Dhaka Mail Logo

স্পোর্টস / ফুটবল

আকাশি-সাদার জাদুকরি ক্যানভাসে ‘শেষের কবিতা’ পূর্ণ হবে

০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম

ভোরের আলো ফোটার আগেই আজ হয়তো অগণিত ভক্তের চোখের কোণে জল জমবে। নব্বইয়ের দশকে যাদের শৈশব কেটেছে, তাদের জন্য এই দিনটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচের নয়, বরং এক জাদুকরী যুগের অবসানের। বিশ্ববাসী আজ চূড়ান্তবারের মতো সেই মায়াবী বাঁ পায়ের কারুকাজ দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। চিরচেনা নীল-সাদা জার্সি, পিঠে সেই ভারি ১০ নম্বর আর বুয়েনস আইরেসের বিখ্যাত এস্তাদিও মনুমেন্তালের গ্যালারি; সবকিছুর সাক্ষী হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরবিদায় জানাতে মাঠে নামছেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

আজকের ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ বেনিন। তবে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই ম্যাচে প্রতিপক্ষ কে, তা একেবারেই গৌণ। সবার নজর কেবল একজন মানুষের দিকে, এক জীবন্ত কিংবদন্তির দিকে। এই মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তার ক্যারিয়ারের অনেক উত্থান-পতনের গল্প। ২০০৫ সালের ৯ অক্টোবর পেরুর বিপক্ষে এই মাঠেই ঘরের ছেলে হিসেবে প্রথমবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রেখেছিলেন ১৮ বছরের এক লাজুক তরুণ। তার ঠিক কিছুদিন আগেই হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেকেই লাল কার্ড দেখার দুঃসহ স্মৃতি সঙ্গী ছিল।

আরও পড়ুন- আর্জেন্টিনা যাকে চিনতো না, দুই দশক পর সেই ‘মেসি’ কিংবদন্তি

720387032_1636691764489074_902173029711920426_n

কিন্তু সেদিন পেরুকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে যে নতুন গল্পের সূচনা হয়েছিল, আজ সেই একই মাঠে তার বৃত্ত পূর্ণ হতে চলেছে। মনুমেন্তাল কখনো তাকে খালি হাতে ফেরায়নি; এখানে খেলা ২৮টি ম্যাচে আর্জেন্টিনা কখনোই হারেনি। এই মাঠে তিনি উপহার দিয়েছেন ১৯টি গোল ও ১১টি অ্যাসিস্ট, যা নির্দিষ্ট কোনো ভেন্যুতে তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ।

তবে আজকের এই বিদায়ী মঞ্চে পৌঁছানোর রাস্তাটা মোটেও মসৃণ ছিল না। একটা সময় এই ১০ নম্বর জার্সিটিই তার কাছে সবচেয়ে বড় বোঝার মতো মনে হতো। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে স্বপ্নভঙ্গ, এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার; সব মিলিয়ে একরাশ হতাশা তাকে গ্রাস করেছিল।

আরও পড়ুন-মেসির যে রেকর্ড মুছে ফেলা অসম্ভব

messi_argentina_footballsss_sdf

চারপাশের তীব্র সমালোচনা, এমনকি কিংবদন্তি ম্যারাডোনার ‘ওর মধ্যে আদর্শ নেতা হওয়ার গুণ নেই’ বিষয়ক মন্তব্যও তাকে গভীরভাবে বিদ্ধ করেছে। নিউজার্সির সেই অভিশপ্ত রাতের পর হোটেল রুমে বসে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিলেন অভিমানী জাদুকর।

কিন্তু যার জন্মই হয়েছে ইতিহাস গড়ার জন্য, তার গল্প কি এত সহজে শেষ হতে পারে? বাবা হোর্হে মেসির অবিচল সমর্থন এবং কোচ লিওনেল স্কালোনির একটি জাদুকরী দর্শন সবকিছু বদলে দেয়। স্কালোনি তাকে বুঝিয়েছিলেন, তাকে ম্যারাডোনা হওয়ার দরকার নেই; সে কেবলই মেসি, আর দল সবসময় তার পাশেই আছে। এরপরই বদলে যায় আর্জেন্টিনা দলের খোলনলচে। আনহেল ডি মারিয়া, নিকোলাস ওতামেন্দিদের মতো অভিজ্ঞদের সাথে একঝাঁক তরুণের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠে নতুন এক দল।

আরও পড়ুন-নতুন ইতিহাসের পথে মেসির আর্মব্যান্ড

475859422_1252338546257733_6880729365206135909_n

যারা মেসিকে শুধু নির্ভরতার প্রতীকই ভাবেনি, তাকে ভালোবেসেছে। তারা মেসির উপর থেকে চাপ কমিয়ে তাকে মাঠে স্বাধীনভাবে বিচরণ করার সুযোগ করে দিয়েছিল। মেসিও নিজেকে নতুন ছাঁচে গড়েছেন; একা সব করার বদলে দলের জয়ে নেপথ্য কারিগর হয়েছেন, সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েছেন।

এর পরের গল্পটা কেবলই রূপকথার। ২০২১ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের মাটি থেকে কোপা আমেরিকা জয় করে দেশের ২৮ বছরের শিরোপা খরা কাটানো, আর ২০২২ সালে কাতারের মরুর বুকে সেই আরাধ্য সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরা। সমালোচকদের সব প্রশ্নের উত্তর তিনি মুখে নয়, দিয়েছেন মাঠের পারফরম্যান্সে। রোজারিওর সেই গ্রোথ হরমোনের সমস্যায় ভোগা ছোট্ট ছেলেটি আজ সর্বকালের সেরার আসনে আসীন।

আজ রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজাবেন, তখন শুধু একজন ফুটবলার মাঠ ছাড়বেন না, বিদায় নেবে হার না মানা এক অদম্য মানসিকতা। বারবার মাটিতে লুটিয়ে পড়েও কীভাবে ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে আসতে হয়, মেসি তা গোটা বিশ্বকে শিখিয়ে গেলেন। চোখের জলে আজ বিশ্ব ফুটবল তাকে বিদায় জানালেও, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর কবিতার রচয়িতা হিসেবে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।