সামনেই ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। বিশ্ব ফুটবলের এই মহাযজ্ঞকে ঘিরে উন্মাদনা এখন তুঙ্গে। ফুটবল বিশ্বকাপের প্রায় শতবর্ষের ইতিহাসে মাঠের ভেতরে যেমন তৈরি হয়েছে অজস্র মহাকাব্য, তেমনি মাঠের বাইরেও ঘটেছে এমন কিছু ঘটনা, যা কোনো রোমাঞ্চকর সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। এমনই এক অবিশ্বাস্য ও অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের ঠিক চার মাস আগে।
সেবার পুরো ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে চুরি হয়ে গিয়েছিল বিশ্বকাপ ট্রফিই, যেটি পরিচিত ছিল 'জুলে রিমে ট্রফি' নামে। আর সেই ট্রফি উদ্ধারে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড যখন সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তখন দৃশ্যপটে হাজির হয়েছিল এক চারপেয়ে নায়ক!
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন- এক আত্মঘাতী গোল যেভাবে কেড়ে নিয়েছিল জীবন
আরও পড়ুন- ১০ গোল খেয়ে গড়েছিলেন বিশ্বকাপে ভয়ংকর রেকর্ড, যার জন্য খেয়েছেন গুলি
১৯৬৬ সালের মার্চ মাস। বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন লন্ডনের ‘ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হল’-এ একটি স্ট্যাম্প প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে জুলে রিমে ট্রফিটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে। ট্রফিটির নিরাপত্তার জন্য দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা কড়া পাহারা, মোটা অঙ্কের ইনস্যুরেন্স এবং বিশেষ পুলিশি টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন
কিন্তু ২০ মার্চ, রবিবার বিকেলে যেন এক ভোজবাজির মতো ঘটে গেল অঘটন। চার্চের ডিউটি বদল আর নিরাপত্তারক্ষীদের চোখের পলক ফাঁকি দিয়ে কাঁচের শোকেস ভেঙে গায়েব হয়ে যায় খাঁটি সোনা আর মূল্যবান পাথরে তৈরি ফুটবলের সর্বোচ্চ স্মারকটি।
বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র চার মাস আগে ট্রফি চুরির এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ব্রিটিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মুখ পুড়ল আন্তর্জাতিক মহলে। ঘটনার তদন্তে নামানো হলো ব্রিটেনের বিখ্যাত গোয়েন্দা বিভাগ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড-কে।
ট্রফি চুরির পরদিনই ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যানের কাছে একটি বেনামী চিঠি আসে। সেখানে ট্রফিটি অক্ষত ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে ১৫,০০০ পাউন্ড মুক্তিপণ দাবি করা হয়। চোর হুমকি দেয়, পুলিশকে জানালে ট্রফিটি গলিয়ে ফেলা হবে।

পুলিশ গোপনে ফাঁদ পেতে 'জ্যাকসন' ছদ্মনামের এক মধ্যস্বত্বভোগীকে গ্রেফতার করতে পারলেও আসল চোর কিংবা ট্রফির কোনো সন্ধান মেলাতে পারেনি। দিন গড়াতে লাগল, কিন্তু ট্রফির কোনো হদিস নেই। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তখন গোপনে আসল ট্রফির একটি রেপ্লিকা বা নকল তৈরি করার কাজ শুরু করে দেয়, যাতে টুর্নামেন্ট বাতিল করতে না হয়।
ঘটনার এক সপ্তাহ পর, ২৭ মার্চ। দক্ষিণ লন্ডনের আপার নরউড এলাকার বাসিন্দা ডেভিড করবেট নামের এক যুবক তার পোষা কুকুরটিকে নিয়ে রাতে হাঁটতে বের হন। ৪ বছর বয়সী সেই মিক্সড-ব্রিড কোলিস কুকুরটির নাম ছিল 'পিকলস'।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই পিকলস তার মালিকের প্রতিবেশী একজনের গাড়ির চাকার পাশে একটি ঝোপের দিকে ছুটে যায়। সেখানে খবরের কাগজ দিয়ে শক্ত করে মোড়ানো একটি ভারী বস্তু পড়ে ছিল। পিকলস ক্রমাগত গন্ধ শুঁকছিল আর ডাকছিল। ডেভিড করবেট প্রথমে ভেবেছিলেন ওটি হয়তো কোনো বোমা!
কৌতূহলবশত করবেট কাগজের মোড়কটি কিছুটা ছিঁড়তেই তাঁর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। তিনি দেখলেন, ভেতরে জ্বলজ্বল করছে একটি সোনালী মূর্তি। মূর্তির নিচে খোদাই করা 'ব্রাজিল', 'পশ্চিম জার্মানি'র মতো দেশের নাম। করবেট বুঝতে পারলেন, এটি আর কিছু নয়, নিখোঁজ জুলে রিমে ট্রফি!

"আমি যখন কাগজের মোড়কটি একটু খুললাম, তখন এক নগ্ন নারীমূর্তি ডানা মেলে ধরে আছে দেখলাম। নিচে বিভিন্ন দেশের নাম। আমার হৃদস্পন্দন যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল!"- পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে বলেন ডেভিড করবেট। এদিকে করবেট যখন ট্রফিটি নিয়ে স্থানীয় থানায় যান, পুলিশ প্রথমে তাকেই চোর সন্দেহে জেরা শুরু করে। তবে দ্রুতই তাঁর নির্দোষিতা প্রমাণিত হয় এবং ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন নিশ্চিত করে যে এটিই আসল ট্রফি।
পরদিন সকালের খবরের কাগজের মূল শিরোনামে চলে আসে 'পিকলস'। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড যা পারেনি, তা এক লহমায় করে দেখিয়েছে এক পোষা কুকুর! রাতারাতি পিকলস বনে যায় ব্রিটেনের জাতীয় বীর। তার মালিক ডেভিড করবেট পুরস্কার হিসেবে পান ৬,০০০ পাউন্ড (যা তৎকালীন সময়ে লন্ডনে একটি বাড়ি কেনার জন্য যথেষ্ট ছিল)।
একটি স্পন্সর কোম্পানি পিকলসের জন্য আজীবন ফ্রি ডগ-ফুডের ব্যবস্থা করে। এমনকি বেশ কয়েকটি ব্রিটিশ সিনেমা এবং টিভি শো-তে অভিনয়ের সুযোগ পায় পিকলস।
১৯৬৬ বিশ্বকাপে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে ইংল্যান্ড যখন প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, তখন দলের খেলোয়াড়দের পাশাপাশি বিজয়ী দলের অফিসিয়াল ডিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিল পিকলস। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ববি মুর গ্যালারি থেকে নিচে তাকিয়ে পিকলসকে অভিবাদন জানিয়েছিলেন।
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এই চুরির ঘটনার ইতি ঘটেছিল হ্যাপী এন্ডিং দিয়ে, আর তার পুরো কৃতিত্ব ছিল 'পিকলস' নামের সেই অসাধারণ কুকুরটির। ফুটবল যতদিন থাকবে, বিশ্বকাপ ট্রফি বাঁচানোর এই গল্পে পিকলসের নামও চিরকাল অম্লান থাকবে।




