Dhaka Mail Logo

ইসলাম

সাহাবিরা যেসব নফল ইবাদত গুরুত্ব দিয়ে আদায় করতেন

ধর্ম ডেস্ক

৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম

নফল ইবাদতকে অনেকে কম গুরুত্ব দেন। অথচ নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা অর্জন করা যায়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমন কি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয়পাত্র বানিয়ে নেই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে।’ (সহিহ বুখারি: ৬৫০২)

সাহাবিরা নফল ইবাদতের গুরুত্ব বুঝতেন এবং নিয়মিত আমল করার চেষ্টা করতেন। তাদের আমল ও রাসুলুল্লাহ (স.)-এর উৎসাহের আলোকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত তুলে ধরা হলো।

১. তাহাজ্জুদ নামাজ

রাতের শেষ ভাগে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এ নামাজের প্রতি বিশেষ যত্নবান ছিলেন।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর যুগে কেউ স্বপ্ন দেখলে তা রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জানাতেন। তিনিও স্বপ্ন দেখার ইচ্ছা করতেন নবীজিকে জানানোর জন্য। একদিন তিনি স্বপ্নে দেখলেন, দুজন ফেরেশতা তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন... পরে তিনি স্বপ্নটি তার বোন হাফসা (রা.)-কে জানান। হাফসা (রা.) স্বপ্নটি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জানালে তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ কতই না উত্তম মানুষ! যদি সে রাতে নামাজ আদায় করত!’ এরপর থেকে আবদুল্লাহ (রা.) রাতের সামান্য সময়ই ঘুমাতেন। (সহিহ বুখারি: ৩৭৩৮, ৩৭৩৯)

আরও পড়ুন: নফল ইবাদতকে গুরুত্বহীন ভাবলে যা হারাবেন

২. চাশত/দোহার নামাজ

সূর্য ওঠার কিছু সময় পর থেকে দুপুরের আগ পর্যন্ত চাশতের নামাজ আদায় করা যায়। এটি গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত।

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘আমার প্রিয় বন্ধু রাসুলুল্লাহ (স.) আমাকে তিনটি বিষয়ে অসিয়ত করেছেন। প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখা, দুই রাকাত চাশত/দোহার নামাজ আদায় করা এবং ঘুমানোর আগে বিতর নামাজ পড়া।’ (সহিহ বুখারি: ১৯৮১, সহিহ মুসলিম: ৭২১)

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর এই অসিয়তগুলো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পালন করার সংকল্প করেছিলেন।

৩. প্রতি মাসে তিন দিন নফল রোজা

প্রতি মাসে তিন দিন নফল রোজা রাখার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের এ আমলের অসিয়ত করেছিলেন।

আবু দারদা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) তাকে প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখার অসিয়ত করেছিলেন। (সহিহ মুসলিম: ৭২২)

আরও পড়ুন: নবীজি (স.) প্রতি মাসে কয়টি রোজা রাখতেন?

৪. আরাফা ও আশুরার রোজা

রমজানের বাইরে বিশেষ ফজিলতপূর্ণ নফল রোজার মধ্যে আরাফা ও আশুরার রোজা উল্লেখযোগ্য। আবু কাতাদা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, তিনি এর মাধ্যমে আগের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন। আর আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আশা করি, এর মাধ্যমে আগের এক বছরের গুনাহ মাফ করবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

৫. নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত

সাহাবায়ে কেরাম কোরআন তেলাওয়াতের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। তাঁরা প্রতিদিন তেলাওয়াতের নির্দিষ্ট পরিমাণ ঠিক করে নিতেন এবং নিয়মিত তা আদায় করতেন। অনেক সাহাবি প্রতি সাত দিনে একবার কোরআন খতম করতেন।

আয়েশা (রা.) বলেন, কখনো কখনো তিনি বিছানায় শুয়েও নিজের নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াতের পরিমাণ আদায় করতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা: ৩০৮০৮)

আবদুর রহমান ইবনে উসমান তাইমী (রহ.) বর্ণনা করেন, এক রাতে তিনি মাকামে ইবরাহিমের সামনে নামাজ পড়ছিলেন। সেখানে হজরত উসমান (রা.) এসে নামাজে দাঁড়ান। তিনি ফজর পর্যন্ত এক রাকাতেই পুরো কোরআন খতম করেন। (ফাযায়েলে কুরআন, আবু উবায়দ: ১/৩৫১, নাতায়েজুল আফকার: ৩/১৬০-১৬১)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-ও প্রতি সাত দিনে কোরআন খতমের প্রতি গুরুত্ব দিতেন। তিনি অন্যদেরও এভাবে কোরআন খতম করার তাগিদ দিতেন। (নাতায়েজুল আফকার: ১/১৪৯)

৬. নিয়মিত জিকির ও তাসবিহ

সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর জিকিরকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তারা অবসর সময়ে, চলাফেরায় এবং দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে আল্লাহকে স্মরণ করতেন। জিকিরের ফজিলত সম্পর্কে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১০০ বার সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি বলবে, তার গুনাহ সমুদ্রের ফেনার সমান হলেও ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪০৫) অন্য হাদিসে সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় কালাম চারটি। সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও আল্লাহু আকবার। এগুলোর যেকোনোটি দিয়ে তুমি শুরু করো, তাতে কোনো ক্ষতি নেই।’ (মুসলিম: ৫৪১৬)

মুমিনের উচিত, প্রতিদিন কিছু সময় জিকিরের জন্য নির্দিষ্ট রাখা। ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদু লিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠের মাধ্যমে জিহ্বাকে আল্লাহর স্মরণে সজীব রাখা। 

নিয়মিত আমলের গুরুত্ব

সাহাবিদের জীবন থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, নফল ইবাদতে নিয়মিত থাকার গুরুত্ব অনেক। একসঙ্গে অনেক আমল শুরু করে পরে ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে অল্প হলেও নিয়মিত আমল করা উত্তম।

আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (স.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আল্লাহর কাছে কোন আমল সর্বাধিক প্রিয়?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘যে আমল সর্বদা করা হয় চাই তা কম হোক।’ (বুখারি: ৬৪৬৫)

তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নফল নামাজ ও রোজার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায়ের পাশাপাশি নিয়মিত নফল আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করুন।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম