আব্দুল হাকিম
১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৪ এএম
হ্যাকিং, অনলাইন প্রতারণা ও তথ্য চুরির ঝুঁকি কমাতে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ডলারের এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশে গড়ে তোলা হবে সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নযোগ্য এই প্রকল্পের আওতায় ৬৪ জেলায় নজরদারি নেটওয়ার্ক, এআইভিত্তিক হেল্পলাইন ও স্বেচ্ছাসেবক কাঠামো গড়ে তুলে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সরকারের এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকের ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। এটি বাস্তবায়ন করবে ‘জাতীয় সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি’। প্রকল্পটির প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। এতে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয়, অর্থায়ন কাঠামো এবং বাস্তবায়নের বিস্তারিত রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, দেশে ডিজিটাল সেবা, অনলাইন লেনদেন এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এর ফলে সাইবার ঝুঁকিও বাড়ছে। হ্যাকিং, ডাটা চুরি, আর্থিক প্রতারণা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোর ওপর হামলার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত, শক্তিশালী এবং আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় জাতীয় পর্যায়ে একটি সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার স্থাপন করা হবে, যা সার্বক্ষণিকভাবে দেশের সাইবার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে। পাশাপাশি একটি জাতীয় কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন করা হবে, যা সাইবার হামলা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি শনাক্ত হলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাবে। এই দুইটি কাঠামো দেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে কাজ করবে।
এছাড়া দেশের ৬৪টি জেলায় নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কেন্দ্র স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় সাধনে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে ৩৫টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানকে এই নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে, যাতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমগুলো নিরাপত্তার আওতায় থাকে।
সাইবার অপরাধ তদন্ত ও বিশ্লেষণ সক্ষমতা বাড়াতে একটি জাতীয় ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে। এই ল্যাবে ডিজিটাল তথ্য ও প্রমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সাইবার অপরাধ তদন্তকে আরও কার্যকর করা যাবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিকে প্রকল্পে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য একটি আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এখানে দেশীয় প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সনদ কোর্স চালুর মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা হবে, যা ভবিষ্যতে দেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে।
সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এজন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘সাইবার স্বেচ্ছাসেবক’ নিয়োগ দেওয়া হবে, যারা স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করবেন। তারা অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া লিংক, ফিশিং এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়ে মানুষকে অবহিত করবেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবেন।
প্রকল্পের আওতায় নিয়মিত সাইবার মহড়া ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আয়োজন করা হবে। এসব মহড়ার মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে গবেষণা কার্যক্রম এবং নীতিমালা উন্নয়নের উদ্যোগও নেওয়া হবে।
নাগরিকদের সরাসরি সহায়তা দিতে একটি এআইভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা হেল্পলাইন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এই হেল্পলাইনের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি সাইবার সংক্রান্ত সমস্যায় দ্রুত পরামর্শ ও সহায়তা পাবেন। বিশেষ করে অনলাইন প্রতারণা বা হ্যাকিংয়ের মতো ঘটনায় তাৎক্ষণিক নির্দেশনা পাওয়া গেলে ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৭২ কোটি টাকার সমান। তবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর এই ব্যয় পরিবর্তিত হতে পারে। সমীক্ষা পরিচালনার জন্য আলাদাভাবে প্রায় ৫০ মিলিয়ন টাকার সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে বৈদেশিক সহায়তা এবং সরকারি অর্থের সমন্বয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তা পাওয়া গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একটি সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় সাইবার হামলা বা প্রতারণা থেকে আর্থিক ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো আরও সুরক্ষিত হবে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। উন্নত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে অনলাইন লেনদেন, ই-কমার্স এবং ডিজিটাল ব্যবসা আরও বিস্তৃত হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
আরও পড়ুন: অর্থ সংকটে হার্ট হাসপাতালটির কাজে ধীরগতি
সাধারণ নাগরিকদের জন্যও এর সুফল পাওয়া যাবে। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং সরকারি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সময় নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে। ফলে মানুষ আরও নিশ্চিন্তে ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করতে পারবে।
সরকারি পর্যায়েও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সাইবার হামলার ঘটনায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো সুরক্ষা এবং তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হবে। একটি শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও আরও সুদৃঢ় করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই যথেষ্ট নয়। এর সঠিক ব্যবহার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ জনবল দিয়ে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি আধুনিক, সমন্বিত এবং কার্যকর সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম খান বলেন, সাধারণ জনগণের সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট হওয়ার প্রয়োজন নেই; তবে সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এখনো ফিশিং আক্রমণের শিকার হয়। অনেক সময় তারা অনলাইনের আচরণগত নিয়ম না জানার কারণে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে। যেমন, বিকাশে টাকা পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কোনো লিংকে ক্লিক করতে বলা হলে সরল বিশ্বাসে সেটি করে ফেলেন। এসব ক্ষেত্রে খুব উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই; বরং ন্যূনতম সচেতনতা তৈরি করলেই অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব। ফিশিং আক্রমণসহ বিভিন্ন সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানানো জরুরি। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের জন্য সাইবার সিকিউরিটি এওয়ারনেস ট্রেনিং চালু করা যেতে পারে, যা একটি নিয়মিত কর্মসূচি হিসেবেও বাস্তবায়নযোগ্য।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকার মানুষ এখন সাইবার স্পেসে উল্লেখযোগ্যভাবে সক্রিয়। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই প্রায়শই সাইবার অপরাধীরা ভুক্তভোগীদের টার্গেট করে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। তাই এদের সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। সাইবার সিকিউরিটি এওয়ারনেস না থাকলে গুজব, মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের সমস্যাও বাড়ে। সচেতনতা তৈরি করা গেলে এসব সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বিদেশেও ফেসবুক ও ইউটিউব ব্যবহার হয়, তবে বাংলাদেশে এসব প্ল্যাটফর্মে মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের প্রভাব বেশি। এর প্রধান কারণ মানুষ সঠিক ও ভুয়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় অনেকেই ফেসবুককে প্রধান তথ্যসূত্র হিসেবে দেখে, যেখানে সত্য ও মিথ্যা তথ্য মিশ্রিত অবস্থায় থাকে।
ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম খান বলেন, মানুষকে কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে ভুয়া তথ্য থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হয়—এই বিষয়গুলো নিয়ে ন্যূনতম প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা জরুরি। উদ্যোগটি ভালো হলেও এর সঠিক বাস্তবায়ন ও মনিটরিং গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তবে সাইবার সিকিউরিটি এওয়ারনেস একেবারে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।
এএইচ/এমআর