ধর্ম ডেস্ক
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৪:৩১ পিএম
আল্লাহর রাসুলের প্রতি ভালোবাসায় সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। নবীপ্রেমের বহু দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তাঁরা। কেননা রাসুলের প্রতি ভালোবাসা রাখা ঈমানের অনুষঙ্গ। নবীপ্রেমের শিক্ষা রয়েছে সাহাবিদের জীবনে। এমন বহু ঘটনা থেকে এখানে একটি তুলে ধরা হলো।
আবু খায়সামা (রা.)। একজন ধনী সাহাবি। একাধিক যুদ্ধে তিনি নবীজির সঙ্গে সশরীরে অংশগ্রহণ করেছেন। তাবুক যুদ্ধে প্রথম যাত্রায় তিনি শরিক হতে না পারলেও নবীপ্রেমের স্ফুলিঙ্গ তাঁকে ঠিকই তাবুক যুদ্ধে নিয়ে গেছে। সেই ঘটনাটি এখানে বর্ণনা করা হলো।
হাদিসের ভাষায় ঘটনাটির বর্ণনা এরূপ— নবম হিজরির ঘটনা। রোমের বাদশাহ মদিনা আক্রমণের ষড়যন্ত্র করছিল। নবীজি সংবাদ পেয়ে তার আগমনের অপেক্ষা না করে নিজেরা অগ্রসর হয়ে মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এদিকে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে জিহাদের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সময়টা ছিল প্রচণ্ড গরম আর মদিনার প্রধান খাদ্য খেজুর পাকার মৌসুম। তাছাড়া যুদ্ধের ময়দান ছিল মদিনা থেকে বেশ দূরত্বের (মদিনা থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের রাস্তা)। সব কিছু মিলিয়ে এই যুদ্ধটা ছিল অন্যান্য যুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এতকিছুর পরও ঈমানের উজ্জ্বলতায় কোনো কিছুই তাঁদের রুখতে পারেনি। সব বাধা-বিপত্তি, কষ্ট-ক্লেশ উপেক্ষা করে মুনাফিকদের ছাড়া সব মুমিনই এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তবে অল্পসংখ্যক মুমিন সাহাবিও বিভিন্ন কারণে মদিনায় রয়ে গিয়েছিলেন। যাঁদের মধ্যে আবু খায়সামা (রা.)ও ছিলেন একজন।
আরও পড়ুন: পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত একমাত্র সাহাবি
তবে তিনি অংশগ্রহণ না করতে পারায় মনের মধ্যে ছিল যথেষ্ট অস্থিরতা। আর এই অস্থিরতা ও পেরেশানি নিয়ে একদিন তিনি নিজের বাগানে গেলেন। তখন প্রচণ্ড গরম পড়ছিল। গরমের উষ্ণতায় মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। এ অগ্নিপরিবেশে স্বামীকে শীতল পরশ দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল তাঁর দুই স্ত্রী। গাছের ছায়া, ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা, নরম-কোমল বিছানা, দস্তরখানের ওপর বাহারি রঙের খাবারের আয়োজন করে তাঁরা একটি মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আবু খায়সামা (রা.)-এর মন শীতল ছায়া, ঠাণ্ডা পানি, বাহারি দস্তরখান আকর্ষণ করছিল ঠিকই; কিন্তু সেই সঙ্গে হৃদয়-সাগরে এক তরঙ্গবিক্ষুব্ধ ঝড় শুরু হলো। একটি পবিত্র ভাবনার প্রচণ্ড ধাক্কা যেন সামনের বাহারি সব আয়োজন উল্টে দিল। মনের গহীনে জেগে উঠল— প্রাণপ্রিয় নবী তো এ প্রচণ্ড গরমে আল্লাহর পথে সফর করে কত কষ্ট করছেন! আর আমি এখানে সুখের মঞ্চে বসে আনন্দ উপভোগ করছি!
এ ভাবনা মনে দোলা দিতেই তিনি উটে চড়ে তাবুকের পথে রওনা হয়ে গেলেন। এরই মধ্যে সাহাবায়ে কেরাম তাবুক পৌঁছে গিয়েছিলেন। নবীজি দূর থেকে দেখেই আগ্রহভরা কণ্ঠে বলেন, হয়তো আবু খায়সামা হবে। কাছে আসার পর নবীজির ধারণাই সত্য হলো। সালামের উত্তর দেওয়ার পর নবীজি বলেন, আবু খায়সামা, তোমাকে মোবারকবাদ। ধ্বংসের উপকণ্ঠ থেকে তুমি বের হয়ে এসেছ। (মুসনাদে আহমদ: ২৭১৭৫)
আরও পড়ুন: শিশু মুহাম্মদ (স.) সম্পর্কে দুধমা হালিমার চমকপ্রদ বর্ণনা
এই যুদ্ধে মুসলমানরা জয়লাভ করেন। মুসলমানদের উপিস্থিতির খবর শুনেই রোমান সৈন্যরা পালাতে থাকে। এ অভিযানে খােদাদ্রোহী সকল অপশক্তির বিনাশ ঘটে। রােমানদের পলায়নের সূত্র ধরে ইসলামের প্রসার ঘটে এবং ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা বৃদ্ধি পায়।
উল্লেখ্য, যুদ্ধের ময়দান দূরে, সরঞ্জাম ও বাহন সংকট, মদিনায় দুর্ভিক্ষ ও ফসল তোলার সময়, প্রচণ্ড গরমের মৌসুম এবং শত্রুপক্ষ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শক্তিশালী বাহিনী হওয়ার কারণে এই যুদ্ধ অনেক কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই কিছু মুসলমান প্রথমদিকে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা সৈন্যদের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়েছিলেন। কিন্তু মুনাফিকরা নবীজির নির্দেশ অমান্য করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল- তোমরা এই প্রচণ্ড গরমের মধ্যে যুদ্ধের জন্য বের হয়ো না। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করেন— ‘পেছনে থেকে যাওয়া লোকেরা আল্লাহর রাসুল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে থাকতে পেরে আনন্দ লাভ করেছে; আর জান ও মালের দ্বারা আল্লাহর রাহে জিহাদ করতে অপছন্দ করেছে এবং বলেছে, এই গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না। বলে দাও, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচণ্ডতম। যদি তারা বুঝত।’ (সুরা তাওবা: ৮১)
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সাহাবিদের জীবনী থেকে নবীপ্রেমের শিক্ষা লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।