বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ঢাকা

কক্সবাজারে পড়ে আছে বেনজীরের কোটি টাকার জমি 

জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার 
প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ০৭:০৪ এএম

শেয়ার করুন:

B
কক্সবাজারে থাকা বেনজীর আহমেদের জমিটি। ছবি- প্রতিনিধি

প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন এবং কক্সবাজারের পর্যটনসমৃদ্ধ ইনানী সৈকতে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ জমির তথ্য পাওয়া গেছে। আদালতের আদেশে জব্দ করা হয়েছে সেসব জমি। কক্সবাজারে থাকা জমিগুলোর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসনকে।

সংশ্লিষ্ট দলিল, স্থানীয় সূত্র এবং দুদকের নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জিনজিরা মৌজায় নিজের নামে প্রায় ১ একর ৭৫ শতক (১৭৫ শতাংশ) জমি কেনেন বেনজীর আহমেদ। একই সময়ে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানী সৈকত এলাকায় তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের নামে আরও ৭২ শতক জমি কেনা হয়। তখন তিনি ডিএমপির কমিশনার ছিলেন।


বিজ্ঞাপন


সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ পাড়ায় অবস্থিত জমিটি বর্তমানে কংক্রিটের পিলার ও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। রাস্তার পাশে বড় একটি ফটক রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক মাস আগেও সেখানে বেনজীর আহমেদের নামসংবলিত সাইনবোর্ড ছিল।

স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নজির আহমদ বলেন, ‘দ্বীপের প্রায় সবাই জানে জমিটির মালিক সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। এ কারণে সেখানে সাধারণ কেউ প্রবেশ করে না।’

জমিগুলোর দেখভালের দায়িত্বে থাকা সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক ও হোটেল ব্যবসায়ী আবদুর রহমান জানান, ২০১৪ সালে স্থানীয় ২২ জনের কাছ থেকে জমিগুলো কেনা হয়েছিল। ওই সময় জমিগুলো পরিত্যক্ত ছিল এবং মাটির নিচে পাথর থাকায় কৃষিকাজও হতো না। 


বিজ্ঞাপন


তিনি বলেন, ‘প্রতি কানি জমির দাম ছিল ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা। বেনজীর আহমেদ নিজে টেকনাফে আসেননি। আমি তার জন্য মোট ১৮৫ শতাংশ জমি কিনতে সহায়তা করি, যার মধ্যে ১৭৫ শতাংশের নামজারি সম্পন্ন হয়েছে।’

টেকনাফ সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৯ মে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে একাধিক দলিলের মাধ্যমে জমিগুলো কেনা হয়।

Screenshot_2026-06-17_065518

এর মধ্যে আবদুর রহমানসহ কয়েকজনের কাছ থেকে ২২ শতাংশ জমি, দলিলমূল্য ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা; জোসনা বেগম গংয়ের কাছ থেকে ৪৪ শতাংশ জমি, মূল্য ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা; মোহাম্মদ হোসেন গংয়ের কাছ থেকে ৩৫ শতাংশ জমি, মূল্য ১০ লাখ ৭ হাজার টাকা; মোহাম্মদ ইসলাম গংয়ের কাছ থেকে ৪৫ শতাংশ জমি, মূল্য ১৩ লাখ টাকা এবং আবদুল জলিল গংয়ের কাছ থেকে ২৯ শতাংশ জমি, মূল্য ৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা হিসেবে কেনা হয়।

ইনানী সৈকতে স্ত্রী ও মেয়েদের নামে জমি

উখিয়ার ইনানী সৈকতসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভ এলাকায় বেনজীরের স্ত্রী জীসান মীর্জা এবং তিন মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর, তাহসিন রাইশা বিনতে বেনজীর ও জারা জেরিন বিনতে বেনজীরের নামে মোট ৭২ শতক জমির তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য শামসুল আলম জানান, জমিগুলো কেনার ক্ষেত্রে তিনি সহায়তা করেছিলেন এবং এখনো সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি।

দলিল অনুযায়ী, ২০০৯ সালে স্ত্রী জীসান মীর্জার নামে ৪০ শতক জমি কেনা হয়, যার দলিলমূল্য ছিল ৫ লাখ টাকা। পরে তার নামে আরও ১০ ও ৭ শতাংশ জমি কেনা হয়, যার মূল্য যথাক্রমে ১৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা এবং ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এ ছাড়া তিন মেয়ের নামে ১৫ শতাংশ জমি ক্রয় করা হয়, যার দলিলমূল্য দেখানো হয়েছে ২৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।

সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, চাকরিকালীন সময়ে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা তার পরিবারের সদস্যরা সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া নির্দিষ্ট সীমার বেশি স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ ক্রয়-বিক্রয় করতে পারেন না। আড়াই লাখ টাকার বেশি মূল্যের সম্পত্তি কেনাবেচার ক্ষেত্রেও অনুমোদনের বিধান রয়েছে।

তবে বেনজীর আহমেদ এসব জমি ক্রয়ের আগে সরকারের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে টেকনাফ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাকিব হাসান চৌধুরী জানান, ২০১২ সালের ২০ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেন্ট মার্টিনসহ টেকনাফ উপজেলার আটটি মৌজায় জমি ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য জেলা প্রশাসনের অনুমোদন প্রয়োজন। বেনজীরের ক্ষেত্রে এমন অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই।

44

পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় জমি ক্রয়

সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে ১৯৯৯ সালে পরিবেশ অধিদফতর প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। দ্বীপে অনিয়ন্ত্রিত জমি বেচাকেনা ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ রোধে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সেন্ট মার্টিন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে।

বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, রাজধানীর গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক হিসাব এবং বিও হিসাবসহ বিপুল সম্পদের তথ্য উঠে আসে। আদালতের নির্দেশে এসব সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

দুদকের কক্সবাজার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের তৎকালীন উপপরিচালক সুবেল আহমেদ ২০২৪ সালের ১০ জুন জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে বেনজীর পরিবারের কক্সবাজারে থাকা সম্পদ তদারকির জন্য জেলা প্রশাসনকে রিসিভার নিয়োগের অনুরোধ জানান। চিঠির সঙ্গে আদালতের আদেশে জব্দ হওয়া সম্পদের তালিকাও সংযুক্ত করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আদালতের আদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় সেন্ট মার্টিন ও ইনানী এলাকায় বেনজীর পরিবারের নামে থাকা জমিগুলো জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

গত ১২ জুন সংযুক্ত আমিরাতে দেশটির পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন সাবেক এই বিতর্কিত পুলিশ প্রধান। ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের আগে থেকে তিনি পলাতক ছিলেন। অবশেষে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে গ্রেফতার করানো হয়।

গত রোববার (১৪ জুন) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদ অধিবেশনে জানান, শিগগিরই বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। সেই মতো ইতোমধ্যে আমিরাত সরকারকে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। তবে বেনজীরকে দেশে আনা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এএইচ 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর