কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন ভবন। সেই সঙ্গে রয়েছে আধুনিক সব যন্ত্রপাতি। অথচ জেলা ও উপজেলার সরকারি হাসপাতালে আড়াইশোর বেশি জনবল সংকট। এ কারণে করা যায় না সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। মুমূর্ষু রোগীদের দায়সারা সেবা দিয়ে পাঠানো হয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এতে মাঝপথে মৃত্যু হচ্ছে অনেকের। দীর্ঘ দিনেও পাল্টায়নি সরকারি হাসপাতালগুলোর এমন চিত্র। সিভিল সার্জন বলছেন, জনবল নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত দেড় বছরের ছেলে ইয়াকুবকে নিয়ে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা ১০০ শয্যা হাসপাতালে আসেন যাদুয়ারচর গ্রামের বাসিন্দা মা খাদিজা আক্তার। চিকিৎসক এই রোগীকে ভর্তি করিয়েছেন। কিন্তু ২৪ ঘণ্টায়ও কাঙ্ক্ষিত সেবা পায়নি এই রোগী। পরে বাধ্য হয়ে শিশুকে নিয়ে খাদিজা চলে যান ঢাকা মেডিকেলে। অথচ ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্প্রতি ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যা হাসপাতাল নির্মাণ করা এখানে। গুয়াতলা মৌজায় চকচকে ভবন দাঁড়িয়ে থাকলেও এখানে নেই মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা।
বিজ্ঞাপন

একই অবস্থা ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতালেরও। জনবল সংকটে এখানে থাকা আইসিইউ, সিটিস্ক্যান মেশিন, ডিজিটাল এক্সরে, আল্টাসনোগ্রাম মেশিনসহ অধিকাংশই যন্ত্রপাতি থাকে অলস পড়ে। আর মুমূর্ষু রোগীদের দায়সারা সেবা দিয়ে পাঠানো হয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এতে মাঝপথে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকেই।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, জেলা সদর ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি হন প্রায় ৫০০ রোগী। বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিতে থাকেন কয়েক হাজার মানুষ। একের পর এক নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন ভবন। বাড়ানো হচ্ছে হাসপাতালের শয্যাও। অথচ নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়নি কোনো জনবল। এতে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে ক্ষুব্ধ জেলাবাসী।
_20250822_225550530.jpg)
বিজ্ঞাপন
জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর জেলা সদর হাসাপাতালে ১৬৪ জনবলের বিপরীতে আছে ১৩৫ জন। খালি পদের সংখ্যা ৩০টি। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে সাতজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ। আর কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২২০ জনবলের বিপরীতে আছে ১৪৪ জন। খালি পদের সংখ্যা ৭৬টি। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে ১৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ।
এদিকে রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯৯ জনবলের বিপরীতে আছে ১৪১ জন। খালি পদের সংখ্যা ৫৮টি। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে ছয়জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ এবং শিবচর ১০০ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৫৩ জনবলের বিপরীতে আছে ১৬৭ জন। খালি পদের সংখ্যা ৮৬টি। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে ১০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ। আর ২০ শয্যাবিশিষ্ট কবিরাজপুর হাসপাতালের ২৫ জনবলের বিপরীতে আছে সাতজন। খালি পদের সংখ্যা ১৬টি। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে পাঁচজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ।
খাদিজা আক্তার বলেন, ‘সারারাত আমার সন্তান কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু এখানে কেউই কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে আসেনি। পরে বাধ্য হয়ে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছি। আমরা বার বার নার্সদের বলছিলাম চিকিৎসা দিতে, তারা শুধু বাজে ব্যবহারই করে যাচ্ছিল। সরকারি হাসপাতালে এমন সেবা পাওয়া দুঃখজনক।’
_20250822_225532364.jpg)
শিবচর উপজেলার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম আকাশ বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে। অথচ নামে মাত্র সেবা দিয়ে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, নয়তো পাঠানো হয় প্রাইভেট ক্লিনিকে। আমরা এই সমস্যা থেকে মুক্তি চাই।’
মাদারীপুর সদর উপজেলার পূর্ব ছিলারচরের বাসিন্দা হুমায়ুন ফকির বলেন, ‘কত সুন্দর একটা ভবন বানানো হয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচও করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সেবাই মিলছে না। নতুন ভবন নির্মাণ না করে জনবল নিয়োগ দেওয়া উচিৎ। তাহলে রোগীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবেন।’
শিপন হুসাইন নামে এক রোগী বলেন, ‘২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি হবার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রাইভেট ক্লিনিকে করতে হয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়েছে। সরকারি এই হাসপাতালে তেমন কোনো ওষুধও পাইনি। এটি নামেমাত্র সরকারি হাসপাতাল। আর গুরুতর রোগীকে এখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পাঠিয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মাঝপথে অনেকের মৃত্যু হয়। এই অন্যত্র পাঠানোর পদ্ধতি বন্ধ করা উচিৎ।’
_20250822_225612374.jpg)
জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে কিছু সংখ্যক চিকিৎসক থাকলেও যোগদানের পরপরই অনেকেই অন্যত্র চলে যাচ্ছেন তারা। তাই সেই পদে নতুন কাউকে পদায়নও করা যাচ্ছে না।
অবশ্য জনবল সংকটের ঘাটতি পূরণে কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানান জেলার সিভিল সার্জন ডা. শরিফুল আবেদীন কমল। তিনি বলেন, জেলার সবগুলো সরকারি হাসপাতালেই জনবল সংকট। বার বার চিঠি দেওয়া হচ্ছে, মৌখিকভাবে জানানোও হয়েছে। কিন্তু জনবল নিয়োগ দিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তারপর আবারো এ ব্যাপারে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হবে।
প্রতিনিধি/ক.ম/

