ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, জ্বিন আল্লাহ তাআলার একটি স্বতন্ত্র সৃষ্টি, যাদের সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়াবিহীন আগুন থেকে (মারিজ)। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর জ্বিনকে আমি সৃষ্টি করেছি আগুনের শিখা থেকে।’ (সুরা আর-রহমান: ১৫) জ্বিন সাধারণত মানুষের দৃষ্টির অগোচরে থাকে এবং তাদের মধ্যেও মুমিন, কাফির, সৎ ও অসৎ সব শ্রেণি রয়েছে। (তাফসির, সুরা জ্বিন: ১১)
ঘরে কোন বিষয় থাকলে জ্বিন–শয়তানের প্রভাব বাড়তে পারে
ইসলাম কোথাও বলেনি যে ‘এই এই জিনিস থাকলেই জ্বিন আসবেই’। তবে কোরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কিছু বিষয় উল্লেখ আছে, যেগুলো ঘরে রহমতের ফেরেশতাদের আগমন ব্যাহত করে এবং এর ফলে শয়তানি প্রভাব বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
জ্বিন–শয়তানের প্রভাব বৃদ্ধিতে সহায়ক বিষয়সমূহ
১. প্রাণীর ছবি, ভাস্কর্য ও পুতুল
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে ঘরে প্রাণির ছবি ও কুকুর থাকে, সেখানে ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না।’ (সহিহ বুখারি: ৩২২৫; সহিহ মুসলিম: ২১০৬)
এখানে ছবি বলতে জীবন্ত প্রাণীর ছবি ও ভাস্কর্য বোঝানো হয়েছে
বিজ্ঞাপন
ফেরেশতাদের অনুপস্থিতিতে শয়তান ও দুষ্ট জ্বিনের প্রভাব বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে
২. কুকুর (ঘরের ভেতরে রাখা)
হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে, ‘যে ঘরে কুকুর থাকে, সেখানে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।’ (সহিহ মুসলিম: ২১০৫)
শিকার, পাহারা বা কৃষিকাজের প্রয়োজনে কুকুর রাখা অনুমোদিত হলেও, ঘরের ভেতরে পোষা হিসেবে রাখা নিরুৎসাহিত। কারণ এতে ঘরের রহমতের পরিবেশ ক্ষুণ্ন হয়।
আরও পড়ুন: প্রত্যেক মানুষের সঙ্গী কারিন জ্বিন: ক্ষতিকর প্রভাব ও আত্মরক্ষার আমল
৩. নাপাকি, অপরিচ্ছন্নতা ও জমানো প্রস্রাব
নবী কারিম (স.) টয়লেটে প্রবেশের সময় দোয়া পড়তেন, ‘হে আল্লাহ আমি মন্দ কাজ ও শয়তান থেকে আপনার আশ্রয় চাচ্ছি।’ (সহিহ বুখারি: ১৪২)
আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নাপাক ও অপরিষ্কার স্থান জ্বিনদের বিচরণের প্রধান ক্ষেত্র। বিশেষ করে, টয়লেটে পেশাব ফ্লাশ না করে জমিয়ে রাখলে তা শয়তানের জন্য একটি আকর্ষণীয় আবাসস্থলে পরিণত হয়। ঘরে দীর্ঘদিন নাপাকি ও অপরিচ্ছন্নতা থাকলে শয়তানি প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
৪. ঘরে আল্লাহর জিকির ও কোরআনের অনুপস্থিতি
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে তার প্রতিপালকের জিকির করে, আর যে জিকির করে না, তাদের উপমা হলো জীবিত ও মৃত ব্যক্তি।’ (বুখারি: ৬৪০৭)
তিনি আরও বলেন, ‘যে ঘরে সুরা বাকারা পাঠ করা হয়, সেখান থেকে শয়তান পালিয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম: ৭৮০)
জিকির ও কোরআন তেলাওয়াতবিহীন ঘর শয়তানের প্রভাব বিস্তারের জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: সন্ধ্যায় শিশুদের কেন ঘরে আটকে রাখতে বলেছেন নবীজি
৫. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ব্যক্তি
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৪)
আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হলে আল্লাহর রহমতের পরিবেশ দুর্বল হয়, ফলে শয়তানি প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।
৬. বাদ্যযন্ত্র, নূপুর বা ঘন্টার শব্দ
নবী কারিম (স.) বলেন, ‘ঘণ্টা (নূপুর) শয়তানের বাদ্যযন্ত্র।’ (আবু দাউদ: ২৫৫৬)
অপ্রয়োজনীয় ঘন্টার শব্দ ও বাদ্যযন্ত্র শয়তানি পরিবেশকে উৎসাহিত করে বলে হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. জাদু, তাবিজ ও শিরকি বস্তু
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা শয়তানদের অনুসরণ করত এবং জাদু শিক্ষা করত।’ (সুরা বাকারা: ১০২)
জাদু ও শিরকি কর্মকাণ্ডে জ্বিন-শয়তানের সাহায্য নেওয়া হয়। এই কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন বস্তু, যেমন নিষিদ্ধ তাবিজ, মূর্তি, পশুর হাড়গোড় বা চুল ইত্যাদির সঙ্গে জ্বিনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এসব বস্তু ঘরে রাখা শয়তানি প্রভাব ডেকে আনার শামিল এবং এটি অন্যতম বড় কারণ।
আরও পড়ুন: কেউ জাদু করেছে কি না বুঝবেন কীভাবে
৮. হিংস্র প্রাণীর চামড়া
রাসুলুল্লাহ (স.) হিংস্র প্রাণীর চামড়া ব্যবহার করতে (যেমন: পরিধান করা বা তার উপর বসা) নিষেধ করেছেন। (সুনান আবু দাউদ: ৪১৩০)
আলেমদের মতে, এ ধরনের বস্তু ঘরে রাখা অহংকার ও দাম্ভিকতার প্রতীক, যা শয়তানের বৈশিষ্ট্য। যে ঘরে আল্লাহর অপছন্দনীয় ও অহংকার প্রকাশক বস্তু থাকে, সেখানে রহমতের পরিবেশ ক্ষুণ্ন হয় এবং শয়তানি প্রভাবের পথ খুলে যায়। ঐতিহাসিকভাবে কালাজাদুর চর্চাতেও এই ধরনের বস্তু ব্যবহৃত হয়।
যেগুলো নিয়ে কুসংস্কার রয়েছে, কিন্তু দলিল নেই
- ঝাড়ু উল্টো রাখা
- খালি কলস
- আয়না
- পেঁয়াজ–রসুন
এগুলো লোকজ ধারণা, ইসলামের সঙ্গে এর কোনো দালিলিক সম্পর্ক নেই।
জ্বিন–শয়তান থেকে সুরক্ষার আমল
- নিয়মিত সুরা বাকারা তেলাওয়াত
- আয়াতুল কুরসি (নামাজের পর ও ঘুমের আগে)
- সকাল–সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া
- ঘরে প্রবেশ ও খাবারের সময় বিসমিল্লাহ বলা
- বাথরুমে, নলে বা বেসিনে গরম পানি ফেলার আগে বিসমিল্লাহ বলা
- ঘুমানোর আগে বিছানা ঝাড়া
- ঘর ও শরীর পরিষ্কার রাখা
ইসলাম ভয়ের ধর্ম নয়; বরং এটি নিরাপত্তা, ভারসাম্য ও আত্মশুদ্ধির ধর্ম। জ্বিনের অস্তিত্ব সত্য, তবে যেখানে আল্লাহর স্মরণ ও সুন্নাহর অনুসরণ থাকে, সেখানে শয়তানের প্রভাব স্থায়ী হতে পারে না। অতএব কুসংস্কারে নয়, বরং কোরআন, সুন্নাহ ও আল্লাহর উপর ভরসাতেই রয়েছে প্রকৃত নিরাপত্তা।

