বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ঢাকা

উপকূল রক্ষার বন উধাও, রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লুটপাটের অভিযোগ

ছায়েদ আহামেদ, হাতিয়া (নোয়াখালী)
প্রকাশিত: ২৭ মে ২০২৬, ১১:৪০ এএম

শেয়ার করুন:

উপকূল রক্ষার বন উধাও, রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লুটপাটের অভিযোগ

নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বন ও সবুজ বেষ্টনী গড়ার নামে সরকারি প্রকল্পের বিপুল অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে হাতিয়ার সাগুরিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। কাগজে-কলমে শত শত হেক্টর বন সৃজন দেখানো হলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ‘হেল্প প্রকল্প’-এর আওতায় উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে হাতিয়ার সাগুরিয়া রেঞ্জ, ভাসানচর ও আশপাশের এলাকায় ম্যানগ্রোভ বন সৃজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক ঢেউ থেকে উপকূলীয় জনপদ ও ভাসানচরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় প্রাকৃতিক সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা।


বিজ্ঞাপন


বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, সাগুরিয়া রেঞ্জের অধীনে চর আলীম (লালচর)-এ ১০০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন সৃজন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে সরেজমিনে সেখানে বনের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সমুদ্রতীর ও বুড়িরদোনা খালের আশপাশ ঘুরে মাত্র অল্প কিছু কেওড়ার নতুন কুঁড়ি দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে মাত্র ৪ থেকে ৫ হেক্টর জায়গায় নামমাত্র চারা রোপণ করা হয়েছিল, যা সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে গেছে।

স্থানীয় জেলে, রাখাল ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত শীত মৌসুমে দুই-তিন ধাপে ৭০ থেকে ৭৫ জন শ্রমিক দিয়ে সীমিত এলাকায় কেওড়ার চারা রোপণ করা হয়। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী কাদামাটিতে চারা না লাগিয়ে বালুর ওপর লাগানোয় তা টেকেনি।

স্থানীয় মৎস্যজীবী দেলোয়ার হোসেন বেচু বলেন, ‘বন বিভাগ দুই ধাপে ৭০ থেকে ৭৫ জন শ্রমিক দিয়ে ৪ থেকে ৫ কানি (প্রায় ৪ হেক্টর) জমিতে কেওড়ার চারা লাগায়। যেভাবে চারা লাগানো হয়েছে, তাতে এগুলো টিকে থাকার সুযোগ ছিল না। এখন সেখানে বনের কোনো চিহ্ন নেই।’ একই তথ্য জানান স্থানীয় টানবাজার এলাকার দুলাল মাঝি, জয়নাল আবেদীন ও আউয়ালসহ একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী। লালচর এলাকার মো. রাকিব নামের দুই রাখাল বালক জানায়, ৬০ থেকে ৭০ জন শ্রমিক দিয়ে ৪/৫ কানি জমিতে কেওড়ার চারা লাগানো হয়। বালিতে রোপণ করায় তা ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে গেছে।


বিজ্ঞাপন


জানা যায়, সাগুরিয়া রেঞ্জের নৌকাচালক আবুল হাসেমের ভাই কালু সর্দারসহ দুই সর্দারের শ্রমিক দিয়ে এই অল্প কিছু চারা লাগানো হয়। আবুল হাসেম ও কালু সর্দারের সাথে কথা হলে তারা বনায়ন করা হয়েছে বলে দাবি করেন এবং রেঞ্জ কর্মকর্তার পক্ষে কথা বলেন।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, ১০০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন সৃজনে প্রায় ৪ লাখ ৪৪ হাজার চারা ও অন্তত সাড়ে পাঁচশ’ শ্রমিক প্রয়োজন হয়। অথচ বাস্তবে খুব অল্পসংখ্যক চারা ও সীমিত শ্রমিক ব্যবহার করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে একই প্রকল্পের আওতায় সাগুরিয়া রেঞ্জের অধীনে চর আলীমে ১০০ হেক্টর, ভাসানচরে ৩২০ হেক্টর এবং জাহাজমারা রেঞ্জের চর বাহাউদ্দীনে ১০০ হেক্টর বন সৃজনের কথা বলা হয়। এছাড়া ভাসানচরে আলেকজান্ডার, কোম্পানীগঞ্জ ও চর বাটার অধীনেও ম্যানগ্রোভ বন সৃজন করা হয়। তবে সাগুরিয়া রেঞ্জের অধীনে হওয়া বনায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান একই সঙ্গে চর আলীম বিটের দায়িত্বে থেকে প্রকল্পের অধিকাংশ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এ ধরনের বড় অনিয়ম সম্ভব নয়। একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, স্পেশাল মনিটরিং টিম সরেজমিনে এলেও অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে ‘অনুপযুক্ত’ বনায়নকে ‘উপযুক্ত’ দেখিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

এদিকে রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে সংরক্ষিত বন, খাল ও খাস জমি নিয়েও একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, যা পরবর্তী পর্বে প্রকাশ করা হবে।

সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মো. দুলাল উদ্দিন বলেন, ‘রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ প্রকল্প নিয়ে এমন অনিয়ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশিষ্ট লেখক এম দিলদার উদ্দিন বলেন, ‘উপকূল রক্ষার নামে কাগজে-কলমে বন দেখিয়ে অর্থ লুট করা শুধু দুর্নীতি নয়, এটি উপকূলবাসীর জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে প্রতারণা।’

অভিযোগ অস্বীকার করে সাগুরিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিভাগীয় নির্দেশনা অনুযায়ী চর আলীম ও ভাসানচরে নির্ধারিত পরিমাণ চারা রোপণ করা হয়েছে।’

তবে নোয়াখালী উপকূলীয় বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।

উপকূলীয় অঞ্চল বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, ‘অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ ঘটনায় উপকূলীয় অঞ্চলে সরকারি প্রকল্পের অর্থ লুটপাট ও পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

প্রতিনিধি/একেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর