ধর্ম ডেস্ক
২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
মানুষের কিছু দুর্বলতা প্রকাশ পায় আচরণে, কিছু লুকিয়ে থাকে মনের গভীরে। বিপদে অধৈর্য হয়ে পড়া, সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি, অন্যের সাফল্যে ঈর্ষা কিংবা নিজের ভুলকেও সঠিক মনে করার প্রবণতা এসবের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। কিন্তু নিজের মধ্যে এসব দুর্বলতা আছে, তা স্বীকার করা সহজ নয়।
পবিত্র কোরআনে মানুষের এমন কিছু স্বভাবের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কোথাও এসেছে তাড়াহুড়া ও অস্থিরতার কথা, কোথাও সম্পদের মোহ, অহংকার, আত্মপ্রবঞ্চনা, তর্কপ্রবণতা ও ঈর্ষার প্রসঙ্গ। এসব আয়াত নিজের আচরণ যাচাই করতে এবং আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন বুঝতে সাহায্য করে।
অনেক সময় মানুষ কোনো কিছুর ফল দ্রুত পেতে চায়। অপেক্ষা করতে হলে ধৈর্য হারায়, আবার পরিণতি না ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়াপ্রবণ করে।’ (সুরা আম্বিয়া: ৩৭)
আয়াতটির তাৎক্ষণিক প্রসঙ্গ শাস্তি ত্বরান্বিত করার দাবি হলেও এটি মানুষের তাড়াহুড়ার প্রবণতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাড়াহুড়ার কারণে মানুষ কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, কখনো তাৎক্ষণিক আবেগকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি ও পরিণতি ভেবে দেখা জরুরি।
কষ্টের সময় মানুষ ভেঙে পড়ে। আবার সম্পদ, স্বাচ্ছন্দ্য বা সাফল্য পেলে অন্যের প্রয়োজনের কথা ভুলে যায়। কোরআনে এই দুই প্রবণতাই তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অস্থিরচিত্ত করে। যখন বিপদ তাকে স্পর্শ করে, তখন সে হা-হুতাশ করে। আর যখন কল্যাণ তাকে স্পর্শ করে, তখন সে কৃপণতা করে।’ (সুরা মাআরিজ: ১৯-২১)
আরও পড়ুন: হৃদয় হোক পরিশুদ্ধ: কোরআনের চূড়ান্ত বার্তা
পরের আয়াতগুলোতে নিয়মিত নামাজ আদায়কারী এবং সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের অধিকার স্বীকারকারীদের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের এই দুর্বল প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের পথও কোরআনে দেখানো হয়েছে।
সম্পদ মানুষের প্রয়োজন মেটায়, নিরাপত্তা দেয় এবং অন্যের উপকার করার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষকে অকৃতজ্ঞ ও স্বার্থপর করে তুলতে পারে।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মানুষ তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ। ... আর নিশ্চয়ই সে সম্পদের ভালোবাসায় প্রবল।’ (সুরা আদিয়াত: ৬, ৮)
সম্পদ অর্জনের চেষ্টা দোষের নয়। সমস্যা হয় তখন, যখন সম্পদের প্রতি ভালোবাসা মানুষকে কৃতজ্ঞতা, অন্যের অধিকার আদায় ও সৎকাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাই উপার্জনের পাশাপাশি সম্পদ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও ভেবে দেখা দরকার।
সম্পদ, ক্ষমতা বা মর্যাদার কারণে মানুষ যখন নিজেকে কারও মুখাপেক্ষী নয় বলে মনে করে, তখন অহংকার জন্ম নিতে পারে। সে নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলে অন্যের প্রতি অবজ্ঞা দেখাতে শুরু করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কখনোই নয়, মানুষ তো সীমালঙ্ঘন করে, যখন সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে।’ (সুরা আলাক: ৬-৭)
এই আয়াত মনে করিয়ে দেয়, পার্থিব সাফল্য মানুষকে অহংকারী হওয়ার অধিকার দেয় না। নিজের অর্জনের পেছনে পাওয়া সুযোগ, অন্যের সহযোগিতা ও আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ রাখলে আত্মগর্ব থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়।
আরও পড়ুন: ১৪ পাপের শাস্তি দুনিয়ায় দেওয়া হয়
মানুষের একটি সূক্ষ্ম দুর্বলতা হলো, অনেক সময় সে নিজের ভুলকে ভুল হিসেবে চিনতেই পারে না। নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি সাজাতে সাজাতে এমন অবস্থা হয় যে মন্দ কাজকেও ভালো মনে হতে থাকে।
কোরআনে এসেছে, ‘যার কাছে তার মন্দ কাজকে শোভন করে দেখানো হয়েছে, ফলে সে সেটিকে ভালো মনে করে...।’ (সুরা ফাতির: ৮)
এ থেকে বোঝা যায়, নিজের কাজ সম্পর্কে ভুল ধারণা মানুষকে সংশোধনের পথ থেকে দূরে রাখতে পারে। তাই শুধু নিজের নিয়ত ভালো মনে করাই যথেষ্ট নয়। কাজটি ন্যায়সংগত কি না, কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না, তাও বিবেচনা করা দরকার।
মতভেদ হলে নিজের বক্তব্য প্রমাণ করার চেষ্টা স্বাভাবিক। কিন্তু কখনো সত্য বোঝার চেয়ে নিজের অবস্থান ঠিক প্রমাণ করাই মুখ্য হয়ে ওঠে। তখন আলোচনা তর্কে গড়ায় এবং ভুল স্বীকারের মানসিকতা কমে যায়।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষ সবচেয়ে বেশি তর্কপ্রিয়।’ (সুরা কাহফ: ৫৪)
তবে সব আলোচনা নিন্দনীয় নয়। সত্য অনুসন্ধানের জন্য যুক্তিপূর্ণ আলোচনা প্রয়োজন। সমস্যা তখনই, যখন তর্কের উদ্দেশ্য সত্য জানা নয়, নিজের জেদ বজায় রাখা।
অন্যের সাফল্য বা প্রাপ্তি দেখে মনে ঈর্ষা জাগতে পারে। এই অনুভূতি কখনো এমন পর্যায়ে যায় যে অন্যের ভালো থাকাটাই অসহ্য মনে হয়।
সুরা নিসায় অন্যের প্রাপ্তিতে হিংসার প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ‘নাকি আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন, সে কারণে তারা তাদের প্রতি হিংসা করে?’ (সুরা নিসা: ৫৪)
অন্যদিকে, সুরা ফালাকে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে শেখানো হয়েছে। (সুরা ফালাক: ৫)
অন্যের প্রাপ্তি নিয়ে বিদ্বেষ না রেখে নিজের জন্য আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া এবং অন্যের ভালোকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখা জরুরি। এতে মনের সংকীর্ণতা কমে, সম্পর্কও সুন্দর থাকে।
কোরআনে মানুষের দুর্বলতার কথা তুলে ধরার উদ্দেশ্য হতাশ করা নয়, আত্মসচেতন করা। নিজের মধ্যে অধৈর্য, কৃপণতা, অহংকার, ঈর্ষা বা আত্মপ্রবঞ্চনার প্রবণতা আছে কি না, তা ভেবে দেখা আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সে-ই সফল হয়েছে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে-ই ব্যর্থ হয়েছে, যে নিজেকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা শামস: ৯-১০) তিনি আরও বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ: ২৮)
তাই অন্যের ভুল খোঁজার পাশাপাশি নিজের চিন্তা, নিয়ত ও আচরণও যাচাই করা দরকার। নিজের ভুল বুঝতে পারলে তা স্বীকার করা, তাওবা করা, আল্লাহর সাহায্য চাওয়া এবং আচরণে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
তথ্যসূত্র: সুরা আম্বিয়া: ৩৭; মাআরিজ: ১৯-২৫; আদিয়াত: ৬-৮; আলাক: ৬-৭; ফাতির: ৮; কাহফ: ৫৪; নিসা: ৫৪; ফালাক: ৫; শামস: ৯-১০; সুরা রাদ: ২৮