বান্দরবানের দুর্গম আলীকদম-থানচি সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক বন উজাড় করে কাঠ পাচার করছে। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি, ঝিরির পানি প্রবাহ বন্ধ এবং শতবর্ষী মাতৃগাছ নির্বিচারে কাটার ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পোলা ব্যাঙ ঝিরির স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ করে পাহাড় কেটে ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল উন্নয়নের কাজ চলছে। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, শত বছরের পুরোনো মাতৃগাছ প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। যন্ত্রচালিত করাত দিয়ে গত দুই বছর ধরে গাছ কাটা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ঝিরির ওপর পাহাড় কেটে তৈরি করা সড়কের দুই পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের গাছের গুঁড়ি। বহু গাছ অর্ধেক কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। এসব গাছের দৈর্ঘ্য ৬০ থেকে ১০০ ফুট এবং প্রস্থ ১০ থেকে ১৫ ফুট। অভিযোগ রয়েছে, জোত পারমিটের কাগজ দেখিয়ে অধিকাংশ কাঠ পাচার করা হচ্ছে, আর কিছু কাঠ আলীকদমের অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। সোমবার পর্যন্ত স্ক্যাভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির কাজ চলতে দেখা গেছে।
জানা গেছে, জেলা সদর থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার এবং আলীকদম উপজেলা সদর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পামিয়া ম্রো পাড়া, তন্তুই পাড়া, নামচাক পাড়া, কাকই পাড়া, আদুই পাড়াসহ আশপাশের এলাকায় এই বনধ্বংসযজ্ঞ চলছে। আলীকদম-থানচি সড়কের ১৭ কিলোমিটার অতিক্রম করে আরও প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে পোলা ব্যাঙ ঝিরি এলাকায় গেলে এই ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়রা জানান, কয়েকদিন আগে প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ দেওয়া হলেও এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে বর্তমানে পামিয়া ম্রো পাড়াসহ পাঁচটি পাড়ায় তীব্র খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, আলীকদমের আবুহান মোহাম্মদ ইসমাইলের নেতৃত্বে একটি চক্র ব্যাঙঝিরি এলাকা থেকে গত দুই বছর ধরে প্রায় ৩০ জন শ্রমিক দিয়ে গাছ কেটে পাচার করছে। কাটা গাছের মধ্যে রয়েছে গর্জন, চম্পা, কড়ই, বৈলাম, গুটগুটিয়া, লালি ও চাপালিশসহ নানা প্রজাতির বনজ গাছ। এতে ঝিরি শুকিয়ে গেছে এবং অন্তত পাঁচটি পাড়ার ম্রো জনগোষ্ঠী পানি সংকটে পড়েছে। দুই বছর আগেও এই এলাকায় ঘনবন ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ ছিল বলে জানান স্থানীয়রা।
শ্রমিক শামসুল আলম জানান, তিনি ১৯ দিন ধরে গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত আছেন। তার বাড়ি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলায়।
শ্রমিকদের টিম লিডার মাঝি ইসমাইল জানান, তিনি চকরিয়া উপজেলার হাঁসের দীঘি এলাকা থেকে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে তিন মাস ধরে আটজন শ্রমিক দিয়ে গাছ কাটছেন। তিনি আবুহান মোহাম্মদ ইসমাইল সওদাগরের অধীনে কাজ করছেন এবং প্রতিদিন একটি ট্রাকে দুইবার করে কাঠ পরিবহন করা হয়।
এদিকে লুংলেই ম্রো বলেন, ‘আমার বাবা চাহ্লা ম্রো ৫০ একর প্রাকৃতিক বন ৪০ হাজার টাকায় পাঁচ বছরের জন্য ইসমাইল সওদাগরের কাছে বিক্রি করেছেন। কিন্তু ইসমাইল প্রায় ২০০ একর এলাকা থেকে গাছ কাটছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইসমাইল তার বাবাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি সাংবাদিক, বন বিভাগ ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করবেন এবং কোনো অসুবিধা হবে না।
পামিয়া পাড়া, তন্তুই পাড়া, নামচাক পাড়া, কাকই পাড়া ও আদুই পাড়াসহ অন্তত পাঁচটি পাড়ার শতাধিক ম্রো পরিবার এই বন ও ব্যাঙঝিরির খালের পানির ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া লামা উপজেলার রুপসী পাড়া ইউনিয়নের সাঙক্রাত ম্রো পাড়া ও কুইরিং ম্রো পাড়ার লোকজনও এই পানি ব্যবহার করেন।
আদুই পাড়ার কার্বারী কামপ্লাত ম্রো বলেন, ‘এই ব্যাঙঝিরির পানির ওপর সাত-আটটি পাড়া নির্ভরশীল। এখন আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। নামচাক পাড়ার মেন রাও ম্রো বলেন, দুই বছর আগেও এখানে হরিণ, ভালুকসহ নানা বন্যপ্রাণী ও পাখি ছিল। এখন বনও নেই, প্রাণীও নেই।’
পামিয়া পাড়ার মেন চং ম্রো বলেন, ‘আগে ঝিরিতে প্রচুর পানি ও মাছ-কাঁকড়া ছিল। এখন পানি শুকিয়ে গেছে। পাড়াবাসী পানি নিয়ে চরম সংকটে আছি।’

অভিযুক্ত আবুহান মোহাম্মদ ইসমাইল সওদাগর তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘জুম থেকে মরা গাছ লাকড়ি হিসেবে ১৫ হাজার টাকায় চাহ্লা ম্রোর কাছ থেকে কিনেছি এবং মঙ্গলবার থেকে গাছ কাটা বন্ধ রেখেছি।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান চ্যাপ্টারের সভাপতি জোয়াম লিয়ান আমলাই ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ইসমাইল নামের এক অসাধু ব্যবসায়ী দুই বছর ধরে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে কাঠ পাচার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে বন বিভাগের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই দুই বছর ধরে অবৈধভাবে বন উজাড় করা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন রোধকল্পে ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে অবশ্যই অবৈধ কাঠপাচার রোধ করতে হবে এবং এই কাজে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে বলে জানান তিনি।’
বন বিভাগের তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট এলাকায় বন বিভাগের কার্যক্রম নেই। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সমন্বয় করে সরেজমিনে তদন্ত করা হবে। প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে অবৈধ কাঠ পাচার হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।’
মাঙ্গুম মৌজার হেডম্যান রেংপুং ম্রোর বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রাকৃতিক বন থেকে গাছ পাচারের বিষয়ে তিনি অবগত নন। প্রয়োজনে পুলিশ বাহিনী নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বন বিভাগের লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।
প্রতিনিধি/এমআই



