রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ঢাকা

‘আবর্জনায়’ সন্তানের ভবিষ্যৎ খোঁজেন আরমান

ইমরান হোসেন পিংকু, যশোর
প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২৬, ০৩:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

‘আবর্জনায়’ সন্তানের ভবিষ্যৎ খোঁজেন আরমান

ভোরের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গে হাতে বাঁশি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন আরমান হোসেন। যশোর শহরের অলিগলি ঘুরে তিনি জানান দেন- ‘ময়লা দেন গো, ময়লা দেন।’ নগরবাসীর ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট, ময়লা-আবর্জনাই তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন। যাদের আমরা সাধারণভাবে ময়লা বা বর্জ্য সংগ্রহকারী বলে জানি, তাদেরই একজন আরমান।

স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে নতুন উপশহরের একটি বস্তিতে ভাড়া থাকেন আরমান। মাস শেষে বেতন যা পান, তা দিয়েই কোনোমতে চলে সংসার। এরই মধ্যে তার স্ত্রী আবার সন্তানসম্ভবা। চিকিৎসক নিয়মিত ওষুধের পাশাপাশি ফলমূল ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সেই পরামর্শ যেন আরমানের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।


বিজ্ঞাপন


আক্ষেপের সুরে আরমান বলেন, ‘ডাক্তারের ফি ৮০০ টাকা, এরপর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তারপর আবার ফলমূল কিনতে হবে। আমাদের মতো নিচু শ্রেণির মানুষের কাছে এসব অনেক সময় বিলাসিতা মনে হয়।’ 

ফল কিনে খাওয়াতে না পারলেও স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য কিছু একটা নিয়ে ফেরার চেষ্টা করেন তিনি। ভৈরব নদের তীরঘেঁষা এলাকায় জন্মানো নানা ধরনের শাকপাতা সংগ্রহ করে বাড়ি ফেরেন। কখনো কখনো ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া ময়লার স্তূপে পাওয়া যায় কিছু ভালো ফল— পেয়ারা, আম কিংবা লিচু। সেগুলো যত্ন করে বেছে নিয়ে আসেন ঘরে। 


বিজ্ঞাপন


 

আরমান বলেন, ‘আমার স্ত্রী নিজে না খেয়ে সন্তানদের হাতে তুলে দেয়। একটা লিচু পেলেও ওরা যে আনন্দ পায়, সেই হাসি দেখে মনে হয় আমার বস্তির ঘরটাও আলোয় ভরে গেছে।’

দুর্গন্ধময় আবর্জনার স্তূপে আরমানের সঙ্গী হয়ে ওঠে ক্ষুধার্ত কুকুর, কাক আর অসংখ্য মাছি। এর মধ্যেই দিনভর ময়লার স্তূপ ঘাঁটতে ঘাঁটতে কখনো তার হাতে আসে ভাঙা প্লাস্টিক, কাগজের কার্টন, পলিথিন, পুরোনো জুতা-স্যান্ডেল, লোহা, টিন বা কাঁচের টুকরো। সেসব বর্জ্য আলাদা করে ভাঙারিওয়ালার কাছে মানভেদে ৩ টাকা থেকে ১৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। সামান্য এই অতিরিক্ত আয়ই সংসারের কিছু প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করে।

তবু আরমানের কষ্ট শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও। তিনি বলেন, ‘লোকে আমাকে ‘ময়লা ওয়ালা’ বলে ডাকে, কেউ কেউ ‘ময়লা ওয়ালা ভাই’ও বলে। কিন্তু সমাজের অনেকেই আমাদের ঘৃণার চোখে দেখে। আমরা দুর্গন্ধ আর নোংরা নিয়ে কাজ করি বলেই হয়তো।’ 

এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে থেমে যান আরমান। তারপর ধীর কণ্ঠে বলেন, ‘আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া— আমার মতো যেন আমার সন্তানদের জীবন না হয়। আমি ময়লা ওয়ালা, কিন্তু আমার সন্তানরা যেন ভালো কিছু হতে পারে।’ 

আরমান একা নন। মিলন, রাজেন, লিটন, বারেক, লিটুসহ আরও অনেক বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিদিন একই রকম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। শহরকে পরিষ্কার রাখতে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও জীবনযুদ্ধে তারা রয়ে গেছেন উপেক্ষিত।

এ বিষয়ে সামাজিক সংগঠন প্রথম বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের সভাপতি এসএম সোহেল বলেন, যা কিছু নোংরা বা উচ্ছিষ্ট হিসেবে আমরা ফলে দেই। সেই দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা সংগ্রহে যারা যুক্ত আছেন এ সমাজে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যে ধর্ম বা গোষ্ঠীর হোন না কেন তাদের প্রতি প্রথম বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের সুদৃষ্টি সবসময়। যশোর পৌরসভা বা রাষ্ট্র চাইলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এসব মানুষদের জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিপরীতে ব্যবস্থা নিতে পারেন।

যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো.  আহসান কবির বাপ্পী বলেন, ময়লা সংগ্রহ ও বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য আলাদা করার কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের পরিবেশ থেকে নানা সংক্রামক রোগ, চর্মরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা হতে পারে। নিরাপত্তার জন্য মাস্ক, ক্যাপ, হ্যান্ড গ্লাভস ও বুট জুতা ব্যবহার করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ বর্জ্য সংগ্রহকারীর কাছেই এসব সুরক্ষা সামগ্রী নেই।’

শহরের মানুষ যখন ঘরের ময়লা বাইরে ফেলে স্বস্তি খোঁজেন, তখন সেই ময়লার মধ্যেই জীবন-জীবিকার সংগ্রাম খুঁজে নেন আরমানরা। সমাজের চোখে তারা হয়তো ‘ময়লা ওয়ালা’; কিন্তু তাদের হাতেই প্রতিদিন পরিচ্ছন্ন থাকে শহর। আর সেই হাতগুলোই নীরবে বয়ে বেড়ায় অভাব, অবহেলা আর সন্তানের জন্য এক টুকরো সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

প্রতিনিধি/ক.ম/ 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর