Dhaka Mail Logo

স্পোর্টস / ফুটবল

মহাকাল, সাক্ষী থেকো

০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৬ এএম

সবুজ ঘাসের ক্যানভাসে আর আঁকা হবে না জাদুকরী কোনো আলপনা। বল পায়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ গুঁড়িয়ে দেওয়ার সেই চেনা দৃশ্যটাও এবার পরিণত হলো শুধুই স্মৃতিতে। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। 

এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো ফুটবলের এক সোনালি যুগের। তবে তাঁর এই প্রস্থান কোনো হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে এক কিংবদন্তির অমরত্বে প্রবেশ।

এই মহাকাব্যের শুরুটা হয়েছিল আর্জেন্টিনার রোজারিওর এক ধুলোমাখা গলিতে, যেখানে মূল কারিগর ছিলেন তাঁর বাবা হোর্হে মেসি। স্থানীয় এক ইস্পাত কারখানার শ্রমিক হোর্হে ছেলেকে ভর্তি করিয়েছিলেন ছোট্ট ক্লাব গ্রান্দোলিতে। তিনিই প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন ছেলের বাঁ পায়ের লুকিয়ে থাকা জাদুকরী ক্ষমতা।

আরও পড়ুন-আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির সেই ৬টি অবিস্মরণীয় মুহূর্ত

আরও পড়ুন- মেসির হঠাৎ অবসরের কারণ

742586464_1544787367115446_927376400743581071_n কিন্তু শৈশবেই মেসির শরীরে ধরা পড়ে ‘গ্রোথ হরমোন’ ঘাটতি। চিকিৎসার বিপুল খরচ মেটানোর সামর্থ্য বাবার ছিল না, মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল স্থানীয় ক্লাবগুলোও। তখন ছেলের স্বপ্ন বাঁচাতে এক বুক সাহস নিয়ে হোর্হে মেসি ছেলেকে নিয়ে পাড়ি জমান স্পেনের বার্সেলোনায়। 

বাবার সেই অদম্য জেদ, ছেলেকে নিয়ে বার্সার কর্তাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘোরা এবং অবশেষে একটি রেস্তোরাঁর টিস্যু পেপারে (ন্যাপকিন) করা সেই ঐতিহাসিক চুক্তির হাত ধরেই বিশ্বফুটবল পেয়েছিল এক বিস্ময়বালককে। বাবার সেই লড়াইয়ের দিনগুলোই মূলত তৈরি করে দিয়েছিল আজকের কিংবদন্তি মেসিকে।

আরও পড়ুন-বিশ্ব ফুটবলের মহাকাব্যিক এক অধ্যায়ের সমাপ্তি

ক্লাব ফুটবলে সব পেলেও নিজের শেকড় আর্জেন্টিনাকে কখনো ভোলেননি তিনি। তবে আকাশী-সাদা জার্সিতে তাঁর পথচলা বারবার হোঁচট খেয়েছে। এক গোটা জাতির প্রত্যাশার পাহাড়সম চাপ, ফাইনালে হারের যন্ত্রণা আর চোখের জল, সবকিছুই নীরবে সহ্য করে গেছেন তিনি। এমনকি প্রবল অভিমানে একবার বিদায়ও বলেছিলেন, কিন্তু দেশের টানে আবার ফিরেও এসেছেন।

lio

মহাকালের চিত্রনাট্য যেন এই জাদুকরের জন্য সবচেয়ে সুন্দর সমাপ্তিটাই জমিয়ে রেখেছিল। মারাকানার অতীত কান্না ভুলে কোপা আমেরিকা জয়, এরপর ফিনালিসিমার শিরোপা। এগুলো ছিল চূড়ান্ত সাফল্যের প্রস্তুতি মাত্র। অবশেষে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে আসে সেই পরম আরাধ্য মুহূর্ত। 

বাবার হাত ধরে দেখা সেই স্বপ্ন পূর্ণতা পায় সোনালি বিশ্বকাপ ট্রফিতে পরম আদরে চুমু এঁকে দেওয়ার মাধ্যমে। অর্জনের খাতায় আর কিছুই বাকি ছিল না তাঁর। তাই তো পতনের অপেক্ষা না করে একদম রাজকীয় শীর্ষবিন্দুতে থেকেই আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেন এই মহাতারকা।

সময়ের স্বাভাবিক নিয়মে আগামী দিনে আবারও বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকার আসর বসবে। আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সিটাও হয়তো নতুন কোনো তরুণ গায়ে জড়াবেন। কিন্তু মেসির সেই চেনা হাঁটার ভঙ্গি আর বল পায়ে অলৌকিক মুহূর্তগুলো আর কখনো ফিরে আসবে না। 

আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনায় তাঁর বুটের স্পর্শ হয়তো আর পড়বে না, তবে যতদিন পৃথিবীতে ফুটবল খেলাটির অস্তিত্ব থাকবে, লিওনেল মেসি বেঁচে থাকবেন এক অবিনশ্বর জাদুকর হিসেবে।

এসটি