মায়ের সঙ্গে ঈদ করার জন্য স্ত্রী ও ছয় মাসের এক সন্তানকে ঢাকায় রেখে বাড়ি ফিরছিলেন রায়হান। ঈদের দিন রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নোয়াখালীর উদ্দেশে ছেড়ে আসা মামুন পরিবহনে রওনা হন ঢাকা থেকে নোয়াখালীর উদ্দেশে। পথে কুমিল্লা পদুয়ার বাজারে ট্রেনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান রায়হানসহ আরও ১২ জন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত মোহাম্মদ রায়হান নোয়াখালী সদর উপজেলার চর মটুয়া ইউনিয়নের ফাজিলপুর গ্রামের মৃত মোহাম্মদ সেলিমের ছেলে। পরিবারে এক ভাই এক বোনের মধ্যে বড় মুহাম্মদ রায়হান। ছোটবেলা থেকে ঢাকাতে বড় হলেও ঈদ করতেন দেশের বাড়িতে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে নিজের তিল তিল করে গড়ে তোলা জুতার ব্যবসা সামলে রায়হান চেয়েছিলেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। কয়েক বছর আগে বাবাকে হারিয়ে মা, এক ভাই আর এক বোনের পুরো দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এই বড় সন্তান। কন্যা সন্তান রাহিয়া ও স্ত্রী নুসরাত এবং মা রেহেনা বেগমকে নিয়ে ঢাকায় কামরাঙ্গীচরে নিয়মিত বসবাস করতেন। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস, একমাত্র ভরসা।

চার বছর আগে স্বামী সেলিমকে হারিয়েছেন, এখন একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা রেহেনা বেগম, অন্যদিকে স্ত্রী নুসরাত হয়ে পড়েছেন শোকে দিশেহারা। কুমিল্লার ট্রেন-বাস দুর্ঘটনা যেন এই পরিবারের সব সমীকরণ ওলটপালট করে দিল।
নোয়াখালীর চরমটুয়া ইউনিয়নের ফাজিলপুর গ্রামের ‘মৌলভি বাড়ি’তে হয়ত ভোর থেকেই রায়হানের জন্য অপেক্ষা ছিলেন তার মা। প্রিয় কোনো খাবার রান্না করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু সেই ভোরে দরজায় কড়া নাড়লো, রায়হানের ফেরার খবর নয়, বরং তার চিরতরে চলে যাওয়ার সংবাদ এলো।
বিজ্ঞাপন
নিহতের স্ত্রী ইসরাত জানান, রায়হানের ৬ মাস বয়সি সন্তানটি এখনো জানে না তার বাবা আর কখনো তাকে কোলে তুলে নেবে না। বাবার আঙুল ধরে হাঁটা শেখার আগেই তাকে এতিম হতে হলো। যে জুতার ব্যবসা দিয়ে রায়হান সবার জীবন সুন্দর করতে চেয়েছিলেন, সেই স্বপ্নগুলো আজ কুমিল্লার রেললাইনের ধুলোয় মিশে গেছে।
রায়হানের এই বিদায়ে একটি পরিবার শুধু একজন সদস্যকেই হারায়নি, হারিয়েছে তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনকে। সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিটি সংখ্যাই এক একটি রায়হান, এক একটি চুরমার হওয়া স্বপ্ন।
রায়হানের মামা মো. হাজি মানিক জানান, রায়হানের পরিবারের এক ভাই এক বোন, সে সবার বড় । তার বাবা মারা গেছে চার বছর আগে। ঢাকা কামরাঙ্গীরচরে নিজেই একাই জুতার ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তার মা ঈদের তিনদিন আগে বাড়িতে এসেছিলেন। পরিবারের তার স্ত্রী ও ছয় মাসের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। সে তার মায়ের সঙ্গে ঈদ করার জন্য ঈদের দিন রাতে রওনা হয়।
তার বাবার মৃত্যুর পর এই প্রতিষ্ঠানটি সে নিজ হাতে তৈরি করে। এই প্রতিষ্ঠান দিয়ে তাদের পরিবার খুব ভালোই চলছিল, কিন্তু এই অ্যাক্সিডেন্টে তাদের পরিবারের সব শেষ।
রায়হানের চাচা হুমায়ুন কবির বলেন, রায়হান ফ্যামিলিসহ তার মা ও স্ত্রী ঢাকাতেই থাকে। তার মা ঈদ করার জন্য বেড়াতে আসছিল। রায়হান ঈদ করছে ঢাকাতে। ২৮ রমজানের সময় তার মাকে দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তার বাবা চার বছর আগে ঢাকায় স্ট্রোক করে মারা যায়। মায়ের সঙ্গে ঈদ করার জন্য সেই নোয়াখালীতে আসছিল। রাহানে তাদের পরিবারের উপার্জনের একমাত্র ব্যক্তি। বাড়িতে শুধু তার বোন থাকে। মাঝে মাঝে তারা এখানে বেড়াতে আসে।
ফোনের ওপাশে থাকা বৃদ্ধা মাকে বলেছিল, মায়ের সঙ্গে ঈদ করবে রায়হান। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে মায়ের সঙ্গে দেখা হলো ঠিকই, তবে রায়হান ফিরলেন নিথর দেহে, সাদা কাফনে মোড়ানো অবস্থায়। রাহানের এই মৃত্যু যেন একটি স্বপ্নের অকাল মৃত্যু।
প্রতিনিধি/এসএস

