কক্সবাজারের মহেশখালীর শাপলাপুর সংরক্ষিত বনভূমির ভেতর দিয়ে ৪ দশমিক ৮৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক পাকাকরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) ও বনবিভাগের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) অর্থায়নে প্রায় ২২ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংরক্ষিত বন আইনের দোহাই দিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বনবিভাগ। অন্যদিকে স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর করতে সড়কটি অত্যন্ত প্রয়োজন।
এলজিইডির উদ্যোগে দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্প (এসসিআরডিপি)-এর আওতায় জে.এম. ঘাট-কালারমারছড়া সংযোগ সড়কটি পাকাকরণের কাজ শুরু হয়। তবে বনবিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে এ ধরনের উন্নয়নকাজের জন্য তাদের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ বনবিভাগকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে একটি ডিও লেটার দেন। তবে লিখিত জবাবে বনবিভাগ জানিয়ে দেয়, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে কোনো পাকা সড়ক নির্মাণের সুযোগ নেই।

এদিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নির্মাণকাজ বন্ধ এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে গত ২ জুলাই বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বন বিভাগ, এলজিইডিসহ সরকারের ৯টি গুরুত্বপূর্ণ দফতরে চিঠি দিয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, মহেশখালী বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি বন সমৃদ্ধ দ্বীপ। উপজেলার ১২ নম্বর পাহাড় মৌজা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ সংরক্ষিত বনাঞ্চল।
বেলার তথ্যমতে, তৎকালীন কৃষি ও ত্রাণ অধিদফতরের গেজেট নোটিফিকেশন নং-২৫২৯ অনুযায়ী ১৯৫৪ সালে ১৮ হাজার ২৮৬ দশমিক ৪০ একর ভূমি ১০০ বছরের জন্য বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ১৯৫৭ সালে গেজেট নোটিফিকেশন নং-১২২২-এর মাধ্যমে এলাকাটিকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে আরএস ও বিএস রেকর্ড অনুযায়ী পুরো বনভূমি বন বিভাগের নামে খতিয়ানভুক্ত।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সংরক্ষিত এ বনাঞ্চলে হরিণ, বানর, অজগরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী এবং অসংখ্য প্রজাতির পাখির আবাসস্থল রয়েছে। সম্প্রতি এলজিইডি বনাঞ্চলের ভেতরে একটি পুরোনো কালভার্ট ভাঙার কাজ শুরু করেছে, যদিও এ কাজে বন বিভাগের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
বিষয়টি জানার পর মহেশখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা অনুমোদন ছাড়া সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বনাঞ্চলে আনা নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে বনবিভাগের অভিযোগ, সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বনবিভাগের আশঙ্কা, সড়কটি কংক্রিটে ঢালাই করা হলে বিপুলসংখ্যক গাছপালা নিধন, পাহাড় কাটা, বনভূমিতে অনুপ্রবেশ এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি গাছ ও বন্যপ্রাণী পাচার এবং অবৈধ দখলের ঝুঁকিও বেড়ে যাবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের জে.এম. ঘাট থেকে কালারমারছড়া পর্যন্ত সড়কটি পাহাড় ও ঘন বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে গেছে। কিছু অংশ সমতল এলাকায়, যেখানে বসতবাড়িও রয়েছে। যদিও এলজিইডির পক্ষ থেকে কাজ বন্ধ থাকার কথা বলা হয়েছে, তবু সমতল অংশে কয়েকজন শ্রমিককে নির্মাণকাজ করতে দেখা গেছে। ইতোমধ্যে কিছু অংশে কংক্রিট ঢালাই ও কালভার্ট নির্মাণের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, সড়কটি পাকাকরণ হলে শাপলাপুর, কালারমারছড়া ও আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষের যাতায়াতে আমূল পরিবর্তন আসবে। শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে বড় ধরনের সুবিধা সৃষ্টি হবে।

শাপলাপুরের বাসিন্দা মো. নুরুল আলম বলেন, বর্ষাকালে এই রাস্তা দিয়ে চলাচল খুবই কষ্টকর। রোগী হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়া কিংবা কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। রাস্তা পাকা হলে হাজারো মানুষ উপকৃত হবে।
কালারমারছড়ার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা বন ধ্বংস চাই না। তবে মানুষের চলাচলের জন্য একটি টেকসই সড়কও প্রয়োজন। পরিবেশ রক্ষা করে বিকল্প নকশায় কাজ করা হলে সেটিই সবচেয়ে ভালো হবে।’
শাপলাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক বলেন, ‘এ সড়কটি দুই ইউনিয়নের মানুষের বহু বছরের দাবি। উন্নয়ন যেমন প্রয়োজন, তেমনি বনও রক্ষা করতে হবে। তাই সংশ্লিষ্ট সব দফতরে বসে আইনসম্মত ও পরিবেশবান্ধব সমাধানে পৌঁছানো উচিত।’
'ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)' কক্সবাজারের যুগ্ম আহ্বায়ক এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন বলেন, ‘উন্নয়নের নামে সংরক্ষিত বন ধ্বংস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জাইকার মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন আরও গুরুত্বের সঙ্গে করা উচিত ছিল।’
তিনি বলেন, ‘যেখানে সরকার দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, সেখানে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সড়ক নির্মাণে একজন সংসদ সদস্যের ডিও লেটার দেওয়া দুঃখজনক।’
মহেশখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সংরক্ষিত বনভূমি উজাড় করে কোনো ধরনের উন্নয়ন বা স্থাপনা নির্মাণ আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ। এ বিষয়ে একাধিকবার এলজিইডিকে লিখিতভাবে কাজ বন্ধের অনুরোধ জানানো হলেও তা উপেক্ষা করা হচ্ছে।’
আরও পড়ুন: এবার আগুনে পুড়ল সংরক্ষিত রাজকান্দি বন
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এম এ হাসান বলেন, ‘সংরক্ষিত বনের ভেতরে মানুষের চলাচলের জন্য আগের পথ থাকতে পারে, কিন্তু সেটিকে পাকা সড়কে রূপান্তরের সুযোগ আইন দেয় না। এতে বনভূমিতে অনুপ্রবেশ বাড়বে, গাছপালা ও বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে এলজিইডিকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কাজ বন্ধ না হলে বন আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংরক্ষিত বনে কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে সরকারপ্রধানের অনুমোদন প্রয়োজন।’
মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জনি বলেন, ‘এটি এলজিইডির গেজেটভুক্ত সড়ক। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এটি পাকাকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বনবিভাগের আপত্তির কারণে কাজের গতি কমেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সড়কটি নির্মাণ হলে শাপলাপুর, কালারমারছড়া ও আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে বড় ধরনের সুবিধা মিলবে।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
প্রতিনিধি/এমআই




