়া। অভিভাবকদের সচেতন করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত প্রচারণা চালানো গেলে অনেক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।

এমসি/ইএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর