বৃহস্পতিবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৫, ঢাকা

ভিন্নরূপে রাজশাহীর সড়ক, জনমনে স্বস্তি

আমানুল্লাহ আমান, রাজশাহী
প্রকাশিত: ৩০ মার্চ ২০২৫, ০২:৫২ পিএম

শেয়ার করুন:

loading/img

দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর ভিন্নরকম সড়ক পেয়েছেন রাজশাহীবাসী। এবার ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সড়কে দীর্ঘ যানজটে দুর্ভোগ হয়নি। নগরীজুড়ে সর্বোচ্চ ফোর্স মোতায়েন করে নিরবিচ্ছিন্ন যান চলাচলে ভূমিকা রেখেছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এছাড়া ঈদে সড়কে শৃঙ্খলা তৈরি ও যানজটমুক্ত রাখাকে ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে গ্রহণ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তাদের বাড়তি তদারকিতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি স্থানীয় বাসিন্দাদের।

জানা গেছে, নগরীর সবচেয়ে বড় মার্কেট ঘিরে সাহেব বাজার জিরো পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি মানুষের আনাগোনা হয়। সবচেয়ে ব্যস্ততম এরিয়া এটি। প্রতিবছর ঈদের সময় শালবাগান থেকে রেলগেট হয়ে নিউ মার্কেট, অলোকার মোড়, রানীবাজার ও গণকপাড়া মোড় পর্যন্ত দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার যানজট হয়ে থাকে। অপরদিকে কোর্ট থেকে সিএন্ডবি মোড় ও লক্ষিপুর হয়ে মনিচত্বর ও জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত যানজটের কবলে পড়তেন নগরীর বাসিন্দারা। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মূল ফটক, বিনোদপুর, কাজলা ও তালাইমারি আলুপট্টি মোড় হয়ে কুমারপাড়া দিয়ে সাহেব বাজার পর্যন্ত লেগে থাকতো তীব্র যানজট।


বিজ্ঞাপন


Raj_3

সরেজমিনে ঘুরে এবার ব্যতিক্রম চিত্র দেখা গেছে। দিনের বেলা দীর্ঘ যানজট ছিল না কোনো সড়কেই। দুপুরে ঈদবাজারে ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও সড়ক ছিল প্রায় ফাঁকা। যদিও ইফতারির পর কিছুটা যানজট তৈরি হয় নিউ মার্কেট ও সাহেব বাজার এলাকায়।

নগরীর অনেকেই বলছেন, এবার কোথাও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়নি তাদের। এতে সময়ের অপচয় রোধ হয়েছে। সেজন্য জোরজবরদস্তি করে বাড়তি ভাড়াও আদায় করেননি ক্ষুদে যান চালকরা। এছাড়া এ বছর উপজেলা থেকে কেনাকাটা করতে এসেও সময়ের অপচয় হয়নি।

মোহনপুর থেকে সাহেব বাজারে ঈদের মার্কেট করতে এসেছেন মো. বোরহান উদ্দিন নামে এক যুবক। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, সাহেব বাজারে আমি প্রতি ঈদে ২০ বছর থেকে আমি সেই ছোটবেলা থেকে মার্কেট করি। ওদিকে নওহাটায় জ্যাম লাগে, এদিকে আমচত্বরে আরেকটা জ্যাম হয়। রেলগেটের আগে স্টেডিয়ামের সামনে থেকে সাহেব বাজার পর্যন্ত লম্বা যানজট হতো। কিন্তু এবার কোনো জ্যামে পড়তে হয়নি।


বিজ্ঞাপন


Raj_2

বোরহান উদ্দিন বলেন, আগে মার্কেট পৌঁছতেই লাগত কমপক্ষে ২ ঘণ্টা, এবার মাত্র ৪৫ মিনিটে পৌঁছে গেছি। জ্যামে আটকে থাকার সময়টাতে কেনাকাটা কমপ্লিট করে এখন বাসায় ফিরে যাচ্ছি।

পুঠিয়ার বানেশ্বরের খাইরুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের বানেশ্বর বাজারে জ্যাম হয়। এরপর কাটাখালি থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত লম্বা গাড়ির সারি থাকে। এটা ঢাকা রোড, তাই বড় বড় বাসগুলো যাতায়াত করে, ম্যালা ভিড় হয়। কিন্তু এবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছেলেরা সড়কে ছিল। কোনো যানজট হয়নি এ বছর।

Raj_4

ইসরাইল আলম নামে নগরীর এক বাসিন্দা ঢাকা মেইলকে বলেন, সড়কে এ বছর আগের চেয়ে ভালোই অবস্থা মনে হয়েছে। জ্যাম কমেছে। কিন্তু আসল সমস্যা যেটা, আইন সবার জন্য সমান না। আইন শুধু গরিবের ওপর খাটানো হচ্ছে। এই দ্যাখেন রাস্তার ওপর মাইক্রো-প্রাইভেট কার রেখেছে, অর্ধেক রাস্তা দখল করে রেখেছে। ক্যান? এখানে কোনো রিকশা দাঁড়ালে মাইর‌্যা হটিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ধনীদের গাড়ি আছে, কিছু বলছে না। এরকমটা বৈষম্য কেন এখানে?

এসময় এক রিকশাচলক এগিয়ে এসে বলেন, আমরা নাকি জ্যাম লাগাই। আমারেক এক রাস্তা দিয়ে ঢুকলে আরেক রাস্তা দিয়্যা বাইর (বের) হতে দেয় না জ্যাম হবে তাই। এগুলা গাড়ি (প্রাইভেট কার, মাইক্রো) রাস্তার উপর থুইয়্যাছে (রেখেছে), এ্যারেক (এদেরকে) কিছু বুইলছে না। এগুলা হটা (সরিয়ে) দিক, জ্যাম ইক্টুও (একটুও) থাইকবে না।

Raj_5

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জোর দাবি উঠছে। এ ব্যপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহীর সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, কয়েক বছর আগে শহরজুড়ে সিসিটভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল। মনিটর করার জন্য অবজারভেশন সেল হয়েছিল। সেইটা অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল। বছর তিনেক আগে সেটা ছিল এবং ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল। রহস্যজনক কারণে ক্রমেই আস্তে আস্তে ক্যামেরাগুলো নষ্ট হতে থাকে। ৫ আগস্ট সাইবার ক্রাইম ইউনিটের মনিটরিং সেল ধ্বংস হয়। কিন্তু ক্যামেরা নষ্ট হয়েছে অনেক আগেই। তারপর এখন আর কিছুই থাকল না।

আরও পড়ুন

ঈদের ছুটিতে নোয়াখালীর যেসব দর্শনীয় স্থানে বেড়াবেন

তিনি বলেন, আধুনিক যুগে এটাই সামধান। রাস্তায় রাস্তায় পুলিশ বাহিনী কত জায়গায় থাকবে? সিঙ্গাপুরে এই সিস্টেম আছে, আধুনিক সিস্টেমে রাস্তা-ঘাট অলিগলিতে সিসি ক্যামেরা রাখা ও মনিটরিং করা জরুরি। তাছাড়া শুধু পুলিশ দিয়ে হবে না। নাগরিকদের সম্পৃক্ত করতে হবে। অনেক ভালো ভালো যুবক ও তরুণ রয়েছেন, ছাত্র রয়েছেন, যাদেরকে কাজে লাগিয়ে সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে। তারা এসব ব্যাপারে রিপোর্ট করবে এবং পুলিশ গিয়ে অ্যাকশন নিবে। মানুষকে নিয়ে কাজ করার ধারণাটাই আমাদের নেই। এছাড়া আরেকটি উপায় আছে, কমিউনিটি পুলিশিংয়ে জোর দেওয়া।

Raj_6

অবশ্য এবার সড়কে সড়কে স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। নগরীর সাহেব বাজার জিরো পয়েন্ট, সোনাদিঘির মোড় ও মনিচত্বর এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সঙ্গে রেড ক্রিসেন্ট ও রোভার স্কাউট সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী রোভার স্কাউট দলের প্রধান (রোভারমেট) মো. শাওন আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এবং দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দুই শিফটে আমরা সড়কে দায়িত্ব পালন করছি। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আমাদের ১৬ জন সদস্য ডিউটি করছেন। দুপুরে তাপমাত্রা বেশি, সেজন্য গাড়ির চাপ কম। যানজটও এ বছর নেই।

রেড ক্রিসেন্টের রাজশাহী সিটি ইউনিটের যুব স্বেচ্ছাসেবক মো. মোরশালিন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা ৫টি পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করছি। সারাদিনই আমাদের সদস্যরা সড়কে ট্রাফিক পুলিশকে সহযোগিতা করছেন। জিরো পয়েন্ট এরিয়ায় সবেচেয়ে বেশি যানজট হয়। তাই আমরা এখানে আছি। ছোট গাড়িগুলোতে দ্রুত যাত্রী নামিয়ে চয়ে যেতে বলছি। তারাও আইন মানছে। ফলে যানজট এবার সেরকম নাই।

Raj_1

এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাজশাহী জেলার আহ্বায়ক নাহিদুল ইসলাম সাজু ঢাকা মেইলকে বলেন, ফ্যাসিবাদের পতনের পর এটিই দেশবাসীর প্রথম ঈদ। মানুষকে ঈদে নিরাপত্তা প্রদানে ও সড়কে নির্বিঘ্নে যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা সেই লক্ষ্যে নিজেদের প্রস্তুতি গ্রহণ করি। রাজশাহীর সর্বত্র শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের সঙ্গে মিটিং করি। রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কে আমাদের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া উপজেলাগুলোতেও আমাদের বাড়তি দায়িত্ব ছিল। মানুষ নিশ্চিন্তে ঈদ উদযাপনের সুযোগ পেয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও রাজশাহী বিভাগীয় প্রতিনিধি ফাতিন মাহদী ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের চাপ অনেক বেড়েছে। যেহেতু আজকে রাত পোহালেই কাল ঈদ; কিন্তু এ বছর রেলে এবং বাসে যাত্রী টিকিট পাওয়া না পাওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত মানুষের চাপসহ প্রতিবছর আরও ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। কিন্তু এবছর যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে। সবাই শান্তিতে ঈদযাত্রা উপভোগ করছেন। যানবাহনের চাপ বাড়লেও রাস্তার খুব বেশি যানজট নেই। শুধু ঢাকা থেকে রাজশাহী না সারাদেশেই এই সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে।

তিনি আরও বলেন, রাজশাহীতে সাহেব বাজার এলাকায় ঈদ উপলক্ষে সন্ধ্যার পরেই ঈদ উপলক্ষে মানুষের অনেক চাপ বাড়ে। কাপড়সহ অন্যান্য সামগ্রী কিনতে মানুষের ঢল দেখা যায়। সেখানে জনসাধারণ নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

Raj_3

এ ব্যাপারে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) ট্রাফিক বিভাগের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিসি) নূর আলম সিদ্দিক ঢাকা মেইলকে বলেন, যানজট বলতে যেটা বোঝায়, সেটা এবার হয়নি। গাড়ি কোথাও কোথাও স্লো চলেছে হয়ত বা দুই মিনিটের রাস্তা তিন মিনিট লেগেছে, কিন্তু একেবারে থেমে থাকতে হয়নি। জ্যামে আটকে থাকতে হয়নি। আমি রাজশাহীতে সর্বোচ্চ সংখ্যক ফোর্স মোতায়েন করেছি। শেষের তিনদিন আমরা স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়েছি। পিক আওয়ারে আমিও গেছি, ভিজিট করেছি, অবস্থা যথেষ্ট সহনীয় আছে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ ব্যবস্থা রেখেছি, যাতে মানুষ সহনীয়ভাবে কেনাকাটা করতে পারে, যাতায়াত করতে পারে।

তিনি বলেন, ২২৩ জন ট্রাফিক সদস্যের বেশিরভাগই দায়িত্ব পালন করছেন। কয়েকজন ইমারজেন্সি ছুটিতে থাকেন। তাছাড়া প্রায় সবাই ডিউটি করছেন। যেহেতু বিকেলের টাইমে বেশি চাপ হয়, সেজন্য ১২৯ জন বিকেলে, আর দুপুরে একটু কম থাকে। সাহেব বাজার যেহেতু মূল পয়েন্ট, সেখানে বেশি সদস্য রাখা হয়েছে।

প্রতিনিধি/এসএস

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর