images

স্পোর্টস / ফুটবল

ভুভুজেলা কী? কেন ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলে নিষিদ্ধ করল ফিফা

স্পোর্টস ডেস্ক

০৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম

ফুটবল মানেই গ্যালারির উন্মাদনা, সমর্থকদের গান, ঢোল আর নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। তবে একসময় বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবল-বাদ্যযন্ত্র হয়ে উঠেছিল একটি লম্বা প্লাস্টিকের শিঙা। যা ‘ভুভুজেলা’ নামে পরিচিত। ২০১০ সালের বিশ্বকাপের সময় এই বাদ্যযন্ত্রকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক আলোচনা, প্রশংসা ও সমালোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, ভুভুজেলা কি ফুটবল সংস্কৃতির অংশ, নাকি এটি খেলার সৌন্দর্য নষ্ট করে? 

আরও পড়ুন-বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে তুঙ্গে যৌনকর্মীদের ‘চাহিদা’

কারও কাছে এটি ছিল আফ্রিকান ফুটবল সংস্কৃতির প্রতীক, আবার কারও কাছে ছিল বিরক্তির কারণ। ১৬ বছর পর সেই ভুভুজেলাকেই ২০২৬ বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম থেকে নিষিদ্ধ করেছে ফিফা। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সম্প্রতি প্রকাশিত স্টেডিয়ামের আচরণবিধিতে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

ভুভুজেলা কী?

ভুভুজেলা হলো একটি লম্বা শিঙা আকৃতির বাদ্যযন্ত্র, যা সাধারণত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করা হয়। এতে ফুঁ দিলে মৌমাছির ঝাঁকের মতো একটানা উচ্চ শব্দ সৃষ্টি হয়। শব্দের মাত্রা প্রায় ১২০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা দীর্ঘ সময় শুনলে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। 

অনেক গবেষক মনে করেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রাণীর শিং ব্যবহার করে সংকেত দেওয়ার যে ঐতিহ্য ছিল, সেখান থেকেই আধুনিক ভুভুজেলার ধারণা এসেছে। পরে স্থানীয় ফুটবল সমর্থকেরা এটিকে স্টেডিয়ামের সংস্কৃতির অংশে পরিণত করেন।

ফুটবলে কীভাবে জনপ্রিয় হলো?

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় ফুটবল ম্যাচগুলোতে ভুভুজেলার ব্যবহার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ম্যাচে দলকে সমর্থন জানাতে হাজার হাজার দর্শক একসঙ্গে এটি বাজাতেন। ধীরে ধীরে এটি দেশটির ফুটবল পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

যখন দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়, তখন ভুভুজেলাও বিশ্বমঞ্চে উঠে আসে। বিশ্বকাপের প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই গ্যালারিজুড়ে শোনা যেত এর অবিরাম শব্দ। অনেক দর্শক প্রথমবারের মতো সে সময়ে এই বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হন।

২০১০ বিশ্বকাপে কেন বিতর্ক তৈরি হয়েছিল?

বিশ্বকাপ চলাকালে বহু খেলোয়াড়, কোচ, ধারাভাষ্যকার ও দর্শক অভিযোগ করেন যে ভুভুজেলার শব্দের কারণে ম্যাচের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। খেলোয়াড়দের দাবি ছিল, মাঠে সতীর্থদের নির্দেশনা শুনতে সমস্যা হচ্ছিল। টেলিভিশন সম্প্রচারেও ধারাভাষ্যকারদের কণ্ঠ অনেক সময় ভুভুজেলার গুঞ্জনে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল। 

তবে বিতর্কের মধ্যেও ফিফা তখন ভুভুজেলার পক্ষে অবস্থান নেয়। সংস্থাটি মনে করেছিল, এটি দক্ষিণ আফ্রিকার নিজস্ব ফুটবল সংস্কৃতির অংশ। তৎকালীন ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটারও বলেছিলেন, আফ্রিকান বিশ্বকাপকে ইউরোপীয় সংস্কৃতির ছাঁচে ফেলার চেষ্টা করা উচিত নয়। ফলে ২০১০ বিশ্বকাপে ভুভুজেলা নিষিদ্ধ করা হয়নি। 

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও ভুভুজেলা নিয়ে বিতর্ক থামেনি। ইউরোপের অনেক ফুটবল কর্তৃপক্ষ এবং আয়োজক সংস্থা মনে করেছিল, এর অতিরিক্ত শব্দ দর্শকদের স্বাভাবিক গান, স্লোগান ও আবেগের প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও স্টেডিয়ামে ভুভুজেলার ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয়। 

কেন ২০২৬ বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ করল ফিফা?

২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য নতুন স্টেডিয়াম আচরণবিধি প্রকাশ করে ফিফা জানিয়েছে, ভুভুজেলা, এয়ার হর্ন, বাঁশি এবং অতিরিক্ত শব্দসৃষ্টিকারী অন্যান্য যন্ত্র স্টেডিয়ামে আনা যাবে না। সংস্থার লক্ষ্য হলো দর্শক, খেলোয়াড় ও সম্প্রচারকারীদের জন্য আরও নিয়ন্ত্রিত এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ নিশ্চিত করা।

স্টেডিয়াম আচরণবিধি অনুযায়ী, কেবল ভুভুজেলা নয়, এয়ার হর্নসহ মাত্রাতিরিক্ত শব্দ তৈরি করে। এমন যেকোনো ধরনের যন্ত্র ১৬টি ভেন্যুর কোনোটিতেই নেওয়া যাবে না। এ ছাড়া লেজার রশ্মি ছড়ায়, এমন যন্ত্র বা লেজার পয়েন্টার নেওয়াও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এছাড়া পোশাকের বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শরীরে রং করা বা ট্যাটু আঁকাকে কোনোভাবেই পোশাক হিসেবে গণ্য করা হবে না। মাঠে নগ্ন হয়ে দৌড়ানো, শরীর প্রদর্শন বা পোশাক খুলে শরীরের সংবেদনশীল অংশ দেখানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

ফিফার নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এসব যন্ত্র ম্যাচ পরিচালনা, দর্শক অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে। নিয়ম ভঙ্গ করলে দর্শকদের স্টেডিয়ামে প্রবেশে বাধা দেওয়া বা স্টেডিয়াম থেকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে কর্তৃপক্ষের।