images

তথ্য-প্রযুক্তি

ফ্রিজ ঠান্ডা না হলে কী করবেন? মেকানিক ডাকার আগে নিজে এই পরীক্ষাটি করুন

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

২৪ মে ২০২৬, ১১:১৯ এএম

বাসা-বাড়ির সবচেয়ে জরুরি ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোর মধ্যে রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ অন্যতম। তবে যেকোনো সময়ই ফ্রিজ হঠাৎ নষ্ট বা বিকল হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ফ্রিজের ভেতরের অংশ ঠিকমতো ঠান্ডা না হওয়া একটি অত্যন্ত সাধারণ এবং চেনা সমস্যা। এমন পরিস্থিতিতে আমরা সাধারণত হন্তদন্ত হয়ে মেকানিক বা টেকনিশিয়ান খোঁজাখুঁজি শুরু করি। তবে ফ্রিজের দক্ষ কোনো টেকনিশিয়ানকে অনর্থক টাকা দিয়ে বাসায় ডাকার আগে আপনি নিজেই ঘরে বসে কিছু প্রাথমিক বিষয় খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। একটু সময় নিয়ে ফ্রিজের সাধারণ ত্রুটি ও খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিজে খতিয়ে দেখলে অনেক সময়ই আসল সমস্যাটি অনায়াসে ধরা পড়ে এবং বড় ধরনের কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি না থাকলে ফ্রিজটি ঘরেই ঠিক করে ফেলা সম্ভব হয়।

সার্কিট ব্রেকার ও পাওয়ার আউটলেট পরীক্ষা করুন

আপনার রেফ্রিজারেটরটি যথানিয়মে প্লাগ ইন করা রয়েছে অথচ ভেতরে আলো জ্বলছে না কিংবা পাওয়ারের কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না, এমনটি হলে অবিলম্বে ঘরের প্রধান সার্কিট ব্রেকারটি পরীক্ষা করুন। সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করে থাকলে বা নিচে নেমে থাকলে তা ঠিক করে দিন। যদি সার্কিট ব্রেকার একদম ঠিক থাকে, তবে ফ্রিজের পাওয়ার কর্ড বা প্লাগটি যে সকেটে যুক্ত, সেই আউটলেটটি ভালো করে চেক করুন। সকেটে কোনো সমস্যা আছে কি না তা নিশ্চিত হতে ফ্রিজের প্লাগটি খুলে অন্য একটি কার্যকর পয়েন্টে বা লাইনে যুক্ত করে দেখুন। যদি অন্য আউটলেটে দেওয়ার পরও ফ্রিজ চালু না হয়, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটি ফ্রিজের ভেতরে এবং তখন অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানকে ডাকতে হবে।

nosto_freze

তাপমাত্রা বা রেগুলেটারের অবস্থান যাচাই করুন

আজকালকার প্রায় সব আধুনিক ফ্রিজেই ঠান্ডা নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি করে ম্যানুয়াল বা ডিজিটাল টেম্পারেচার রেগুলেটর বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক নব থাকে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীতকালের জন্য এই রেগুলেটরে আলাদা আলাদা পয়েন্ট বা মোড নির্ধারণ করা থাকে। অনেকেই ফ্রিজ পরিষ্কার করার সময় কিংবা ভুলবশত এই রেগুলেটরের অবস্থান বদলে ফেলেন, যার কারণে ফ্রিজ ঠান্ডা হওয়া বন্ধ করে দেয়। রেগুলেটর সেট করার সময় সবসময় মনে রাখবেন যে রেফ্রিজারেটর বা নরমাল অংশের আদর্শ তাপমাত্রা সাধারণত ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস কিংবা তার নিচে সেট করা উচিত। তাই মেকানিক ডাকার আগে আপনার ফ্রিজের তাপমাত্রা সঠিক পয়েন্টে সেট করা আছে কি না তা একবার দেখে নিন।

hq720_(1)

দরজার রাবার বা গ্যাসকেটের পেপার টেস্ট

রেফ্রিজারেটরের দরজার চারপাশে যে নরম রাবারের বর্ডার বা আস্তরণ থাকে, সেটিকে টেকনিক্যাল ভাষায় গ্যাসকেট বলা হয়। এই গ্যাসকেটগুলো মূলত ফ্রিজের ভেতরের ঠান্ডা বাতাসকে বাইরে বের হতে দেয় না এবং বাইরের গরম বাতাসকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়। তবে দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে বা বয়সের কারণে দরজার এই গ্যাসকেটগুলো আলগা বা ঢিলে হয়ে যেতে পারে, যার ফলে ফ্রিজের ঠান্ডা ভাব কমে যায়। গ্যাসকেটের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে আপনি ঘরেই একটি সহজ 'পেপার টেস্ট' করে নিতে পারেন। ফ্রিজের দরজা বন্ধ করার সময় দরজার খাঁজে একটি ভাঁজ করা কাগজের টুকরো বা নোট রেখে দিন এবং ফ্রিজটি শক্ত করে বন্ধ করুন। এবার বাইরে থেকে কাগজটি টান দিয়ে বের করার চেষ্টা করুন। যদি কাগজটি খুব সহজেই কোনো বাধা ছাড়া টান দিতেই বেরিয়ে আসে, তবে বুঝবেন দরজার সিল নষ্ট হয়ে গেছে এবং দ্রুত গ্যাসকেটটি বদলে ফেলার সময় এসেছে।

আরও পড়ুন: ফ্রিজে গ্যাস লিক হচ্ছে কি না কীভাবে বুঝবেন?

ভেতরের বায়ুপ্রবাহ বা এয়ার ভেন্ট সচল রাখা

একটি ফ্রিজের ভেতরের ডিপ বা ফ্রিজার কম্পার্টমেন্ট এবং নরমাল বগির মধ্যে ঠান্ডা বাতাস চলাচলের জন্য ছোট ছোট কিছু ছিদ্র বা এয়ার ভেন্ট থাকে। এই ভেন্টগুলোর মাধ্যমেই পুরো ফ্রিজে ঠান্ডা বাতাস সমানভাবে সঞ্চালিত হয়। ফ্রিজের ভেতরের এই ভেন্টগুলো যদি কোনো কারণে প্লাস্টিক, খাবারের বাটি বা বড় কোনো পাত্র দিয়ে অবরুদ্ধ বা ব্লক হয়ে যায়, তবে স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ পুরোপুরি হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতায় বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয় এবং খাবার ঠান্ডা হয় না। এই ভেন্টগুলোর সঠিক অবস্থান ও প্রকৃতি রেফ্রিজারেটরের মডেলের ওপর নির্ভর করে। তাই রেফ্রিজারেটরের সাথে থাকা ইউজার ম্যানুয়াল দেখে ভেন্টের অবস্থান নিশ্চিত হোন এবং সেগুলোর চারপাশ সবসময় ফাঁকা রাখুন।

freze_pic

অতিরিক্ত জিনিসপত্র ঠাসাঠাসি করে না রাখা

পছন্দের খাবার বা বাজার সংরক্ষণের সুবিধার্থে আমরা অনেকেই ফ্রিজের ধারণক্ষমতার দিকে খেয়াল রাখি না। মেকানিক ডাকার আগে নিজের ফ্রিজটি ভালো করে লক্ষ্য করুন যে সেখানে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জিনিসপত্র ঢুকিয়েছেন কি না। ফ্রিজের ভেতরে ধারণক্ষমতার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত জিনিসপত্র বা বক্স গাদাগাদি ও ঠাসাঠাসি করে রাখলে ঠান্ডা বাতাস চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পায় না। ফলে ফ্রিজ পুরো অংশ ঠান্ডা করতে দীর্ঘ সময় নেয় কিংবা একদমই ঠান্ডা করতে পারে না। তাই ফ্রিজের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে এবং পর্যাপ্ত কুলিং পেতে কখনোই ফ্রিজের ভেতর ঠেসে ঠুসে জিনিস রাখবেন না, বরং বাতাস চলাচলের জন্য কিছু জায়গা ফাঁকা রাখুন।

পেছনের কনডেন্সার কয়েল নিয়মিত পরিষ্কার করা

অনেক সময় ফ্রিজের কোনো পার্টস নষ্ট না হলেও শুধুমাত্র পর্যাপ্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে ফ্রিজের ভেতরটা আর আগের মতো ঠান্ডা হয় না। মূলত ফ্রিজের পেছনের দিকে থাকা কালো রঙের জালি সদৃশ পাইপ, যা কনডেন্সার কয়েল নামে পরিচিত, সেখানে অতিরিক্ত ধুলোবালি ও ময়লা জমার ফলেই এই সমস্যাটি বেশি হয়ে থাকে। কনডেন্সার কয়েলের কাজ হলো ফ্রিজের ভেতরের গরম বাতাসকে বাইরে বের করে দেওয়া। এই জালে ধুলো ও ঝুল ময়লার আস্তরণ পড়ে গেলে ফ্রিজ আর নিজের ভেতরের তাপ বাইরে ছাড়তে পারে না, যার কারণে কুলিং পারফরম্যান্স কমে যায়। তাই নির্দিষ্ট সময় পরপর তিন বা ছয় মাস অন্তর ফ্রিজের প্লাগ খুলে পেছনের কনডেন্সার কয়েলটি একটি নরম ব্রাশ, কাপড়ের টুকরো কিংবা ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের সাহায্যে আলতো করে পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার।

683542748b6971001ebfa59c

ফ্রিজ নিয়মিত ডিফ্রস্ট করা ও কয়েল সচল রাখা

ফ্রিজারের বা ডিপের ভেতরের দেয়ালে এবং এয়ার ভেন্টের মুখে অতিরিক্ত বরফ জমে যাওয়ার কারণেও অনেক সময় বাতাস চলাচলের পথ বা ভেন্ট ব্লক হয়ে যায়। এই ব্লকেজের কারণে কয়েল ঠান্ডা হলেও সেই হাওয়া নরমাল অংশে পৌঁছাতে পারে না এবং ফ্রিজ ঠান্ডা হওয়া বন্ধ করে দেয়। সময়মতো ফ্রিজ ডিফ্রস্ট না করলে বা নন-ফ্রস্ট ফ্রিজের হিটার নষ্ট হলে এই সমস্যাটি মাস্ট হবেই। এর সাধারণ সমাধান হলো প্রতি সপ্তাহে বা নির্দিষ্ট সময় পর পর ফ্রিজ ডিফ্রস্ট করা। ম্যানুয়াল ফ্রিজ হলে সপ্তাহে অন্তত একবার রাতে ঘুমানোর আগে ফ্রিজটি ডিফ্রস্ট মোডে দিয়ে দিন বা মেইন প্লাগ খুলে রাখুন। এতে সকালের মধ্যে সমস্ত অতিরিক্ত বরফ সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং ফ্রিজ আবার আগের মতোই স্বাভাবিক ঠান্ডা হতে শুরু করবে।

ইভাপোরেটর ফ্যান ও মোটরের অবস্থা যাচাই

ফ্রিজের ভেতরে ঠান্ডা বাতাস ছড়িয়ে দেওয়ার মূল কাজটি করে ইভাপোরেটর ফ্যান। এই ফ্যানটি ইভাপোরেটর কয়েল থেকে তৈরি হওয়া শীতল বাতাস টেনে নিয়ে পুরো রেফ্রিজারেটর ইউনিট জুড়ে সমানভাবে সঞ্চালিত করে। যদি কোনো কারণে এই ইভাপোরেটর ফ্যানের মোটরটি নষ্ট হয়ে যায় কিংবা ফ্যানের পাখা ভেঙে যায়, তবে ফ্রিজের ভেতরে বাতাস চলাচল পুরোপুরি থমকে যাবে। এর ফলে ফ্রিজের ভেতরের কয়েলগুলো অতিরিক্ত হিম হয়ে বরফের চাঙ্গড়ে পরিণত হবে কিন্তু খাবার ঠান্ডা হবে না। ইভাপোরেটর ফ্যানটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না বা কয়েলে অতিরিক্ত বরফ জমছে কি না তা জানতে রেফ্রিজারেটরের পেছনের প্যানেলটি সাবধানে সরাতে হবে। যদি ফ্যানটি ঘুরতে না পারে বা নষ্ট হয়ে যায়, তবে দেরি না করে এটি অবিলম্বে পাল্টাতে হবে।

প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও পেশাদারদের পরামর্শ

ঘরের সাধারণ টুকিটাকি বিষয় যেমন ফ্রিজ পরিষ্কার করা, তাপমাত্রা ঠিক করা বা কাগজ দিয়ে দরজার রাবার পরীক্ষা করা পর্যন্ত নিজে করাটা ভালো। তবে আপনার যদি গভীর টেকনিক্যাল বা বৈদ্যুতিক কাজের জ্ঞান একদম না থাকে, তবে একা একা ফ্রিজের ভেতরের কোনো জটিল বৈদ্যুতিন পার্টস বা তারের সংযোগ ঠিক করতে যাওয়াটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপজ্জনক হতে পারে। যেকোনো মুহূর্তে শর্ট সার্কিট বা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই প্রাথমিক বিষয়গুলো চেক করার পরও যদি ফ্রিজ ঠান্ডা না হয়, তবে নিজে কারিগরি করতে না গিয়ে সচেতন থাকুন এবং অবিলম্বে কোনো নামী ব্র্যান্ডের বা পেশাদার ও অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানের সরাসরি সাহায্য নিন।

এজেড