ধর্ম ডেস্ক
২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম
অসুস্থতা সারানো, জাদুটোনা দূর করা, হারানো জিনিস খুঁজে পাওয়া কিংবা ভবিষ্যৎ জানার জন্য কেউ কেউ জ্বিনের সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করেন। অনেকে ‘মুসলিম জ্বিন’ বা ‘মুয়াক্কিল’-এর সাহায্যে সমস্যা সমাধানের দাবিও করেন। ইসলামে এসব কাজের বিধান কী?
জ্বিনের কাছে ইবাদতস্বরূপ প্রার্থনা করা কিংবা আল্লাহর একচ্ছত্র ক্ষমতা তাদের আছে বলে বিশ্বাস করা শিরক। তবে জ্বিনের সাহায্য নেওয়ার সব ঘটনাকে একই হুকুমে ফেলা যায় না। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদও রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক কতিপয় জ্বিনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা তাদের ঔদ্ধত্য বাড়িয়ে দিয়েছিল।’ (সুরা জ্বিন: ৬)
তাফসিরে উল্লেখ করা হয়েছে, জাহেলি যুগে আরবদের কেউ নির্জন স্থানে গেলে সেখানকার জ্বিনের অনিষ্ট থেকে বাঁচতে তাদের নেতার আশ্রয় চাইত। আয়াতটি এ ধরনের নির্ভরতার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে।
এ বিষয়ে ফিকহবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) বৈধ কাজে জ্বিনের সাহায্য নেওয়াকে তিনি শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন করেছেন। (মাজমুউল ফতোয়া: ১১/৩০৭) অন্যদিকে, একাধিক আলেম জ্বিনের সাহায্য নেওয়া থেকে বিরত থাকার মত দিয়েছেন। আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ (৪/১৮)-তেও এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞার মত উল্লেখ রয়েছে।
আরও পড়ুন: ঘরে যেসব জিনিস রাখলে জ্বিনের প্রভাব বাড়তে পারে
তবে জ্বিনের কাছে ইবাদতস্বরূপ প্রার্থনা করা, তাদের গায়েবের জ্ঞানসম্পন্ন মনে করা কিংবা আল্লাহর একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী বিশ্বাস করা শিরক। আবার জ্বিনের মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করা বা নিষিদ্ধ কাজে তাদের সাহায্য চাওয়াও গুরুতর অপরাধ। তাই সব ধরনের সাহায্য চাওয়াকে এক হুকুমে ফেলা ঠিক হবে না। নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর হুকুম দেওয়ার ক্ষেত্রে তার বিশ্বাস, কাজ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।
হজরত সুলাইমান (আ.)-এর অধীনে জ্বিনেরা কাজ করত। তবে এটি ছিল আল্লাহর দেওয়া বিশেষ ক্ষমতা। তিনি এমন রাজত্ব চেয়েছিলেন, যা তাঁর পরে আর কাউকে দেওয়া হবে না। (সুরা সাদ: ৩৫) তাই তাঁর ঘটনায় জ্বিনের সাহায্য নেওয়ার বিষয়টি থেকে সাধারণ মানুষের জন্য জ্বিনের সঙ্গে যোগাযোগ বা তাদের সাহায্য নেওয়ার বৈধতা প্রমাণ করা যায় না।
আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, আল্লাহ ছাড়া আসমান ও জমিনে কেউ গায়েব জানে না।’ (সুরা নামল: ৬৫)
সুরা সাবায় হজরত সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যুর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পরও জ্বিনেরা তা বুঝতে পারেনি। তাঁর লাঠি মাটির পোকায় ক্ষয়ে গেলে তিনি পড়ে যান, তখন জ্বিনেরা তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারে। (সুরা সাবা: ১৪) তাই জ্বিন ভবিষ্যৎ জানে বা তাদের মাধ্যমে গায়েবের নির্ভরযোগ্য খবর পাওয়া যায়-এমন বিশ্বাসের ভিত্তি নেই।
আরও পড়ুন: টয়লেটে সুগন্ধি রাখলে কি জ্বিনের কবল থেকে বাঁচা যায়?
কেউ কেউ দাবি করেন, তাদের সঙ্গে থাকা জ্বিন মুসলিম এবং মানুষের উপকার করে। কিন্তু এ দাবি যাচাই করা সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন। জ্বিনের সাহায্যে রোগ সারানো, জাদুর উৎস শনাক্ত করা কিংবা শত্রুর ক্ষতি করার নামে অর্থ নেওয়া প্রতারণার সুযোগ তৈরি করে। তাই এসব দাবির ওপর নির্ভর করা এবং এর ভিত্তিতে অর্থ দেওয়া থেকে সতর্ক থাকা উচিত।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে তাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে, তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হয় না।’ (সহিহ মুসলিম: ২২৩০)
এর অর্থ এই নয় যে এ সময় নামাজ ছেড়ে দেওয়া যাবে। নামাজ আদায় করা ফরজই থাকবে। হাদিসটি গণকের কাছে যাওয়ার গুরুতর পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে।
খিঁচুনি, বিষণ্নতা বা অন্যকোনো অসুস্থতাকে পরীক্ষা ছাড়াই জ্বিনের আছর বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এসব সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সুরক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা, আয়াতুল কুরসি, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়া এবং কোরআন-সুন্নাহসম্মত রুকইয়াহ করা যায়।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যখন তুমি চাইবে, তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে, তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করবে।’ (জামে তিরমিজি: ২৫১৬)
তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন; মাজমুউল ফতোয়া: ১১/৩০৭; আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ: ৪/১৮; সহিহ মুসলিম: ২২৩০; জামে তিরমিজি: ২৫১৬