নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগীদের জন্য নির্ধারিত খাদ্য সরবরাহে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি তালিকায় প্রতিদিন রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য ও পথ্যাদির উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তার বড় অংশই মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ের ২০২৬ সালের তালিকা অনুযায়ী, প্রতিদিন রোগীদের জন্য নির্ধারিত খাদ্যের মধ্যে রয়েছে উন্নতমানের চাল, ডিম, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি, দুধ ও ফলসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর উপাদান। সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবার মিলিয়ে প্রতিজনের জন্য দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে তার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিজ্ঞাপন
ভুক্তভোগী রোগীরা জানান, সকালে দেওয়া হয় এক পিস পাউরুটি, একটি ছোট সাইজের সিদ্ধ ডিম, সামান্য চিনি ও ছোট আকারের চিনিচাম্পা কলা। তালিকায় নির্ধারিত মান ও পরিমাণ বজায় রাখা হচ্ছে না। দুপুরে মাছ দেওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ দিন দেওয়া হয় মুরগির মাংস, তাও নির্ধারিত ওজনের কম। ডাল এতটাই পাতলা যে “দূরবিন দিয়ে দেখতে হয়”—এমন মন্তব্য করেছেন একাধিক রোগী।
চিকিৎসাধীন রোগী মো. হয়রত আলী, আজিজুল, মিম ও ফিরোজা বেগম বলেন, “ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছি, কিন্তু খাবার ঠিকমতো পাই না। মাছ ছোট, মাংস কম, সবজি প্রায়ই দেওয়া হয় না। অনেক সময় রাতে ১০-১৫ জন রোগী খাবারই পান না।”
হাসপাতালের রান্নার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাবুজি মজনু ফকির বলেন, “আজকে রুই মাছ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ঠিকাদার সিলভার কার্প মাছ দিয়েছে। ডাল পাতলা হওয়ার কারণ—যা দেওয়া হয়, তাই রান্না করি। ঠিকাদার সবকিছুই কম দেন।”
সিনিয়র স্টাফ নার্স (ইনচার্জ) মিল্টন রাকসাম জানান, খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর নিয়মিত খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সোহরাব হোসাইন লিংকন বলেন, “ঠিকাদার মের্সাস চৌধুরী সিন্ডিকেটকে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে ঠিকাদার মের্সাস চৌধুরী সিন্ডিকেটের স্বাধিকারী আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, “আমি বর্তমানে সরাসরি ঠিকাদারি করি না। আমার লাইসেন্স শোয়েব নামে একজন ব্যবহার করছেন। অনিয়মের বিষয়ে আমার জানা নেই।”

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ভর্তি রোগীদের জন্য সরকারিভাবে প্রতিদিন প্রায় ১৭৫ টাকার খাবার বরাদ্দ রয়েছে। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাত, সপ্তাহে নির্ধারিত দিন মাছ, মাংস ও ডিম দেওয়ার কথা। বিশেষ দিনগুলোতে উন্নতমানের খাবার যেমন- পোলাও ও খাসির মাংস দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে বাস্তবে এসবের অনেক কিছুই মিলছে না বলে অভিযোগ।
এ বিষয়ে নেত্রকোনার সিভিল সার্জন ডা. মো. গোলাম মাওলা বলেন, “এর আগে কেউ আমাকে বিষয়টি জানায়নি। আপনার মাধ্যমে এখন জানতে পেরেছি। দ্রুত খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কলমাকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ শামীম বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করা শুধু দায়িত্ব নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকারও। কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই অনিয়ম দ্রুত বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।
প্রতিনিধি/এসএস




