Dhaka Mail Logo

ইসলাম

তাওবা করেও গুনাহ ছাড়তে পারছেন না? যা জানা জরুরি

ধর্ম ডেস্ক

২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১২ পিএম

অনেকেই আন্তরিকভাবে তাওবা করেন, গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। কিন্তু কিছুদিন পর আবার সেই গুনাহে জড়িয়ে পড়েন। তখন মনে অপরাধবোধ তৈরি হয়। কেউ কেউ ভাবেন, বারবার একই গুনাহ করলে কি আল্লাহ আর ক্ষমা করবেন?

ইসলাম এ বিষয়ে আশার কথা জানিয়েছে। গুনাহ হয়ে গেলে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। তবে একই গুনাহের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করা, গুনাহের পথগুলো এড়িয়ে চলা এবং আন্তরিকভাবে সংশোধনের চেষ্টা করা জরুরি।

বারবার গুনাহ করলেও কি তাওবা কবুল হয়?

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা যুমার: ৫৩)

বর্ণিত হয়েছে, এক বান্দা গুনাহ করার পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইল। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেন। পরে সে আবার গুনাহ করে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তাকে আবারও ক্ষমা করেন। এভাবে একাধিকবার গুনাহ ও ক্ষমা প্রার্থনার ঘটনা হাদিসটিতে এসেছে। (সহিহ বুখারি: ৭৫০৭)

এই হাদিসের শিক্ষা হলো, গুনাহ হয়ে গেলে আল্লাহর কাছে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে। তবে এর অর্থ গুনাহকে হালকা করে দেখা নয়। তাওবার সময় গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার আন্তরিক ইচ্ছা থাকতে হবে। পরে দুর্বলতাবশত আবার গুনাহ হয়ে গেলে নতুন করে তাওবা করতে হবে।

আরও পড়ুন: তাওবা ও ইস্তেগফারের পার্থক্য কী? আস্তাগফিরুল্লাহ বললে তাওবা হবে?

তাওবা কবুলের শর্ত কী?

আন্তরিক তাওবার ক্ষেত্রে চারটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

১. গুনাহ ছেড়ে দেওয়া: যে গুনাহের জন্য তাওবা করছেন, তা থেকে বিরত থাকতে হবে।

২. অনুতপ্ত হওয়া: আল্লাহর অবাধ্যতা করেছেন, এ উপলব্ধি থেকে মনে অনুশোচনা থাকতে হবে।

৩. আবার না করার দৃঢ় সংকল্প করা: ভবিষ্যতে গুনাহে ফিরে না যাওয়ার আন্তরিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে পরে দুর্বলতাবশত ভুল হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আবার তাওবা করতে হবে।

৪. গুনাহের সঙ্গে অন্য মানুষের অধিকার জড়িত থাকলে: সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাসম্ভব ক্ষতিপূরণ করাও জরুরি। 

একই গুনাহ বারবার হওয়ার কারণ কী?

একই গুনাহের পুনরাবৃত্তির পেছনে অসৎ সঙ্গ, প্রবৃত্তির টান, একাকিত্ব কিংবা কিছু অভ্যাস ও পরিস্থিতি কাজ করতে পারে। কেউ গুনাহ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেও যদি গুনাহের সুযোগগুলো আগের মতোই খোলা রাখেন, তাহলে আবার সেই ভুলে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

যেমন, অনলাইনে অশোভন কনটেন্ট দেখা ছাড়তে চাইলেও সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার অব্যাহত রাখা, অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইলেও আগের মতো মেলামেশা করা কিংবা একাকিত্বে গুনাহের প্রবণতা বাড়লেও অবসর সময়ের কোনো পরিকল্পনা না রাখা।

তাই শুধু গুনাহের পর ক্ষমা চাওয়াই নয়, যে পরিস্থিতি গুনাহের দিকে নিয়ে যায়, তা চিহ্নিত করে পরিবর্তন আনাও প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: তাওবা কবুল না হওয়ার ৩ লক্ষণ

গুনাহ থেকে বাঁচতে যা করবেন

অসৎ সঙ্গ এড়িয়ে চলুন

বন্ধু ও আশপাশের মানুষের আচরণ আমাদের ওপর প্রভাব ফেলে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।’ (জামে তিরমিজি: ২৩৭৮)

এমন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলুন, যারা ভালো কাজে উৎসাহিত করেন এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করেন। সৎ মানুষের সঙ্গ নিন, উপকারী বই পড়ুন এবং দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করুন।

মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনুন

প্রযুক্তির অপব্যবহার অনেককে গুনাহের দিকে নিয়ে যেতে পারে। যে অ্যাপ, ওয়েবসাইট, ভিডিও বা অনলাইন যোগাযোগ আপনাকে গুনাহের প্ররোচনা দেয়, সেগুলো এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্লক করুন, স্ক্রিন টাইম সীমিত করুন এবং রাতে মোবাইল বিছানা থেকে দূরে রাখুন।

একাকিত্ব ও অবসর সময়ের সঠিক ব্যবহার করুন

একাকী থাকলেই সবাই গুনাহে জড়িয়ে পড়েন না। তবে কারও ক্ষেত্রে একাকিত্ব গুনাহের চিন্তা বাড়াতে পারে। নিজের দুর্বলতা বুঝে সময়ের পরিকল্পনা করুন। পড়াশোনা, কাজ, ব্যায়াম, পরিবারকে সময় দেওয়া, কোরআন তেলাওয়াত ও অন্যান্য উপকারী কাজে ব্যস্ত থাকুন।

নামাজ, কোরআন ও ইস্তেগফারে অভ্যস্ত হোন

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করুন। নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করুন এবং ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলার অভ্যাস গড়ে তুলুন। আল্লাহর কাছে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে সাহায্য চান। তবে ইস্তেগফার যেন শুধু মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ না থাকে। গুনাহ ছাড়ার চেষ্টা ও জীবন সংশোধনের উদ্যোগও থাকতে হবে।

গুনাহের প্ররোচনা এলে নিজেকে মনে করিয়ে দিন, আল্লাহ সবকিছু জানেন ও দেখেন। প্রয়োজনে স্থান পরিবর্তন করুন, মোবাইল সরিয়ে রাখুন, অজু করুন, নামাজ পড়ুন কিংবা বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলুন।

আরও পড়ুন: নিয়মিত তওবা-ইস্তেগফার যেভাবে বদলে দেয় জীবনের গতিপথ

যৌন তাড়না নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন

গুনাহের পেছনে যৌন তাড়না কাজ করলে এবং বিয়ের সামর্থ্য থাকলে পরিবার বা অভিভাবকের সঙ্গে বিয়ের বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যেসব যুবকের বিয়ের সামর্থ্য আছে, তারা যেন বিয়ে করে। আর যাদের সামর্থ্য নেই, তারা যেন রোজা রাখে। কারণ রোজা দৃষ্টি সংযত রাখতে ও প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। (সহিহ বুখারি: ৫০৬৬)

বিয়ে এখনই সম্ভব না হলে সামর্থ্য অনুযায়ী নফল রোজা রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। পাশাপাশি দৃষ্টি সংযত রাখা, অনুচিত যোগাযোগ এড়িয়ে চলা এবং গুনাহের পরিবেশ থেকে দূরে থাকাও জরুরি।

আসক্তি থাকলে সহায়তা নিন

কিছু অভ্যাস, যেমন পর্নোগ্রাফি, মাদক বা জুয়ার আসক্তি, দীর্ঘদিনের নির্ভরতার সঙ্গে জড়িত হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশীলনের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। বিশ্বস্ত আলেম বা বিচক্ষণ ব্যক্তির পরামর্শও উপকারী হতে পারে।

গুনাহের কারণে কি দুনিয়ার জীবনেও কষ্ট বাড়ে?

গুনাহের কারণে মানুষের মনে অপরাধবোধ, অনুশোচনা ও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। কখনো এর প্রভাব সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবনেও পড়ে। তবে জীবনের প্রতিটি কষ্টকে কোনো নির্দিষ্ট গুনাহের শাস্তি বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। মুমিনের জীবনে পরীক্ষা ও বিপদও আসে।

গুনাহ থেকে ফিরে আসার পাশাপাশি নিজের সমস্যাগুলো বুঝতে চেষ্টা করুন। প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ নিন।

তাওবা করার পর আবার গুনাহ হলে কী করবেন?

আবার গুনাহ হয়ে গেলে নিজেকে ক্ষমার অযোগ্য ভাববেন না। একই সঙ্গে গুনাহকে তুচ্ছও মনে করবেন না। দ্রুত তাওবা করুন এবং ভেবে দেখুন, কোন পরিস্থিতিতে ভুলটি হয়েছে। এরপর সেই পরিস্থিতি এড়াতে বাস্তব পদক্ষেপ নিন।

তাওবার সময় আন্তরিকভাবে গুনাহ ছাড়ার সংকল্প থাকা জরুরি। আগে থেকেই আবার গুনাহ করার পরিকল্পনা রেখে তাওবা করা আন্তরিক তাওবার পরিপন্থী। তবে সত্যিকারভাবে গুনাহ ছাড়তে চাওয়ার পরও কেউ দুর্বলতাবশত ভুল করলে তার উচিত আবার তাওবা করা এবং সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

নিজেকে বদলাতে সময় লাগতে পারে। তাই একবার ব্যর্থ হলেই চেষ্টা ছেড়ে দেবেন না। নিজের দুর্বলতা বুঝুন, গুনাহের পথ বন্ধ করুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।

মনে রাখবেন, গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা এবং ভুল হয়ে গেলে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে আন্তরিক তাওবা ও নিয়মিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখুন।

তথ্যসূত্র: সুরা যুমার: ৫৩; সুরা বাকারা: ২২২; সহিহ বুখারি: ৭৫০৭; জামে তিরমিজি: ২৩৭৮; সহিহ বুখারি: ৫০৬৬