তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০১ এএম
স্মার্টফোন চার্জ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন ব্যবহারকারীদের সামনে শুধু তারযুক্ত চার্জিং নয়, ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের বিকল্পও রয়েছে। ফোন চার্জ করার জন্য কেবল লাগানোর বদলে চার্জিং প্যাডের উপর স্মার্টফোন রাখলেই চার্জ শুরু হয়ে যায়। ব্যবহারের দিক থেকে ওয়্যারলেস চার্জিং নিঃসন্দেহে সুবিধাজনক। কিন্তু দ্রুত ফোন চার্জ করার প্রশ্ন উঠলেই একটি বিষয় সামনে আসে, ওয়্যারলেস চার্জিং কি তারযুক্ত চার্জিংয়ের মতো দ্রুত কাজ করে?
সহজ উত্তর হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখনও তারযুক্ত চার্জিং দ্রুত গতিতে কাজ করে। তবে এই ব্যবধান আগের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে। আধুনিক ওয়্যারলেস চার্জিং প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুত উন্নত হয়েছে। বিশেষ করে কিউআই২ এবং নতুন কিউআই২ ২৫ ওয়াট প্রযুক্তি ওয়্যারলেস চার্জিংকে আগের তুলনায় অনেক বেশি গতিশীল করেছে। কোন পদ্ধতি আপনার জন্য ভালো, তা নির্ভর করবে আপনি সর্বোচ্চ চার্জিং গতি চান, নাকি ব্যবহারিক সুবিধা, কম তাপমাত্রা এবং বারবার সহজে ফোন চার্জ করার সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তারযুক্ত চার্জিংয়ে চার্জার থেকে ফোনে কেবল এবং চার্জিং সার্কিটের মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যুৎ পৌঁছায়। অন্যদিকে ওয়্যারলেস চার্জিংয়ে চার্জার এবং ফোনের ভিতরের কয়েলের মধ্যে তড়িৎচৌম্বকীয় প্রক্রিয়ায় শক্তি স্থানান্তরিত হয়। এই অতিরিক্ত শক্তি স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় কিছুটা শক্তি নষ্ট হতে পারে। ফোন এবং চার্জারের কয়েল ঠিকভাবে এক লাইনে না থাকলে দক্ষতা আরও কমতে পারে। আধুনিক স্মার্টফোনে তারযুক্ত চার্জিংয়ের ক্ষমতা অনেক বেশি। বিভিন্ন ফোনে ৪৫ ওয়াট, ৬৭ ওয়াট, ৮০ ওয়াট, ১০০ ওয়াট বা তারও বেশি ক্ষমতার দ্রুত চার্জিং দেখা যায়। অন্যদিকে প্রচলিত ওয়্যারলেস চার্জিং সাধারণত কম শক্তিতে কাজ করে। কিউআই২-এর সাধারণ প্রোফাইলে সর্বোচ্চ ১৫ ওয়াট পর্যন্ত চার্জিং সমর্থিত এবং নতুন কিউআই২ ২৫ ওয়াট সেই সীমা বাড়িয়ে ২৫ ওয়াট করেছে।
চার্জারের গায়ে ১০০ ওয়াট লেখা থাকলেই আপনার ফোন ১০০ ওয়াটে চার্জ হবে না। ফোনের নিজস্ব চার্জিং হার্ডওয়্যার সর্বোচ্চ কত শক্তি গ্রহণ করতে পারে, সেটিই আসল বিষয়। কোনো স্মার্টফোন যদি সর্বোচ্চ ৪৫ ওয়াট তারযুক্ত চার্জিং সমর্থন করে, তবে সেটিতে ১০০ ওয়াটের চার্জার ব্যবহার করলেও ফোন সম্পূর্ণ শক্তি নেবে না। ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। ২৫ ওয়াট কিউআই২ চার্জার থাকলেই ফোন ২৫ ওয়াটে চার্জ হবে না। ফোন, চার্জার এবং প্রয়োজনীয় চার্জিং প্রযুক্তির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।
স্মার্টফোন সাধারণত পুরো চার্জিং প্রক্রিয়ায় একই গতিতে চার্জ হয় না। ব্যাটারির চার্জের মাত্রা কম থাকলে বেশি শক্তি দিয়ে দ্রুত চার্জ করা সম্ভব হয়। ব্যাটারি ধীরে ধীরে পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চার্জিং পাওয়ার কমিয়ে দেওয়া হয়। ব্যাটারির মাত্রা যখন শূন্য থেকে কুড়ি শতাংশ থাকে, তখন খুব বেশি চার্জিং পাওয়ার পাওয়া যেতে পারে। কুড়ি থেকে পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত দ্রুত চার্জিং চলতে থাকে। পঞ্চাশ থেকে আশি শতাংশে পৌঁছালে চার্জিং পাওয়ার কমতে শুরু করে। আর আশি থেকে একশো শতাংশে চার্জিং প্রক্রিয়া অনেক ধীর হয়ে যায়। তাই ৮০ ওয়াট চার্জিং সমর্থন করে এমন ফোনও শূন্য থেকে একশো শতাংশ পর্যন্ত পুরো সময় একই গতিতে চার্জ হয় না।
ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের ক্ষেত্রে কয়েলের মধ্যে সরাসরি সংযোগ থাকে না। তারযুক্ত চার্জিংয়ের মতো কেবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরাসরি ফোনে পৌঁছায় না। ওয়্যারলেস চার্জিংয়ে চার্জার এবং ফোনের কয়েলের মধ্যে শক্তি স্থানান্তরিত হয়। ফলে কয়েলের অবস্থান, দূরত্ব এবং চার্জিং প্রযুক্তির উপর সামগ্রিক দক্ষতা নির্ভর করে। এছাড়া ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের সময় অতিরিক্ত তাপ তৈরি হতে পারে। ফোন এবং চার্জিং কয়েল ঠিকভাবে অবস্থান না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ফোনের তাপমাত্রা বেশি বেড়ে গেলে ব্যাটারির সুরক্ষার জন্য ডিভাইসটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জিং পাওয়ার কমিয়ে দেয়। ফলে কাগজে-কলমে একটি নির্দিষ্ট ওয়াটের চার্জার থাকলেও বাস্তবে একই গতিতে চার্জ নাও হতে পারে।
কিউআই২ হলো ওয়্যারলেস পাওয়ার কনসোর্টিউমের তৈরি নতুন প্রজন্মের ওয়্যারলেস চার্জিং মান। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো চৌম্বকীয় অবস্থান নির্ধারণ ব্যবস্থা। পুরোনো ওয়্যারলেস চার্জিং প্যাডে ফোন একটু এদিক-ওদিক হয়ে থাকলে চার্জিং কয়েল সঠিকভাবে মিলত না। কিউআই২-এর চৌম্বকীয় ব্যবস্থা ফোন এবং চার্জারের কয়েলকে সঠিক অবস্থানে রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে শক্তি স্থানান্তরের দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং ভুল অবস্থানের কারণে শক্তির অপচয় কমে যায়। সাধারণ কিউআই২-এ সর্বোচ্চ ১৫ ওয়াট পর্যন্ত চার্জিং সমর্থিত এবং নতুন কিউআই২ ২৫ ওয়াট সেই ক্ষমতা বাড়িয়ে ২৫ ওয়াট করেছে। ওয়্যারলেস পাওয়ার কনসোর্টিউমের পরীক্ষায় সামঞ্জস্যপূর্ণ ফোন প্রায় ৩০ মিনিটে শূন্য থেকে পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
গতি নয়, সুবিধাই ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। ডেস্কে কাজ করার সময় ফোন চার্জিং প্যাডের উপর সহজে রেখে দেওয়া যায়। রাতে ঘুমানোর সময় কেবল খুঁজে লাগানোর ঝামেলা থাকে না। গাড়িতেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ওয়্যারলেস মাউন্ট থাকলে ফোন সহজে চার্জ করা যায়। যারা সারাদিন অল্প অল্প করে ফোনের ব্যাটারি বাড়িয়ে নিতে চান, তাদের জন্য ওয়্যারলেস চার্জিং বেশ কার্যকর হতে পারে। তবে জরুরি দশ মিনিটের চার্জে তারযুক্ত চার্জিং সবসময় বেশি এগিয়ে থাকে। যদি ফোনের চার্জ দশ শতাংশে নেমে যায় এবং বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে মাত্র দশ মিনিট সময় হাতে থাকে, তবে দ্রুত তারযুক্ত চার্জিং অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ৮০ ওয়াট বা ১০০ ওয়াট তারযুক্ত চার্জিং সমর্থনকারী ফোন দ্রুত অনেকটা চার্জ নিতে পারে।
আরও পড়ুন: ল্যাপটপ অতিরিক্ত গরম হওয়ার কারণ কী? ঠান্ডা রাখার উপায় জানুন
তারযুক্ত চার্জিং সবসময় ব্যাটারির জন্য ভালো এবং ওয়্যারলেস চার্জিং সবসময় খারাপ, এমন কোনো সরল নিয়ম নেই। ব্যাটারির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা এবং চার্জিংয়ের ধরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারযুক্ত ও ওয়্যারলেস দুই ধরনের চার্জিং ব্যবস্থাতেই তাপমাত্রা এবং চার্জিং পাওয়ার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে ওয়্যারলেস চার্জিংয়ে ফোন, চার্জার, কেস এবং পরিবেশের উপর নির্ভর করে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হতে পারে। ফোন চার্জ হওয়ার সময় অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে গেলে চার্জিং গতি কমে যেতে পারে। পাতলা এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ফোন কেস সাধারণত সমস্যা তৈরি করে না। কিন্তু খুব মোটা কেস, ধাতব অংশ, চৌম্বকীয় আনুষঙ্গিক বা ফোন ও চার্জারের মধ্যে থাকা অন্য কোনো বস্তু ওয়্যারলেস চার্জিংয়ে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
অনেক ব্যবহারকারীর জন্য তারযুক্ত এবং ওয়্যারলেস দুটো চার্জিং পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। নিয়মিত কাজ, ডেস্কে বসে কাজ করার সময় বা রাতে ঘুমানোর সময় ওয়্যারলেস চার্জিং ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্যদিকে বাইরে যাওয়ার আগে দ্রুত ব্যাটারি বাড়িয়ে নিতে হলে দ্রুত তারযুক্ত চার্জার ব্যবহার করা সুবিধাজনক। শেষ পর্যন্ত, সবচেয়ে দ্রুত চার্জিংয়ের ক্ষেত্রে তারযুক্ত চার্জিং এখনও এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ৮০ ওয়াট, ১০০ ওয়াট বা তার বেশি ক্ষমতার দ্রুত চার্জিং সমর্থনকারী ফোনে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের মূল সুবিধা হলো এর ব্যবহারিক স্বাচ্ছন্দ্য। কিউআই২ এবং কিউআই২ ২৫ ওয়াটের মতো প্রযুক্তির কারণে এই ব্যবধানও ধীরে ধীরে কমে আসছে। তাই গতি যেখানে প্রধান বিষয়, সেখানে তারযুক্ত চার্জিং এবং যেখানে সহজে, বারবার ও ঝামেলাহীনভাবে ফোন চার্জ রাখা প্রয়োজন, সেখানে ওয়্যারলেস চার্জিং বেশি কার্যকর।
এজেড