ধর্ম ডেস্ক
১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম
কখনো হঠাৎ মনে হতে পারে, কাউকে সাহায্য করা উচিত। কখনো কোনো অন্যায় কাজের আগে ভেতর থেকে বাধা অনুভব হয়। আবার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মনে জাগে বিশেষ একটি চিন্তা। এমন অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন আসতে পারে, এগুলো কি আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম?
ইসলামে ইলহামের ধারণা রয়েছে। তবে এর প্রকৃতি ও সীমা বোঝার জন্য কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা জানা জরুরি।
ইলহাম বলতে সাধারণভাবে অন্তরে কোনো ভাবনা বা উপলব্ধি সঞ্চারিত হওয়াকে বোঝানো হয়। ইসলামি পরিভাষায় এটি কখনো এমন অন্তর্গত প্রেরণাকে বোঝায়, যা মানুষকে ভালো কাজের দিকে উৎসাহিত করে বা মন্দ কাজ থেকে সতর্ক করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর তিনি তাকে তার অসৎকর্ম ও তার তাকওয়ার জ্ঞান দান করেছেন।’ (সুরা শামস: ৮)
এ আয়াতে মানুষের অন্তরে ভালো-মন্দের পার্থক্য উপলব্ধি করার ক্ষমতার কথা এসেছে। মানুষ তার বিবেক ও স্বাভাবিক উপলব্ধির মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ চিনতে পারে। তবে মানুষের প্রতিটি অন্তর্গত ভাবনাই বিশেষ ইলহাম নয়।
আরও পড়ুন: মানুষ চেষ্টা করে, ফয়সালা আল্লাহর
পবিত্র কোরআনে মুসা (আ.)-এর মায়ের প্রতি আল্লাহর নির্দেশের কথা এসেছে। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি মুসার মায়ের কাছে ওহি পাঠালাম যে, তাকে স্তন্যদান করো।’ (সুরা কাসাস: ৭)
এখানে ‘ওহি’ বলতে নবীদের প্রতি শরিয়তবিষয়ক ওহি বোঝানো হয়নি। তাফসিরকারদের ব্যাখ্যায়, এ ক্ষেত্রে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশনা বা অন্তরে সঞ্চারিত প্রেরণার অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, নবুয়তি ওহি ছাড়াও আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের অন্তরে সঠিক পথের অনুপ্রেরণা আসতে পারে।
সহিহ বুখারিতে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মধ্যে এমন কিছু মানুষ ছিলেন, যাঁরা নবী না হয়েও সঠিক কথা দ্বারা অনুপ্রাণিত হতেন (মুহাদ্দাস)। আমার উম্মতের মধ্যে এমন কেউ থাকলে তিনি হলেন ওমর।’ (সহিহ বুখারি: ৩৬৮৯)
হাদিসটি থেকে জানা যায়, নবী না হয়েও কোনো মানুষের অন্তরে সঠিক উপলব্ধি বা সত্য কথার অনুপ্রেরণা আসতে পারে। তবে এমন ব্যক্তিও ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তাঁর সব ধারণাকে সঠিক মনে করার সুযোগ নেই।
আরও পড়ুন: আল্লাহর ওলিদের সঙ্গে শত্রুতার পরিণাম
না। মনে ভালো কোনো ভাবনা জাগলেই সেটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম মনে করা ঠিক নয়। আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতির বাইরে কিছুই ঘটে না। তবে তাই বলে মানুষের প্রতিটি ভালো চিন্তাই বিশেষ ইলহাম নয়। নিজের অভিজ্ঞতা, বিবেক, আশা কিংবা স্বাভাবিক চিন্তা থেকেও ভালো ভাবনা আসতে পারে। আবার মনের কোনো ধারণা ভয়, কল্পনা বা শয়তানের কুমন্ত্রণার প্রভাবেও তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে কারও সম্পর্কে সন্দেহ, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো ধারণা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শুধু মনের অনুভূতির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। ভাবনাটি ইসলামের নির্দেশনা ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
ইলহাম নবীদের প্রতি অবতীর্ণ ওহির সমতুল্য নয়। এটি দিয়ে ইসলামের কোনো বিধান প্রতিষ্ঠা করা যায় না। কোনো ব্যক্তি নিজের অন্তরের অনুভূতির ভিত্তিতে কোনো কাজকে হালাল বা হারাম ঘোষণা করতে পারেন না। একইভাবে ব্যক্তিগত ইলহামের দাবি দিয়ে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করা কিংবা কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
কোনো অন্তর্গত উপলব্ধি কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে তা ভালো কাজের অনুপ্রেরণা হতে পারে। তবে শরিয়তের দলিল হবে কোরআন-সুন্নাহ।
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা যাচাই করা, বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ মানুষের পরামর্শ নেওয়া এবং আল্লাহর কাছে কল্যাণ চেয়ে ইস্তিখারা করা উচিত।
অতএব, অন্তরে ভালো কাজের অনুপ্রেরণা জাগলে তা কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে সেটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিশ্চিত নির্দেশ মনে না করে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে যাচাই করাই উচিত।
তথ্যসূত্র: সুরা শামস: ৮; সুরা কাসাস: ৭; সহিহ বুখারি: ৩৬৮৯