images

স্পোর্টস / ফুটবল

হ্যান্ড অব গড ও শতাব্দীর সেরা গোল: এক ম্যাচেই ম্যারাডোনার দুই ইতিহাস

স্পোর্টস ডেস্ক

২৩ মে ২০২৬, ১২:০৪ পিএম

সামনেই ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। বিশ্বকাপের প্রায় শতবর্ষের ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ এসেছে, যা ফুটবল মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক প্রতিশোধ আর আবেগের এক চূড়ান্ত লড়াইয়ে। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে যদি থাকেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ঈশ্বরপ্রদত্ত অথচ বিতর্কিত এক জাদুকর, তবে তা রূপ নেয় মহাকাব্যে। 

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ছিল তেমনই এক ইতিহাস, যেখানে মাত্র ৪ মিনিটের ব্যবধানে ফুটবল দেখেছিল তার ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত এবং সবচেয়ে সুন্দরতম রূপ। যার নায়ক ছিলেন আর কেউ নন- আর্জেন্টিনার মহানায়ক দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা।

আরও পড়ুন- একটি ঢুঁশ এবং মহাকাব্যের ট্র্যাজিক অবসান: জিদানের বিদায়ের সেই রাত

আরও পড়ুন- ব্যাটল অব সান্তিয়াগো: ফুটবল মাঠ যখন রূপ নিয়েছিল রণক্ষেত্রে

মাঠের ভেতরের লড়াই, মাঠের বাইরের যুদ্ধ
১৯৮৬ সালের ২২ জুনের সেই ম্যাচের আবহটা সাধারণ কোনো ফুটবল ম্যাচের মতো ছিল না। এর মাত্র ৪ বছর আগে, ১৯৮২ সালে, 'ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ' নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের (ইংল্যান্ড) মধ্যে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল, যাতে আর্জেন্টিনার শত শত তরুণ সৈন্য প্রাণ হারান এবং আর্জেন্টিনা পরাজিত হয়।

আর্জেন্টাইনদের মনে সেই ক্ষত তখনও দগদগে। মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে যখন দুই দল মুখোমুখি হলো, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের কাছে এটি কেবল সেমিফাইনালে ওঠার লড়াই ছিল না, ছিল দেশের জন্য শহীদ হওয়া সৈনিকদের জন্য এক অদৃশ্য প্রতিশোধের মঞ্চ।

British-troops-during-the-Falklands-War-58efa48e3df78cd3fc83b5b9

৫১ তম মিনিট: 'দ্য হ্যান্ড অফ গড' বা ঈশ্বরের হাত
খেলার প্রথমার্ধ শেষ হয়েছিল গোলশূন্য সমতায়। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই, ৫১তম মিনিটে ঘটল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা। মাঝমাঠ থেকে বল ড্রিবলিং করে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগে পাস দেন ম্যারাডোনা। ইংলিশ ডিফেন্ডার স্টিভ হজ বলটি ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভুলবশত নিজেদের পেনাল্টি বক্সের ভেতর শূন্যে ভাসিয়ে দেন।

বলটি লুফে নেওয়ার জন্য ধেয়ে আসেন ইংল্যান্ডের ৬ ফুট ১ ইঞ্চি লম্বা গোলরক্ষক পিটার শিল্পটন। আর তার দিকে ছুটে যান মাত্র ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির ম্যারাডোনা। উচ্চতার এত ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও সবাইকে চমকে দিয়ে বলটি পিটার শিল্পটনের মাথার ওপর দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়! আর্জেন্টিনা মেতে ওঠে উল্লাসে, আর ইংলিশ খেলোয়াড়রা রেফারির দিকে ছুটে যান হাত দিয়ে গোল করার দাবিতে। কিন্তু তিউনিসিয়ান রেফারি আলী বিন নাসেরের মনে হয়েছিল ম্যারাডোনা মাথা দিয়ে বল ঠেলেছেন, ফলে তিনি গোলের বাঁশি বাজান।

Diego_Maradona_scores_the_infamous_Hand_of_God_goal

হাত দিয়ে গোল করা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে অনেকই। সেই বিতর্কের অবসান হয়নি এখনো। তবে সেই গোল নিয়ে স্বয়ং ম্যারাডোণাই ম্যাচ শেষে বলেছিলেন, "গোলটি যদি হাত দিয়ে হয়েও থাকে, তবে সেটা ম্যারাডোনার হাত ছিল না, ওটা ছিল 'হ্যান্ড অফ গড' বা ঈশ্বরের হাত।"

৫৫ তম মিনিট: শতাব্দীর সেরা গোল
হাত দিয়ে করা সেই গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই, ঠিক ৪ মিনিট পর, ৫৫তম মিনিটে ম্যারাডোনা যা করলেন, তা ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিল। এবার আর কোনো বিতর্ক নয়, নিখাদ ফুটবল জাদুতে বিশ্বকে সম্মোহিত করলেন তিনি।

নিজেদের অর্ধে, ঠিক মাঝমাঠের দাগের কাছে বল পান ম্যারাডোনা। এরপর শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য দৌড়। একে একে পিটার বিয়ার্ডসলে, পিটার রিড, টেরি বুচার এবং টেরি ফেনউইক- ইংল্যান্ডের ৫ জন বিশ্বসেরা ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ের জাদুতে স্রেফ গতি আর শরীরের মোচড়ে ছিটকে ফেলে ইংলিশ পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়েন তিনি। সামনে তখন কেবল গোলরক্ষক পিটার শিল্পটন। শিল্পটনকেও ডামি শটে মাটিতে ফেলে দিয়ে শূন্য জালে বল জড়ান ম্যারাডোনা।

মাত্র ১০ সেকেন্ডে ৬০ গজ দৌড়ে করা ১১টি ছোঁয়ার এই গোলটিকে ২০০২ সালে ফিফার ভোটে অফিসিয়ালি 'শতাব্দীর সেরা গোল' হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

d72210369d01815ec3af73b251f914e658e04497.jpg

এক ম্যাচে দুই রূপ: খলনায়ক থেকে এক নিমেষে ঈশ্বর
একই ম্যাচে, মাত্র ৪ মিনিটের ব্যবধানে ম্যারাডোনা যেন দুটি ভিন্ন সত্ত্বায় হাজির হয়েছিলেন। প্রথম গোলে তিনি ছিলেন এক ধূর্ত চতুর খলনায়ক, আর দ্বিতীয় গোলে তিনি রূপ নিলেন ফুটবল মাঠের সর্বকালের সেরা জাদুকরে। ম্যাচটি আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জেতে (পরবর্তীতে তারা সেবার বিশ্বকাপও চ্যাম্পিয়ন হয়)।

Diego-Maradona---El-Grafico-Sports-Archive-52c6d9cc604346c5f587325de18436b6

ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়ানো আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে ম্যারাডোনার এই জয় ছিল এক পরম শান্তি। ফুটবল ইতিহাসের আর কোনো ম্যাচ একক কোনো ফুটবলারের আলোয় এভাবে উদ্ভাসিত হয়নি। ভালো কিংবা মন্দের বিতর্কে ম্যারাডোনার সেই ৪ মিনিটের ঝড় ফুটবল যতদিন থাকবে, ততদিন বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় হিসেবে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।