শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ঢাকা

বিশ্বকাপের বাকি ২০ দিন

ব্যাটল অব সান্তিয়াগো: ফুটবল মাঠ যখন রূপ নিয়েছিল রণক্ষেত্রে

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ২২ মে ২০২৬, ০২:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

ব্যাটল অব সান্তিয়াগো: ফুটবল মাঠ যখন রূপ নিয়েছিল রণক্ষেত্রে

সামনেই ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। প্রায় শতবর্ষের এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে আমরা যেমন সুন্দর ও নান্দনিক ফুটবলের জয়গান দেখেছি, তেমনি কিছু ম্যাচ জন্ম দিয়েছে চরম কুখ্যাতি ও কলঙ্কের। ফুটবল মাঠে স্লেজিং, ফাউল বা লাল কার্ড দেখা নতুন কিছু নয়। কিন্তু একটা আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ যদি আক্ষরিক অর্থেই বক্সিং রিং কিংবা মারামারির রণক্ষেত্রে রূপ নেয়, তবে তা ইতিহাস হয়ে থাকে। ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে ঘটেছিল তেমনই এক নজিরবিহীন ঘটনা, যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে চিরকাল 'ব্যাটল অফ সান্তিয়াগো' বা 'সান্তিয়াগোর যুদ্ধ' নামে পরিচিত।

১৯৬২ সালের ২ জুন, স্বাগতিক চিলি এবং ইউরোপের পরাশক্তি ইতালির মধ্যকার ম্যাচটি ফুটবলের সৌন্দর্যকে মাটি চাপা দিয়ে রূপ নিয়েছিল এক কলঙ্কিত অধ্যায়ে।


বিজ্ঞাপন


বারুদ জমেছিল মাঠের বাইরেই
ম্যাচটি শুরু হওয়ার আগেই মাঠের বাইরের কিছু ঘটনা পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলেছিল। ইতালির দুজন সাংবাদিক চিলির রাজধানী সান্তিয়াগো শহর এবং সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে ইতালিয়ান পত্রিকায় অত্যন্ত আপত্তিকর ও অবমাননাকর কিছু প্রতিবেদন লেখেন। চিলিকে তারা 'দরিদ্র, অনগ্রসর এবং অনুন্নত' এক দেশ হিসেবে খাটো করে দেখান।

এই খবর চিলির সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় জনগণের মনে ইতালির প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার জন্ম হয়। ইতালিয়ান সাংবাদিকরা পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ম্যাচ শুরুর আগেই চিলি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। কিন্তু চিলির খেলোয়াড়দের মনের ভেতর যে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল, তার বিস্ফোরণ ঘটে মাঠের ভেতর।

Chile-Italy-3-1024x808

সান্তিয়াগোর যুদ্ধ: ফুটবল মাঠ যখন রূপ নিয়েছিল রণক্ষেত্রে


বিজ্ঞাপন


সান্তিয়াগোর জাতীয় স্টেডিয়ামে ম্যাচ শুরু হওয়া মাত্রই ফুটবল যেন উধাও হয়ে গেল! খেলার বদলে দুই দলের খেলোয়াড়রা একে অপরকে লাথি, কনুইয়ের গুঁতো এবং স্লেজিং করতে শুরু করেন।

ম্যাচ শুরুর মাত্র ১২ সেকেন্ডের মাথায় প্রথম ফাউলটি ঘটে। খেলার বয়স তখন মাত্র ৮ মিনিট, ইতালির ফরোয়ার্ড জর্জিও ফেরিনি চিলির এক খেলোয়াড়কে লাথি মারলে রেফারি কেন অ্যাস্টন তাঁকে লাল কার্ড (মাঠ ছাড়ার নির্দেশ) দেখান। কিন্তু ফেরিনি মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র পুলিশ মাঠে ঢুকে ফেরিনিকে টেনেহিঁচড়ে মাঠ থেকে বের করে নিয়ে যায়।

637965331_1603189884565346_1362213509919975811_n

ফুটবলাররা যেন বক্সিং রিংয়ে!
১১ জন নিয়ে খেলা চিলির ফুটবলাররা ১০ জনের ইতালির ওপর শারীরিক আক্রমণ আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রথমার্ধের শেষের দিকে চিলির লিওনেল সানচেজ বাম প্রান্ত দিয়ে বল নিয়ে যাওয়ার সময় ইতালির মারিও ডেভিড তাঁকে ফাউল করে মাটিতে ফেলে দেন। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই সানচেজ উঠে দাঁড়িয়ে ইতালির মারিও ডেভিডের চোয়ালে সরাসরি এক জোরালো বক্সিং পাঞ্চ (ঘুষি) মারেন!

আশ্চর্যের বিষয়, সানচেজের এই মারাত্মক অপরাধ রেফারির চোখে পড়েনি এবং তাকে মাঠের বাইরেও পাঠানো হয়নি। এর প্রতিশোধ নিতে কয়েক মিনিট পর মারিও ডেভিড বাতাসে লাফিয়ে উঠে সানচেজের ঘাড়ে এক ফ্লাইং কিক মারেন। এবার রেফারি ডেভিডকে সরাসরি লাল কার্ড দিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই ইতালি পরিণত হয় ৯ জনের দলে।

"আমি কোনো ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করছিলাম না, মনে হচ্ছিল আমি সামরিক বাহিনীর কোনো দ্বন্দ্বে মধ্যস্থতা করতে নেমেছি।"— পরবর্তীতে এই ম্যাচ নিয়ে বলেন রেফারি কেন অ্যাস্টন।

Chile-Italy-3-1024x808

পুলিশকে মাঠে ঢুকতে হয়েছিল চার চারবার
দ্বিতীয়ার্ধেও মারামারি থামেনি। চিলির সানচেজ ইতালির আরেক ডিফেন্ডার উমবের্তো মাসকিওর নাকে আরেকটি ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দেন। পুরো ম্যাচে ফুটবলারদের হাতাহাতি এবং দাঙ্গা থামাতে পুলিশকে মোট চারবার মাঠে প্রবেশ করতে হয়েছিল।

৯ জনের ইতালি শেষ পর্যন্ত চিলির শারীরিক ফুটবল ও আক্রমণের সামনে টিকতে পারেনি। ম্যাচটি চিলি ২-০ ব্যবধানে জিতে নেয়। কিন্তু গোল বা জয়-পরাজয় ছাপিয়ে এই ম্যাচটি বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক কালো দাগ রেখে যায়।

480951558_637350505550707_2838054513673420962_n

এই ম্যাচের পরই জন্ম নেয় 'হলুদ ও লাল কার্ড'!
ম্যাচটি শেষ হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা হয়। ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন যখন এই ম্যাচের হাইলাইটস দেখায়, তখন ধারাভাষ্যকার ডেভিড কোলম্যান ম্যাচটিকে পরিচয় করিয়ে দেন এভাবে: "ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নির্বোধ, ভয়ঙ্কর ও জঘন্য প্রদর্শনী দেখতে যাচ্ছেন আপনারা।"

তবে এই কলঙ্কিত ম্যাচের একটি ইতিবাচক দিকও ছিল। সান্তিয়াগোর এই যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে ম্যাচ রেফারি কেন অ্যাস্টন পরবর্তীতে ফিফার রেফারি কমিটির প্রধান হয়ে একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময়ে রেফারিরা মুখে বলে খেলোয়াড়দের সতর্ক বা মাঠ থেকে বের করে দিতেন, যা ভাষার দূরত্বের কারণে অনেক সময় খেলোয়াড়রা বুঝতেন না। কেন অ্যাস্টন ট্রাফিক লাইটের (হলুদ ও লাল) ধারণা থেকে ফুটবলে 'হলুদ কার্ড' এবং 'লাল কার্ড' ব্যবস্থার প্রচলন করেন, যা ১৯৭০ বিশ্বকাপ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়।

ফুটবলকে শৃঙ্খলায় বাঁধার পেছনে সান্তিয়াগোর সেই যুদ্ধ এক বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল, যা আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে হিংস্র ম্যাচ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর