Dhaka Mail Logo

ইসলাম

জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.): কোরআন সংকলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা

ধর্ম ডেস্ক

১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম

পবিত্র কোরআনের লিখিত সংকলনের ইতিহাসে সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওহি লেখকদের একজন। আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতকালে কোরআনের লিখিত অংশগুলো সংগ্রহ করে একত্র করার দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হয়। পরবর্তী সময়ে ওসমান (রা.)-এর খেলাফতকালেও মানসম্মত মুসহাফের অনুলিপি প্রস্তুতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

অল্প বয়সেই জ্ঞানচর্চায় মনোযোগ

জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন মদিনার আনসার সাহাবিদের একজন। তিনি খাজরাজ গোত্রের বনু নাজ্জার শাখার সদস্য ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবদ্দশায় তিনি ওহি লেখার দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে তিনি ‘কাতিবুল ওহি’ বা ওহি লেখক হিসেবে পরিচিত হন।

কোরআনের আয়াত নাজিল হলে তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী তা লিখে রাখতেন। পাশাপাশি চিঠিপত্র লেখা ও আগত চিঠি পড়ার কাজেও সহযোগিতা করতেন।

সুনান আবু দাউদের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে ইহুদিদের লিখনপদ্ধতি শিখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। জায়েদ (রা.) জানান, তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই তা আয়ত্ত করেন। এরপর রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নির্দেশে চিঠিপত্র লেখা ও পড়ার দায়িত্ব পালন করেন।

কোরআন সংকলনের উদ্যোগ যেভাবে নেওয়া হয়

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওফাতের পর আবু বকর (রা.) খলিফা নির্বাচিত হন। তাঁর খেলাফতকালে ইয়ামামার যুদ্ধে কোরআনের বহু হাফেজ শহীদ হন। এতে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) আশঙ্কা করেন, ভবিষ্যতে বিভিন্ন যুদ্ধে আরও হাফেজ শহীদ হলে কোরআনের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি আবু বকর (রা.)-কে কোরআনের লিখিত অংশগুলো একত্র করে সংকলনের পরামর্শ দেন।

আরও পড়ুন: ‘উম্মাহর আমানতদার’ আবু উবাইদা (রা.)

প্রথমে আবু বকর (রা.) দ্বিধা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাসুলুল্লাহ (স.) যে কাজ করেননি, তা তিনি কীভাবে করবেন? ওমর (রা.) তাঁকে বোঝান, এটি কল্যাণকর উদ্যোগ। পরে আবু বকর (রা.)-ও এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সম্মতি দেন।

এরপর তিনি জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে এই দায়িত্ব অর্পণ করেন। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, আবু বকর (রা.) তাঁকে বুদ্ধিমান ও বিশ্বস্ত যুবক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, জায়েদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্য ওহি লেখার দায়িত্ব পালন করেছেন।

দায়িত্বটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে জায়েদ (রা.) প্রথমে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বর্ণনায় এসেছে, কোনো পাহাড় সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পেলেও তা কোরআন সংকলনের দায়িত্বের চেয়ে সহজ মনে হতো। তবু তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কাজে আত্মনিয়োগ করেন। (সহিহ বুখারি: ৪৯৮৬)

কীভাবে কোরআনের আয়াতগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল?

জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) লিখিত উপকরণ ও সাহাবিদের মুখস্থ সংরক্ষণের সহায়তায় কোরআনের আয়াতগুলো সংগ্রহ করেন। সহিহ বুখারির বর্ণনায় খেজুরের ডাল, পাতলা পাথরসহ বিভিন্ন উপকরণে লেখা আয়াত এবং সাহাবিদের স্মৃতি থেকে কোরআনের অংশ সংগ্রহের কথা উল্লেখ রয়েছে।

সংকলনের সময় সুরা তাওবার শেষের আয়াতগুলোর লিখিত অংশ আবু খুজাইমা আল-আনসারি (রা.)-এর কাছে পাওয়া যায় বলে বর্ণনায় এসেছে। এখানে লিখিত নথি সংগ্রহের প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ এই নয় যে, আয়াতগুলো অন্য কোনো সাহাবি জানতেন না।

সংকলিত পাণ্ডুলিপিটি প্রথমে আবু বকর (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল। তাঁর ওফাতের পর তা ওমর (রা.)-এর কাছে এবং পরে ওমর (রা.)-এর কন্যা হাফসা (রা.)-এর কাছে রাখা হয়।

আরও পড়ুন: এক মহান সাহাবির লজ্জার গল্প, যাঁর সামনে ফেরেশতারাও লজ্জা পেতেন

ওসমান (রা.)-এর সময়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর খেলাফতকালে বিভিন্ন অঞ্চলে কোরআন তেলাওয়াতের ধরন নিয়ে মতপার্থক্যের আশঙ্কা দেখা দিলে মানসম্মত লিখিত মুসহাফ প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ওসমান (রা.) হাফসা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপি আনিয়ে তার ভিত্তিতে একাধিক অনুলিপি প্রস্তুতের নির্দেশ দেন। এ কাজে জায়েদ (রা.)-সহ কয়েকজন সাহাবিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.), সাঈদ ইবনুল আস (রা.) এবং আবদুর রহমান ইবনে হারিস ইবনে হিশাম (রা.)।

অনুলিপি প্রস্তুতের পর সেগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল কোরআনের লিখিত পাঠের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা। (সহিহ বুখারি: ৪৯৮৭)

এভাবে কোরআনের লিখিত সংকলন এবং পরবর্তী সময়ে মানসম্মত মুসহাফের অনুলিপি প্রস্তুতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়েই জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) দায়িত্ব পালন করেন।

ফারায়েজে বিশেষ দক্ষতা

জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) কোরআন সংকলনের পাশাপাশি ইসলামি জ্ঞানচর্চায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছিলেন। উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনের বিধান, অর্থাৎ ফারায়েজ বিষয়ে তাঁর বিশেষ দক্ষতার কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে উত্তরাধিকার বিধান সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন সাহাবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (জামে তিরমিজি: ৩৭৯০)

তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা

জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর জীবন থেকে বোঝা যায়, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে মেধার পাশাপাশি আমানতদারি, সতর্কতা ও ধৈর্য অপরিহার্য। জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি তা মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোও গুরুত্বপূর্ণ।

কোরআনের আয়াত সংকলনের মতো গুরুদায়িত্ব তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছিলেন। তাঁর অবদান সাহাবিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং কোরআন সংরক্ষণের প্রতি তাঁদের গভীর দায়িত্ববোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর জীবন মেধা, আমানতদারি ও দায়িত্বশীলতার এমন এক দৃষ্টান্ত, যা ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ৪৯৮৬, ৪৯৮৭; সুনান আবু দাউদ: ৩৬৪৫; জামে তিরমিজি: ৩৭৯০