নদীবিধৌত গাইবান্ধার চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে মানুষ অবহেলিত থাকলেও এখন সেখানেই গড়ে উঠছে গবাদিপশু-পাখি পালনের উপযোগী এক নীরব স্থান। কৃষি নির্ভর চরবাসী ইতোমধ্যে দুধ ও মাংস উৎপাদনের মাধ্যমে যাচ্ছে অর্থনীতির গতি। এখানে সম্ভাবনার দুয়ার যেমন উন্মোচন হচ্ছে তেমনি তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নের দারুণ সুযোগ।
কৃষি কাজে যুক্ত স্থানীয় কৃষক ও গবাদি পশু পালনকারী খামারিরা বলছেন, গরু-মহিষ হচ্ছে তাদের ভবিষ্যতের পুঁজি। যা তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিতের সময় অসহায় কৃষক ও খামারির সহায় হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের আয় স্থিতিশীল রাখে এই খাত।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি গাইবান্ধার এরেন্ডারবাড়ি ও কামারজানি চরসহ বিভিন্ন চর ঘুরে দেখা যায়, চরে গরু-মহিষ ছাড়াও ছাগল-ভেড়া পালনে সফলতার পাশাপাশি বিশেষ করে নারীরা তাদের আত্মকর্মস্থানের পথ বেছে নিয়েছে। এখানে প্রায় ৪৭ থেকে ৫০ শতাংশই গবাদিপশু পালন করা হয়। উন্মুক্ত চারণভূমি প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক খাদ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতার কারণে চরাঞ্চলের পশু দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং রোগবালাই তুলনামূলক কম হয়। ফলে উৎপাদন ব্যয়ও কম হয়ে থাকে। চরে অধিকাংশ সময় দেখা যায় চোখ জুড়ানো হেক্টরকে হেক্টর ভুট্টার আবাদ। ভুট্টার সাইলেজ ও সবুজ পাতা গবাদিপশুর খাদ্যের যোগান ও চাহিদা মেটাতে বিশাল ভূমিকা পালন করে থাকে। এ কারণে দুধ উৎপাদনের দিক থেকে চরাঞ্চলের অপার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য হিসাবে ধরা হয়ে থাকে।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে চরাঞ্চলের অধিকাংশ খামারি দেশি গাভি পালন করে থাকেন। অনেক খামারিদের আবার দুই চাঁরটি গরুর সঙ্গে মহিষও আছে ঘরে। দেশি গাভিগুলো দৈনিক গড়ে দেড় থেকে দুই লিটার দুধ দেয় এবং মহিষের দুধ বাজারে চাহিদা থাকায় মহিষের জাত ভিত্তিতে উন্নত জাতের প্রায় একটি মহিষ গড়ে ১৮ থেকে ২০ লিটার দুধ দিতে সক্ষম। ভালো জাতের একটি মহিষের দুধ উৎপাদন নির্ভর করে তার জাত, খাবার, যত্ন ও পরিবেশের ওপর। মহিষের দুধে গরুর দুধের তুলনায় ফ্যাট বেশি (৬–৮ শতাংশ বা তার বেশি)। তাই ঘি ও দই বানাতে খুব ভালো ও উপযোগী। ভালো খাবার (ঘাস, ভুসি, খৈল), পরিষ্কার পানি ও নিয়মিত চিকিৎসা পেলে দুধ বাড়ে।
বিজ্ঞাপন

কামারজানির গোঘাট গ্রামের বাসিন্দা তোলাপি বেগম জানান, গরু পালন করে তার সারাদিন সময় কাটে। সন্তানের মতো লালন পালন করে বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি তার পরিবারে আয়ের যোগান দিয়ে আসছেন। পর্যাপ্ত সরকারি সুবিধা পেলে বহুদূর এগিয়ে যেতে চান তিনি।
ফুলছড়ির ফজলুপুর চরের খামারি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তার খামারে ১৫টি গরু রয়েছে এবং মাঠে পর্যাপ্ত ঘাস থাকায় কেনা খাবারের তেমন প্রয়োজন হয় না। পশুর রোগবালাইও তুলনামূলক কম।

নজরুল ইসলাম নামের আরেক কৃষক বলেন, চরে গরু পালনে খরচ খুবই কম। তবে পশুগুলোর যত্ন নিতে হয় সর্বক্ষণ। আয় ভালো হওয়ায় দুধ বিক্রি করে তার ভালোভাবে সংসার চলছে। যদি বাজারব্যবস্থা আরও উন্নত হয়, তাহলে খামারিরা লাভবান হবে।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চরাঞ্চল দুধ উৎপাদনের বড় ঘাটি ও সম্ভাবনাময় অঞ্চল। উন্নত জাতের সিমেন ব্যবহার ও নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা গেলে উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। আমরা খামারিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যাতে তারা আধুনিক পদ্ধতিতে পশু পালন করতে পারেন। তাই সু-নিদিষ্ট প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে খামারিদের আত্ননির্ভরশীল করার প্রচেষ্ঠা চলমান রয়েছে।
প্রতিনিধি/এসএস

