বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

দখল-দূষণ, প্যারাবন নিধন, অস্তিত্ব সংকটে সোনাদিয়া দ্বীপ

তাহজীবুল আনাম, কক্সবাজার
প্রকাশিত: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:৫৮ পিএম

শেয়ার করুন:

দখল-দূষণ, প্যারাবন নিধন, অস্তিত্ব সংকটে সোনাদিয়া দ্বীপ

প্রাকৃতিক সংরক্ষিত দ্বীপ সোনাদিয়া মারাত্মক পরিবেশগত হুমকির মধ্যে পড়েছে। পর্যটনের নামে সেখানে ঝাউ-প্যারাবন কাটা ও কেয়া উজাড় করে নির্মিত হচ্ছে হোটেল-রিসোর্ট। সুবিধাবাদী কিছু ব্যবসায়ী ইকোট্যুরিজমের নামে ধ্বংস করছে সোনাদিয়া দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। স্পর্শকাতর এই দ্বীপের অস্তিত্ব বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশ ও প্রাণী গবেষকরা।

মহেশখালীর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে জেগে উঠা ত্রিমুখী বেলাভূমি সোনাদিয়া দ্বীপ। সূর্যোদয়ে এখানে সোনা ঝরে। মিষ্টি রোদে দল বেঁধে বেরিয়ে আসে লাল কাঁকড়ার দল।


বিজ্ঞাপন


গাঙচিল-জিরিয়াসহ নানা পাখির বাস এখানে। সোনাদিয়া হয়েই চলাচল করে সাইবেরিয়া, ইউরেশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার পরিযায়ী পাখি। বিপন্ন স্পুন বিল স্যন্ডপাইপারও বিশ্রাম নেয় সোনাদিয়া দ্বীপে।

f6b6d053-f113-4bf3-9887-547d64a47550

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্পর্শকাতর এলাকা বলেই সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় পড়ায় সোনাদিয়াকে ঢেলে সাজাতে চায় কর্তৃপক্ষ। তবে সোনাদিয়ায় এরই মধ্যে কিছু অসাধু পর্যটন ব্যবসায়ী হোটেল-রিসোর্স তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছে। বালিয়াড়ি ভেঙে করা হয়েছে সমতল। পোড়ানো হয়েছে কেয়া-নিশিন্দার বন, কাটা হচ্ছে ঝাউ-প্যারাবন।

গবেষকদের মতে, সোনাদিয়া দ্বীপ একটি সেনসিটিভ এরিয়া, এখানে অতিরিক্ত মানুষের চাপ, স্থাপনা নির্মাণ, প্যারাবন উজাড় চলতে থাকলে বর্ষা-জলোচ্ছ্বাসে দ্বীপটি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এ অবস্থা সোনাদিয়ার জন্য ডেকে আনছে চরম বিপর্যয়।


বিজ্ঞাপন


স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ ও সংশ্লিষ্টদের সহায়তায় তিনতলা বিশিষ্ট কটেজসহ একাধিক অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করছে ভূমিদস্যুরা। স্থানীয়রা মনে করছেন, এসব অবৈধ স্থাপনা দ্রুত উচ্ছেদ না হলে অচিরেই সোনাদিয়ার ঝাউবন সম্পূর্ণ উজাড় হয়ে যাবে।

thumbnail_1000245993

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায় - বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও জনপ্রতিনিধি মিলে এসব কটেজ নির্মাণের সঙ্গে জড়িত রয়েছে।

অভিযুক্তদের একটি পক্ষ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সেন্টমার্টিন ভ্রমণে সীমাবদ্ধতার কারণে সোনাদিয়ায় পর্যটকের চাপ বেড়েছে। “পর্যটকদের সুবিধা বিবেচনায় বন বিভাগের মৌখিক অনুমতি নিয়ে তারা কটেজ নির্মাণ শুরু করেছে।

স্থানীয়রা জানান, সোনাদিয়ায় সরকারি জমি দখল করে রিসোর্ট বা কটেজ নির্মাণে শুধু মহেশখালী বা কক্সবাজার নয়, দেশের অন্যান্য জেলার লোকজনও এখানে জড়িত রয়েছে। এবং কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে অর্থ জোগান দিয়ে এ রিসোর্ট বা কটেজ নির্মাণ ও জমি দখল চলছে ব্যাপকহারে৷

075be499-ce07-4aec-bd3f-63f8f0d0ae85

আরও পড়ুন

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ১১ মাসে ১৫০ মৃত্যু, ছয়লেনের দাবিতে অবরোধ

পরিবেশবাদীরা বলছেন, সরকারের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ভূমিদস্যুদের কাছ থেকে সুযোগ সুবিধা নিয়ে সোনাদিয়ার বনকে বিক্রি করে দিচ্ছে। উপর্যুপরি ঝাউগাছ কর্তন ও স্থাপনা নির্মাণের ফলে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়বে ওই অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর।

সরকার ইতোমধ্যে সোনাদিয়াকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এমতাবস্থায় সেখানে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ আইনত অপরাধ।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৫ মে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল (বেজা) এর অনুকূলে সোনাদিয়া দ্বীপ ও দ্বীপ সংলগ্ন এলাকায় বন্দোবস্তকৃত ৯৪৬৬.৯৩ একর খাসজমির বন্দোবস্ত বাতিল করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো গেজেট না হওয়ায় উক্ত জায়গা ইসিএ এলাকা হিসাবে গণ্য। তবে এখনও উক্ত ভূমি বন বিভাগের অনুকূলে ন্যস্ত করা হয়নি। এমতাবস্থায়, বনভূমি হিসাবে ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ বন আইন অনুযায়ী বন কর্মকর্তারা প্রদত্ত ক্ষমতায় সোনাদিয়া দ্বীপ ও তৎসংলগ্ন ঝাউবন এলাকায় অবৈধ কটেজ ও প্যারাবন নিধন করে অবৈধ চিংড়িঘের ও লবণ মাঠ সমূহের অবৈধ দখলদার মুক্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনে মামলা রজু করার সুযোগ নেই। বর্তমানে ভূমিটি খাস, ও ইসিএ এলাকা খতিয়ানভুক্ত অধিদফতর এবং উপজেলা প্রশাসন আইনগত পদক্ষেপ ও অভিযান পরিচালনা করলে বনবিভাগ সার্বিক সহযোগিতা করবে। উক্ত ভূমি বন বিভাগের অনুকূলে ন্যস্ত করা হলে বন বিভাগের পক্ষে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে৷ 

ab3b105d-48fb-42c9-a422-9e2e580f84b2

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হেদায়েত উল্লাহ বলেন, ইতোমধ্যে কিছু কটেজ বা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে, বাকিগুলোও দ্রুত সরিয়ে ফেলা হবে।

এ ব্যাপারে বন বিভাগের গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা আয়ুব আলী জানান, সরকার সোনাদিয়ার জায়গাটি এখনো বন বিভাগকে বুঝিয়ে দেয়নি৷ উক্ত ভূমি বন বিভাগের অনুকূলে ন্যস্ত করা হলে আমরা পূর্ণ শক্তি নিয়ে কাজ করতে পারব।

ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সচিব শরীফ জামিল জানান, কক্সবাজারের আশপাশের অসৎ পরিকল্পনা এবং প্রকল্পের কারণে সোনাদিয়া দ্বীপ, জীববৈচিত্র্যের হটস্পট এবং স্পুনবিল স্যান্ডপাইপারের আবাসস্থল সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সোনাদিয়াকে রক্ষা করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু কোনও ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা ছাড়াই অপর্যাপ্ত পদক্ষেপের ফলে ধ্বংসযজ্ঞ ত্বরান্বিত হয়েছে, যার ফলে দ্বীপটির দুর্বলতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সোনাদিয়ার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর