স্পোর্টস ডেস্ক
২১ মে ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম
সামনেই ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। বিশ্বকাপের প্রায় শতবর্ষের ইতিহাসে মাঠের ভেতরে যেমন তৈরি হয়েছে অনেক রূপকথা, তেমনি কিছু ঘটনা জন্ম দিয়েছে চরম নাটকীয়তা আর বিতর্কের। মাঠের ভেতরের এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা কোনো রূপকথাকে এক নিমেষে ট্র্যাজেডিতে রূপান্তর করে। ফুটবল ইতিহাসের তেমনই এক অন্ধকার, স্তম্ভিত ও অবিস্মরণীয় রাতের গল্প এটি, যা ঘটেছিল ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপের ফাইনালে।
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা জাদুকর জিনেদিন জিদানের বিদায়ী ম্যাচটি যেভাবে ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত লাল কার্ডে রূপ নিয়েছিল, তা আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে আছে।
আরও পড়ুন- গোয়েন্দারা যা পারেনি, তা করেছিল এক কুকুর! ১৯৬৬-র সেই ট্রফি চুরির গল্প
আরও পড়ুন- ১০ গোল খেয়ে গড়েছিলেন বিশ্বকাপে ভয়ংকর রেকর্ড, যার জন্য খেয়েছেন গুলি
এক জাদুকরের শেষ মঞ্চ সাজানো
২০০৬ সালের ৯ জুলাই, বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি দুই পরাশক্তি- ফ্রান্স ও ইতালি। তবে এই ফাইনালটি কেবল একটি শিরোপার লড়াই ছিল না, এটি ছিল ফরাসি ফুটবল কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। পুরো বিশ্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল তাদের প্রিয় 'জিজু'-র বিদায়টা রাজকীয় করার জন্য।
ম্যাচের শুরুটাও হয়েছিল তেমনি। মাত্র ৭ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি থেকে এক চোখধাঁধানো 'প্যানেনকা' শটে গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন জিদান। যদিও ১৯ মিনিটে ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জি গোল করে সমতা ফেরান। ১-১ সমতায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। কিন্তু কে জানত, প্রথমার্ধে গোল করা এই দুই ফুটবলারই অতিরিক্ত সময়ে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নাটকের জন্ম দেবেন!

১১০ তম মিনিট: সেই একটি 'ঢুঁশ' এবং স্তব্ধতা
ম্যাচের বয়স তখন ১১০ মিনিট। টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছে ফাইনাল। ইতালির পেনাল্টি বক্সের সামনে থেকে নিজেদের অর্ধে ফিরছিলেন জিদান এবং মাতেরাজ্জি। হঠাৎ দেখা যায়, মাতেরাজ্জি জিদানের জার্সি টেনে কিছু একটা বলছেন। জিদান প্রথমে মৃদু হেসে এগিয়ে যান এবং বলেন, "আমার জার্সিটা যদি তোমার সত্যিই খুব পছন্দ হয়, তবে ম্যাচ শেষে তোমাকে দিয়ে দেব।"

কিন্তু এর জবাবে মাতেরাজ্জি এমন কিছু একটা মন্তব্য করেন, যা জিদানের সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যায়। জিদান হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ান, ক্ষণিকের জন্য শান্ত চোখে মাতেরাজ্জির দিকে তাকান এবং ক্ষিপ্র গতিতে ইতালিয়ান ডিফেন্ডারের বুকে মাথা দিয়ে এক প্রচণ্ড ধাক্কা বা 'ঢুঁশ' মারেন! মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মাতেরাজ্জি।
"সে (মাতেরাজ্জি) আমার মা ও বোনকে নিয়ে অত্যন্ত নোংরা ও আপত্তিকর গালি দিয়েছিল। আমি বারবার সহ্য করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু একপর্যায়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি।" — পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে নিজের আচরণের ব্যাখ্যায় জিনেদিন জিদান।
ট্রফির পাশ দিয়ে এক ট্র্যাজিক রাজপুত্রের প্রস্থান
ঘটনাটি রেফারি হোরাসিও এলিজোন্দোর চোখের আড়ালে ঘটলেও, ফোর্থ অফিসিয়াল লুইস মেদিনা কান্তালেজো তা ভিডিও স্ক্রিনে দেখে ফেলেন। রেফারিকে ওয়্যারলেসে ঘটনাটি জানানো হলে তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই পকেট থেকে বের করেন লাল কার্ড।
বিশ্বকাপ ফাইনাল, ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ, আর সেখানে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হচ্ছে বিশ্বসেরা তারকাকে! লাল কার্ড দেখার পর জিদান যখন মাথা নিচু করে মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর ঠিক পাশেই রাখা ছিল কাঙ্ক্ষিত সোনালী বিশ্বকাপ ট্রফিটি। ট্রফিটির দিকে এক নজর না তাকিয়েই মাথা নিচু করে জিদানের সেই হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক, বিষাদময় ও ট্র্যাজিক ছবি হিসেবে অমর হয়ে আছে।
পেনাল্টি শুটআউট এবং ইতালির জয়
জিদানকে হারানোর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ফ্রান্স টাইব্রেকারে ইতালির কাছে ৫-৩ ব্যবধানে হেরে যায়। ইতালি উদযাপনে মাতে তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের, আর ফ্রান্স ডুবে যায় এক বুক হতাশায়।

ম্যাচ শেষে পুরো ফুটবল বিশ্ব ইতালির জয়ের চেয়ে বেশি আলোচনা করেছে জিদানের সেই লাল কার্ড নিয়ে। ফরাসিরা তাঁদের নায়ককে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়নি, বরং তাঁর আবেগের পাশে দাঁড়িয়েছিল। জিদান সেই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলেছিলেন, পেয়েছিলেন ‘গোল্ডেন বল’। হয়তো সেই মুহূর্তে মাথা গরম না করলে ফ্রান্সকে আরও একবার বিশ্বকাপও জেতাতে পারতেন।
ওই ঘটনার পরে সমালোচনার মুখে পড়া জিদানের পাশে দাঁড়ান ফ্রান্সের তখনকার প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক। বলেন, জিদান একজন ভালো মনের মানুষ। তাঁর মতে জিদানের ঢুসটা ছিল উসকানির ফল। ঘটনার পর করা এক জরিপে দেখা যায়, ফরাসি জনগণের ৬১ শতাংশ জিদানের প্রতি সহমর্মী। তবে ফরাসি পত্রিকা লা ফিগারো এ ঘটনাকে ঘৃণ্য ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করে।
ঘটনার তদন্তের পর ফিফা জানায়, জিদানকে লাল কার্ড দেখানো রেফারি এলিজন্দোর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তবে ফিফা মাতেরাজ্জিকে ৫ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানা ও দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করে। জিদানকে সাড়ে ৭ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানা ও তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
ফুটবল ইতিহাসে জিদান একজন অবিসংবাদিত জাদুকর হিসেবেই স্মরণীয়, তবে ২০০৬ সালের সেই কালো রাত এবং তার ক্যারিয়ারের শেষ মুহূর্তের সেই 'ঢুঁশ' ফুটবলপ্রেমীদের চিরকাল মনে করিয়ে দেয়- নায়কেরাও মানুষ, এবং আবেগ কখনো কখনো মহাকাব্যের শেষটাও ওলটপালট করে দিতে পারে।