খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনেকটা অসহায় মানুষের নিরাপদ খাদ্যের দায়িত্বে থাকা নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর। সংস্থাটির খুলনা মেট্রোর প্রায় দশ লাখ ভোক্তার বিপরীতে জনবল মাত্র দু’জন। তার মধ্যে খাদ্য অফিসারের পদ খালি। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিসার। খাদ্যের মান পরীক্ষার ল্যাব থাকলেও নেই টেকনোলজিস্ট। কাঁচা মাছ ও মাংসসহ জনগুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরীক্ষার নেই কোনো ব্যবস্থা। ফলে সদিচ্ছা থাকলেও ভেজাল খাদ্য শনাক্ত ও অভিযান পরিচালনায় অনেকটাই হিমশিম খেতে হয় সংস্থাটির। জনবল ঘাটতির কারণে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
মেট্রোপলিটন নিরাপদ খাদ্য অফিসের গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের ১০ তারিখ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ ও মিনি ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়েছে ২৪২টি, মোবাইল ল্যাবে ৩৫০টি। এর মধ্যে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে ২০টি। এর মধ্যে ভেজাল শনাক্ত হয় মোট ১৬০টিতে। সংস্থার মেট্রো অফিস চলতি বছরে ২শ অভিযান বা মনিটরিং করেছে। যার মধ্যে ৪ প্রতিষ্ঠানকে চার লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ সংক্রান্তে পুরো বছরে দুটি মামলা হয় নিরাপদ খাদ্য আইনে, যা ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পরীক্ষার সক্ষমতা নেই যেসব পণ্যের
জেলা ও মহানগর অফিসের জনগুরুত্বপূর্ণ খাদ্য পণ্যেগুলোর মান যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। পণ্যগুলো হলো— গুড়, ডালডা, সরিষার তেল, গুড়া দুধ, কাঁচামাছ ও মাংস, নমুনায় হেভিমেটালের পরিমাণ, মুরগি ও গরুর খাবার, মার্জারিন, মাখন, ফুড এডিটিপস শনাক্তকরণ, ফুসকা, বেসন, আইসক্রীম, সেমাই, পাস্তা, চিপস। এসব পণ্যের মান যাচাইয়ে পাঠাতে হয় ঢাকায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মহানগরের দায়িত্বে আছেন একজন অফিসার ও অফিস সহকারী। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য অফিসারের পদটি খালি। অতিরিক্ত হিসেবে জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ দিকে ল্যাব থাকলেও সেখানে ল্যাব টেকনোলজিস্ট না থাকায় পরীক্ষা নিরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। একটি মাত্র ভ্রাম্যমাণ ল্যাব পুরো বিভাগজুড়ে ঘুরে ঘুরে কাজ করছে।
ভোক্তারা বলছেন, প্রতিনিয়ত আমরা ভেজাল খাবার খাচ্ছি। বিভিন্ন গবেষণায় খাদ্য যে পরিমাণ হেভিমেটাল শনাক্ত হচ্ছে তা অশনি সংকেত। সরকার শত শত কোটি টাকা অপ্রয়োজনীয় নানা খাতে ব্যয় করে। দুর্নীতি, অর্থ পাচারসহ নানা উপায়ে লুটপাট হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা। অথচ মানুষের জীবন ধারণের জন্য যে খাদ্য সেটাকে নিরাপদ নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেই। একটি বিভাগীয় শহরে মাত্র দু’জন জনবল, তার ওপর কার্যকর কোনো ল্যাব নেই! মানুষের জীবন রক্ষাকারী খাদ্য নিশ্চিতে আধুনিক ল্যাবরেটরি, জনবল সংকট ও আইনের প্রয়োগ জরুরি।
বিজ্ঞাপন
জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্যে ভেজাল এখন আর জনস্বাস্থ্যের উদ্বেগ নয়, এটি একটি সামাজিক ও কাঠামোগত সংকট। অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অসুস্থ হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগের মতো জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, নিরাপদ খাদ্য মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গগুলোর অন্যতম। সরকার বিভিন্ন দপ্তরে অপ্রয়োজনীয় কত বাজেট দেয় অথচ নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের নামে নামমাত্র একটি দপ্তর রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল সেখানে দেওয়া হয় না। ফলে ভেজাল প্রতিরোধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায় না। অধিকাংশ মানুষ জানেই না তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে এমন একটি দপ্তর রয়েছে। মানুষের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে জনবল বৃদ্ধি করে সরকারের এ দপ্তরকে শক্তিশালী করা দরকার।
খুলনা মেট্রোপলিটন নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোখলেসুর রহমান জানান, কাজের যে ব্যপ্তি, সেক্ষেত্রে জনবল সংকট তো রয়েছে। তবে জনবল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে জেনেছি। এ ছাড়া খুলনায় আধুনিক ল্যাব তৈরি প্রক্রিয়াধীন। জনবল নিয়োগ এবং মানসম্মত ল্যাব তৈরি হলেও সংকট কেটে যাবে।
প্রতিনিধি/টিবি

