ধর্ম ডেস্ক
২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
বাবা-মা সন্তানের জীবনে অত্যন্ত সম্মানিত। তাঁদের প্রতি সদাচরণ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ। তবে বাবা-মাও মানুষ, তাঁদেরও ভুল হতে পারে। কখনো তাঁরা নামাজে অবহেলা করেন, কখনো অন্যের প্রতি অন্যায় করেন, আবার কখনো পারিবারিক বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেন। এমন পরিস্থিতিতে সন্তান কি চুপ থাকবে, নাকি ভুল ধরিয়ে দেবে? ধরিয়ে দিলে কীভাবে বলবে?
ইসলাম বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান বজায় রাখার পাশাপাশি অন্যায় থেকে সতর্ক করার শিক্ষা দেয়। তাই তাঁদের ভুল দেখলে অপমান না করে, প্রজ্ঞা ও সদাচরণের সঙ্গে সংশোধনের চেষ্টা করা সন্তানের দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে। তাঁদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের উফ বলো না এবং তাঁদের ধমক দিয়ো না। তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা ইসরা: ২৩)
বাবা-মায়ের কোনো ভুল চোখে পড়লেও গালমন্দ করা, অপমান করা কিংবা রাগের মাথায় কটু কথা বলা যাবে না। ভুল বুঝিয়ে বলার সময়ও ভাষা ও আচরণ হতে হবে শালীন।
বাবাকে ভুল বোঝানোর ক্ষেত্রে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর আচরণ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তাঁর বাবা মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিলেন। ইবরাহিম (আ.) তাঁকে সেই ভুল থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সম্বোধনে সম্মান বজায় রেখেছেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘হে আমার পিতা, আপনি কেন এমন কিছুর ইবাদত করেন, যা শোনে না, দেখে না এবং আপনার কোনো উপকারে আসে না? হে আমার পিতা, আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে, যা আপনার কাছে আসেনি। অতএব আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সঠিক পথ দেখাব।’ (সুরা মরিয়ম: ৪২-৪৩)
আরও পড়ুন: এই উম্মতের প্রতি ইবরাহিম (আ.)-এর সালাম ও বিশেষ তোহফা
বাবা তাঁকে কঠোর ভাষায় হুমকি দিলেও ইবরাহিম (আ.) বলেছিলেন, ‘আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি আমার রবের কাছে আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব।’ (সুরা মরিয়ম: ৪৭)
এই ঘটনা শেখায়, সত্য কথা বলার সময়ও সম্বোধন ও ভাষায় সংযম রাখা জরুরি।
বাবা-মাকে কিছু বলার আগে নিশ্চিত হতে হবে, বিষয়টি সত্যিই অন্যায় কি না। কোনো সিদ্ধান্ত নিজের অপছন্দের হলেই সেটি অন্যায় হয়ে যায় না। ধর্মীয় বিষয়ে কোরআন-সুন্নাহর দলিল যাচাই করা জরুরি। আলেমদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য মতভেদ থাকলে নিজের পছন্দের মতটিকে একমাত্র সঠিক বলে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। শোনা কথা বা কুধারণার ভিত্তিতেও কাউকে অভিযুক্ত করা যাবে না। (দ্র: সুরা হুজুরাত: ১২)
সম্ভব হলে অন্যদের সামনে ভুল ধরিয়ে না দিয়ে একান্তে, শান্ত সময়ে কথা বলা ভালো। ‘আপনি সব সময় ভুল করেন’ এভাবে না বলে নির্দিষ্ট বিষয়টি বুঝিয়ে বলা যেতে পারে। যেমন, ‘আমি বিষয়টি এভাবে জেনেছি, আপনি কি একটু যাচাই করে দেখবেন?’ ধর্মীয় বিষয়ে প্রয়োজনে নির্ভরযোগ্য আলেমের বক্তব্য বা প্রামাণ্য বইয়ের সাহায্য নেওয়া যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।’ (সুরা নাহল: ১২৫) আল্লাহ তাআলা মুসা ও হারুন (আ.)-কেও ফেরাউনের কাছে কোমল ভাষায় কথা বলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। (সুরা তাহা: ৪৩-৪৪) বাবা-মাকে নসিহত করার সময় এই শিক্ষা মনে রাখা দরকার।
নিজের আচরণেও ভালো দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে। সন্তান নিজেই যদি রূঢ় আচরণ করে, দায়িত্বে অবহেলা করে বা অন্যের অধিকার নষ্ট করে, তাহলে তার উপদেশের মূল্য কমে যেতে পারে।
বাবা-মা গুনাহের কাজে নির্দেশ দিলে তা পালন করা যাবে না। তবে তাঁদের নির্দেশ অমান্য করার সময়ও সদাচরণ বজায় রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যদি তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করতে চাপ দেয়, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করো।’ (সুরা লুকমান: ১৫)
আরও পড়ুন: লোকমান হাকিম কি নবী ছিলেন? ছেলের প্রতি তাঁর উপদেশ কী?
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘পাপের কাজে কোনো আনুগত্য নেই। আনুগত্য সৎকাজেই।’ (সহিহ বুখারি: ৭২৫৭)
অতএব, বাবা-মা কাউকে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করতে কিংবা কারও প্রতি জুলুম করতে বললে সেই নির্দেশ মানা যাবে না। তবে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা বা সম্পর্ক ছিন্ন করাও সমাধান নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের ও নিজেদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা তাহরিম: ৬) এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, নিজের দ্বীন মেনে চলার পাশাপাশি সাধ্যমতো পরিবারকে ভালো কাজে উৎসাহিত করাও দায়িত্বের অংশ।
তবে কাউকে সৎপথে আনার চেষ্টা করা আর হেদায়াত দেওয়া এক বিষয় নয়। হেদায়াত দেয়ার মালিক একজন। সে বিষয়টি উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (স.)-কে বলেছেন, ‘আপনি যাকে ভালোবাসেন, তাকে হেদায়াত দিতে পারবেন না; আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন।’ (সুরা কাসাস: ৫৬) তাই সন্তান ভালো পরামর্শ দেবে, নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করবে এবং বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করবে। তাঁরা ভালো কথা গ্রহণ না করলে হতাশ হয়ে যাওয়া উচিত নয়।
রাসুলুল্লাহ (স.) অন্যায় দেখলে সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ করতে বলেছেন; সক্ষম হলে হাত দিয়ে প্রতিরোধের কথা এসেছে হাদিসে। (সহিহ মুসলিম: ৪৯)
তবে এই হাদিসের অর্থ বাবা-মায়ের ওপর জোর খাটানো বা তাঁদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো নয়। অন্যায় প্রতিরোধের পদ্ধতি নির্ধারণে জ্ঞান, সামর্থ্য এবং সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করতে হয়। কোনো পদক্ষেপে আরও বড় অন্যায় বা ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে পদ্ধতি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। ইমাম নববি (রহ.) তাঁর শরহ মুসলিমে অন্যায় প্রতিরোধবিষয়ক হাদিসের ব্যাখ্যায় এ ধরনের বিবেচনার গুরুত্ব আলোচনা করেছেন।
বারবার বোঝানোর পরও বাবা-মা ভুল থেকে ফিরে না এলে একই কথা যখন তখন বলে বিরক্তি তৈরি না করে কিছুদিন বিরতি দেওয়া যেতে পারে। পরে সুযোগ বুঝে শান্ত পরিবেশে আবার নম্রভাবে কথা বলুন। পরিবারের এমন কোনো বিচক্ষণ আত্মীয় বা বিশ্বস্ত আলেমের সাহায্য নিন, যাঁর কথা তাঁরা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন। তাঁদের হেদায়াতের জন্য দোয়া করুন এবং সেবা ও সদাচরণ বজায় রাখুন।
বাবা-মা রাগ করে গালমন্দ করলে চুপ থাকা বা সেখান থেকে সরে যাওয়া ভালো। নিজের উত্তেজনার কারণে কটু কথা বলে ফেললে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত।
বাবা-মায়ের সঙ্গে স্ত্রীর বিরোধ বা দুর্ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার বজায় রাখতে হবে। স্ত্রীর ন্যায্য অধিকার রক্ষা করতে হবে, তবে বাবা-মাকে অপমান না করে শান্তভাবে সমাধান খুঁজতে হবে। প্রয়োজনে আগের মতো একই পরামর্শ বারবার না দিয়ে নিরপেক্ষ ও বিচক্ষণ কারও সহায়তায় বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করা যায়।
তবে গুরুতর নির্যাতন, নিরাপত্তার ঝুঁকি বা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার ঘটনা ঘটলে শুধু পারিবারিক সম্মানের কথা ভেবে চুপ থাকা ঠিক নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী বিশ্বস্ত ব্যক্তি, যোগ্য আলেম কিংবা আইনসম্মত সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা আনআম: ১৬৪; সুরা ফাতির: ১৮) প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের আমলের জন্য জবাবদিহি করবে। তবে বাবা-মায়ের আচরণের কারণে সন্তানের জীবনে পারিবারিক ও মানসিক প্রভাব পড়তে পারে। তাই নিজের আমল ঠিক রাখার পাশাপাশি সম্ভব হলে পরিবারে ভালো পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা উচিত।
তথ্যসূত্র: সুরা ইসরা: ২৩; মরিয়ম: ৪২-৪৭; হুজুরাত: ১২; তাহা: ৪৩-৪৪; নাহল: ১২৫; লুকমান: ১৫; তাহরিম: ৬; কাসাস: ৫৬; আনআম: ১৬৪; ফাতির: ১৮; সহিহ বুখারি: ৭২৫৭; সহিহ মুসলিম: ৪৯; শরহ সহিহ মুসলিম