স্পোর্টস ডেস্ক
০১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৯ এএম
বড় টুর্নামেন্টগুলোর মালিকানায় বেসরকারি বিনিয়োগের বিতর্কিত পরিকল্পনা বাতিল করেছেন ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ব্যাপক বিরোধিতার মুখে গতকাল শুক্রবার তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
ইনফান্তিনো বলেন, প্রস্তাবটি ফিফার মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছে। ফলে যে উদ্দেশ্যে পরিকল্পনাটি নেওয়া হয়েছিল, তা এখন আর পূরণ হচ্ছে না। এই প্রস্তাব আর এগিয়ে নেওয়া হবে না।
ফিফার ২১১টি সদস্যদেশের ফুটবল ফেডারেশনকে প্রস্তাবটির পক্ষে সমর্থন দেওয়ার বিনিময়ে ৪ কোটি ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন ইনফান্তিনো। পরিকল্পনাটির আওতায় পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্বে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল।
ইউরোপের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার ৫৫টি সদস্যদেশ বৃহস্পতিবার জানিয়েছিল, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা হলে তারা বিশ্বকাপ বর্জন করবে।
ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামুর বলেছেন, এই প্রকল্প সম্পর্কে সংস্থাটির নিজস্ব প্রশাসনকেও বিভ্রান্ত করা হয়েছিল।
ফিফার বৈশ্বিক কৌশল ও সুশাসনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস করদেইরোও পরিকল্পনাটির বিরোধিতা করে পদত্যাগ করেছেন। তিনি এটিকে ফুটবলের জন্য ‘খারাপ চুক্তি’ বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, এটি ‘ফুটবলের ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখার’ মতো সিদ্ধান্ত।
এর আগে আরও দুটি বড় মহাদেশীয় ফুটবল কনফেডারেশন পরিকল্পনাটির বিরোধিতা করে।
উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফ জানায়, তাদের সদস্যরা প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে। এ অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক সদস্য ইনফান্তিনোর ওপর আস্থা হারিয়েছে বা হারাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) উয়েফা ও কনকাকাফের অবস্থানের সঙ্গে ‘সংহতি’ প্রকাশ করে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও ইনফান্তিনোকে ফিফা নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ‘ভুল ব্যক্তি’ বলে মন্তব্য করেন।
৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো আগামী মার্চে ফিফা কংগ্রেসে চতুর্থবারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যেই তিনি ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছেন।
পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণা দিয়ে ইনফান্তিনো বলেন, এখন তিনি ফুটবল নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আবার একত্র করতে চান। তার ভাষায়, এটি করতে হবে ‘পারস্পরিক স্বার্থের চেতনায়’।
যে কারণে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কমে যায়
উয়েফা ও কনকাকাফের বিরোধিতার পরও শুক্রবার ফিফা জানিয়েছিল, তারা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাবে। তখন সংস্থাটি বলেছিল, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না।’
তবে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার সময় ইনফান্তিনো স্বীকার করেন, এটি বাস্তবায়নের জন্য ফিফার সদস্যদেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন ছিল। ২১১ সদস্যের মধ্যে অন্তত ১০৬টির ভোট প্রয়োজন হতো।
এএফসিও পরিকল্পনার বিরোধিতা করায় প্রস্তাবটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।
উয়েফার ৫৫টি, কনকাকাফের ৩৫টি এবং এএফসির ৪৬টি ভোট রয়েছে। এসব অঞ্চলের সব সদস্য যদি নিজ নিজ ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থানের পক্ষে ভোট দিত, তাহলে মোট ১৩৬টি ভোট পরিকল্পনার বিপক্ষে পড়ত।
আফ্রিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিএএফ এবং ওশেনিয়ার ফুটবল কনফেডারেশন (ওএফসি) জানিয়েছিল, তারা আগস্টে ফিফার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবে।
দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবলও ফিফার কাছে পরিকল্পনার ‘পরিধি, কাঠামো, পরিচালনব্যবস্থা ও সম্ভাব্য প্রভাব’ সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়েছিল।
কী ছিল ইনফান্তিনোর পরিকল্পনায়
ফিফা ও ইনফান্তিনো তাদের প্রধান টুর্নামেন্টগুলো পরিচালনার জন্য একটি বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় আয়োজনগুলোতে বাইরের বিনিয়োগকারীদের অংশীদার হওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল।
ফিফা জানিয়েছিল, নতুন এই প্রতিষ্ঠান ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)-এ তৃতীয় পক্ষকে সংখ্যালঘু ও নিয়ন্ত্রণহীন অংশীদার হিসেবে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে।
পরিকল্পনায় সম্মতি দেওয়া ফুটবল ফেডারেশনগুলোকে প্রাথমিকভাবে ২ কোটি ডলার পাওয়ার জন্য ১৯ সেপ্টেম্বরের সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল।
বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যানের তৈরি ২৫ পৃষ্ঠার একটি নথিতে বলা হয়েছিল, ফিফার টুর্নামেন্টগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০৩৫ থেকে ২০৩৯ সালের চক্রে প্রতিটি সদস্য ফেডারেশনকে আনুমানিক ২ কোটি ৪০ লাখ ইউরো করে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
নথিতে নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ এবং প্রণোদনাভিত্তিক পারিশ্রমিকের মাধ্যমে শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিভা আকর্ষণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।
বিশ্বকাপকে সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শক দেখা ক্রীড়া আয়োজন হিসেবে বর্ণনা করা হলেও বলা হয়েছিল, এর বিপরীতে ফিফা এখনো পর্যাপ্ত অর্থ আয় করতে পারছে না।
তবে নথিটিতে নারী ফুটবলের বিষয়ে কোনো উল্লেখ ছিল না।
ফিফা জানিয়েছিল, প্রস্তাবিত বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ইটার্নালের। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা জোশুয়া কুশনার, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই।
শুক্রবার প্রথমবারের মতো এ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ইনফান্তিনোর সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি। ২০২৫ সালে দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
ইনফান্তিনো কি টিকে থাকতে পারবেন?
ইনফান্তিনো ২০১৬ সালে ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হন। সে সময় এএফসির সভাপতি শেখ সালমান আল খলিফাকে ১১৫-৮৮ ভোটে হারিয়েছিলেন তিনি।
আগামী মার্চে মরক্কোয় ফিফার ৭৭তম কংগ্রেসে পরবর্তী সভাপতি নির্বাচিত হবেন। প্রার্থীদের ১৮ নভেম্বরের মধ্যে মনোনয়ন দিতে হবে।
এই সপ্তাহের আগে ধারণা করা হচ্ছিল, ইনফান্তিনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারও সভাপতি নির্বাচিত হবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফুটবল ফেডারেশন, এমনকি ইউরোপের কয়েকটি ফেডারেশনও তাকে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর এসব সমর্থনের বড় অংশ প্রত্যাহার করা হবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।
পরিকল্পনাটি সদস্য ফেডারেশনগুলোকে, বিশেষ করে যেসব দেশে ফুটবলের জন্য সহায়তা বেশি প্রয়োজন, সেসব দেশকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল বলে আবারও উল্লেখ করেন ইনফান্তিনো।
তিনি বলেন, ফিফার উদ্দেশ্য সব সময়ই ছিল ফুটবলকে ঐক্যবদ্ধ করা ও উন্নত করা, ভবিষ্যতেও তা থাকবে। তবে প্রস্তাবটি ফিফার ভেতরেই স্পষ্ট বিভাজন তৈরি করেছে।
ফিফার প্রধান উপদেষ্টা কার্লোস করদেইরো, যিনি ২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে হোয়াইট হাউসের টাস্কফোর্সে ফিফার প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে পদত্যাগ করা সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
দীর্ঘ এক বিবৃতিতে করদেইরো বলেন, তিনি ‘দ্ব্যর্থহীনভাবে’ এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। ফিফার মূল্য বাড়ানোর জন্য বাইরের বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন—এই ধারণাও তিনি মেনে নেননি। পরিকল্পনাটি তৈরিতে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলেও জানান তিনি।
জানা গেছে, ইনফান্তিনো তার পরিকল্পনার বিষয়টি ফিফার আটজন সহসভাপতির কয়েকজনের কাছ থেকেও গোপন রেখেছিলেন। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারত বলে দাবি করা হয়েছিল।
ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামুর পরিকল্পনাটিকে ‘এক ব্যক্তির প্রকল্প’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘একজন সভাপতির কাজ হলো মানুষকে একত্র করা, ঐক্যবদ্ধ করা এবং অনুপ্রাণিত করা।’ কিন্তু এই পরিকল্পনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।
তিনি আরও বলেন, ‘এর কারণে যদি আমি চাকরি হারাই, তাতেও সমস্যা নেই। আমি সেই সিদ্ধান্ত বুঝব এবং সম্মান করব। অন্তত আজ রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারব।’
এআরএম