images

ইসলাম

সমকামিতা ও একটি জাতির ধ্বংসের ইতিহাস

ধর্ম ডেস্ক

২২ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:৩২ পিএম

সমকামিতা কঠিন কবিরা গুনাহের মধ্যে অন্যতম। একে সমর্থন করাও ঘৃণিত কাজ। জঘন্যতম এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত পুরো একটি জাতিকে আল্লাহ তাআলা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, যাতে পরবর্তীরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে যে ওই পাপটি আল্লাহ তাআলার কাছে খুবই অপছন্দনীয় এবং এর শাস্তি ভয়াবহ। 

কাওমে লূত বা হজরত লূত (আ.)-এর জাতি। এই সম্প্রদায় বসবাস করত সাদ্দূম নগরীতে। এই অঞ্চলকে বর্তমানে ট্রান্স জর্দান বলা হয়। এটি ইরাক ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। তারা প্রকাশ্য সভা বানিয়ে অশ্লীলতা-বেহায়াপনা করত। এই জঘন্য অপকর্ম তারা প্রকাশ্যে করে আনন্দ লাভ করত। তারাই সর্বপ্রথম সমকামিতার মতো গর্হিত পাপ শুরু করেছে যা এর পূর্বে কোনো আদম সন্তান করেনি।

আরও পড়ুন: পৃথিবীর প্রথম কোরবানির বিস্ময়কর ঘটনা

আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে বলেন, ‘আমি লূত (আ.)-কে প্রেরণ করেছিলাম। যখন তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন, তোমরা চরম অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতার কাজ করছ যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বে কেউ কখনো করেনি। তোমরা কামপ্রবৃত্তি পূরণ করার জন্য মেয়েদের কাছে না গিয়ে পুরুষদের কাছে যাচ্ছ। প্রকৃতপক্ষে তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।’ (সুরা আরাফ: ৮০-৮১)

লূত (আ.) যখন তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন, তখন তারা লূত (আ.)-কে নির্বাসন দিতে চায় এবং উপহাস করে বলে—‘এরা নিজেদের বেশি পবিত্র রাখতে চায়।’

তাফসিরে পাওয়া যায়, হজরত জিব্রাইল (আ.), ইসরাফিল (আ.) ও মিকাইল (আ.) সুদর্শন পুরুষের রূপ ধরে লূত (আ.) এর এলাকায় উপস্থিত হন এবং মেহমান হন। লূত (আ.) গোপনে তাদেরকে আশ্রয় দেন, কিন্তু লূত (আ.)-এর এক স্ত্রী এই খবর পাপাচারী সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে দেয়। এরপর পাপী সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের বিকৃত রুচি চরিতার্থ করার জন্য লূত (আ.)-এর বাসস্থান আক্রমণ করে। শেষ পর্যায়ে লূত (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেন তাঁর মেহমানদের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য। 

তখন ফেরেশতাগণ বলে ওঠেন, ‘হে লূত (আ.)! আমরা আপনার পালনকর্তার পক্ষ হতে প্রেরিত ফেরেশতা। এরা কখনও আপনার দিকে পৌঁছাতে পারবে না। ব্যস আপনি কিছুটা রাত থাকতে থাকতে নিজের লোকজন নিয়ে বাইরে চলে যান। আর আপনাদের কেউ যেন পেছনে ফিরে না তাকায়। কিন্তু নিশ্চয় আপনার স্ত্রীর উপরও তা আপতিত হবে, যা ওদের উপর আপতিত হবে। ভোরবেলা-ই তাদের প্রতিশ্রুতির সময়, ভোর কি খুব নিকটে নয়?’ (সূরা হুদ: ১১)

মুফাসসিরগণ বলেন, এরপর প্রথম জিব্রাইল (আ.) তাদের সামনে আসেন এবং তাঁর ডানা দ্বারা হালকা আঘাত করেন। এতেই সকল পাপাচারী অন্ধ হয়ে যায়। এরপর জিব্রাইল (আ.) লূত(আ.)-এর নিরাপদে সরে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। এরপর ডানা দিয়ে সমগ্র সাদ্দূম নগরীকেই গোড়াসহ তুলে ফেলেন, এত উঁচুতে নিয়ে যান যে প্রথম আসমানের রক্ষী ফেরেশতারাও সাদ্দূম নগরীর কুকুর আর মোরগের ডাক শুনতে পাচ্ছিলো।

আরও পড়ুন: বন্যায় ধ্বংস হওয়া দুই জাতি

এবার পুরো জনপদকে উল্টো করে সজোরে জমিনে ধসিয়ে দেওয়া হয়। এবার আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যেক পাপীর নাম লেখা পাথর বর্ষণ করা হয়, এমনকি যেসব পাপী বাসিন্দা কোনো কাজে নগরীর বাইরে ছিল তাদের উপরও প্রস্তর খণ্ড এসে পড়ে। এরপর আল্লাহ সে স্থানে দূষিত পানির জলাধারা প্রবাহিত করে দেন।

ইরশাদ হয়েছে, ‘অবশেষে আমার (আল্লাহর) আদেশ চলে এলো, তখন আমি উক্ত জনপদকে ধ্বংস করে দিলাম এবং তাদের উপর স্তরে স্তরে পাথর বর্ষণ করলাম।’ (সুরা হুদ: ৮২)

এ ধ্বংসাত্মক গুনাহ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আমার উম্মত সম্পর্কে যেসব বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হচ্ছে পুরুষে পুরুষে যৌন মিলনে লিপ্ত হওয়া।’ (ইবনে মাজাহ, মেশকাত: ৩৪২১)

ইকরামাহ (রা.) ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা যাদেরকে লূতের সম্প্রদায়ের মতো আচরণ করতে দেখ, সেই পাপাচারী এবং যার ওপর ওই কুকর্ম করা হয়েছে উভয়কে হত্যা করো।’ (ইবনে মাজাহ, মেশকাত: ৩৫৭৫)

এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করেই ইমাম শাফেয়ি (রহ) এবং আলেমদের একটি জামাত বলেছেন, ‘লাওয়াতাতকারীকে’ (পুরুষে পুরুষে যৌনমিলনকারীকে) হত্যা করতে হবে, সে বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত হোক। ইমাম আবু হানিফা (রহ) বলেন, তাকে উপর থেকে নিচে নিক্ষেপ করতে হবে এবং এক এক করে পাথর বর্ষণ করতে হবে যেভাবে লূত (আ.) এর কওমের প্রতি আল্লাহ করেছিলেন।

সুতরাং এই নিকৃষ্ট কাজটি যেকোনো সম্প্রদায়ের জন্য অভিশাপস্বরূপ তা বলার অপেক্ষা রাখে না! এই নোংরামির শেষ পরিণতি যে ধ্বংস, তা প্রমাণে কওমে লূত (আ.) এক বিরাট ও স্পষ্ট নিদর্শন। 

আরও পড়ুন: সবচেয়ে বড় গুনাহ

লুত (আ.)-এর জাতির ধ্বংসস্থলটি বর্তমানে ‘বাহরে মাইয়েত’ বা ‘বাহরে লুত’ নামে খ্যাত। এটি ডেড সি বা মৃত সাগর নামেও পরিচিত। ফিলিস্তিন ও জর্দান নদীর মধ্যবর্তী স্থানে বিশাল অঞ্চলজুড়ে নদীর রূপ ধারণ করে আছে এটি। জায়গাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ নিচু। এর পানিতে তেলজাতীয় পদার্থ বেশি। এতে কোনো মাছ, ব্যাঙ, এমনকি কোনো জলজ প্রাণীও বেঁচে থাকতে পারে না। এ কারণেই একে ‘মৃত সাগর’ বলা হয়।

সাদুম উপসাগরবেষ্টিত এলাকায় এক ধরনের অপরিচিত উদ্ভিদের বীজ পাওয়া যায়, সেগুলো মাটির স্তরে স্তরে সমাধিস্থ হয়ে আছে। সেখানে শ্যামল উদ্ভিদ পাওয়া যায়, যার ফল কাটলে তার মধ্যে পাওয়া যায় ধুলাবালি ও ছাই।

এখানকার মাটিতে প্রচুর গন্ধক পাওয়া যায়। এই গন্ধক উল্কাপতনের অকাট্য প্রমাণ। ১৯৬৫ সালে ধ্বংসাবশেষ অনুসন্ধানকারী একটি আমেরিকান দল ডেড সির পার্শ্ববর্তী এলাকায় এক বিরাট কবরস্থান দেখতে পায়, যার মধ্যে ২০ হাজারেরও বেশি কবর আছে। এটি থেকে অনুমান করা হয়, কাছেই কোনো বড় শহর ছিল। কিন্তু আশপাশে এমন কোনো শহরের ধ্বংসাবশেষ নেই, যার সন্নিকটে এত বড় কবরস্থান হতে পারে। তাই সন্দেহ প্রবল হয়, এটি যে শহরের কবরস্থান ছিল, তা সাগরে নিমজ্জিত হয়েছে।

সাগরের দক্ষিণে যে অঞ্চল রয়েছে, তার চারদিকেও ধ্বংসলীলা দেখা যায়। জমিনের মধ্যে গন্ধক, আলকাতরা, প্রাকৃতিক গ্যাস এত বেশি মজুদ দেখা যায় যে এটি দেখলে মনে হয়, কোনো এক সময় বিদ্যুৎ পতনে বা ভূমিকম্পে গলিত পদার্থ বিস্ফোরণে এখানে এক ‘জাহান্নাম’ তৈরি হয়েছিল। 

আল্লাহ আমাদেরকে কঠিন গুনাহ থেকে হেফাজত করুন। ইসলামি জ্ঞান দান করুন। আমাদের সামনে হালাল-হারাম স্পষ্ট করুন। ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করুন। আমাদেরকে সঠিকপথগামী করুন। আমিন।

(তথ্যসূত্র: সিরাতে সরওয়ারে আলম, দ্বিতীয় খণ্ড, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তাফসির ইবনে কাসির)