ধর্ম ডেস্ক
১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম
একই বিষয়কে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে। ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের মতো ধর্মীয় ক্ষেত্রেও মতভেদ দেখা যায়। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে মতভেদকে স্বাভাবিক মনে করলেও আলেমদের মধ্যে মতভেদ দেখলে অনেকে তাঁদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। কেউ ভিন্নমত পোষণকারী আলেমকে অপমান করেন, আবার কেউ গোটা আলেমসমাজ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেন। এমনকি কেউ কেউ ধর্মীয় বিধান পালনের ক্ষেত্রেও নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেন।
কিন্তু আলেমদের মতভেদ কি সব সময় ভুলের প্রমাণ? সাধারণ মুসলমানের করণীয়ই বা কী? বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে, সব মতভেদ এক ধরনের নয়।
ইসলামের কিছু মৌলিক বিধান কোরআন ও সুন্নাহতে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত। যেমন নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজের ফরজ বিধান। এসব বিধানের মৌলিক বিষয়গুলোতে মুসলিম আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে। তবে অনেক শাখাগত মাসয়ালায় কোরআন-সুন্নাহর দলিলের ব্যাখ্যা, প্রয়োগ কিংবা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে মতভেদ দেখা যায়। এ ধরনের মতভেদকে ইজতিহাদি মতভেদ বলা হয়।
ইজতিহাদ হলো কোরআন-সুন্নাহর দলিল ও মূলনীতির আলোকে কোনো বিষয়ে শরয়ি বিধান নির্ণয়ের জন্য যোগ্যতা অনুযায়ী গভীর গবেষণা করা। এ কাজের জন্য বিশেষ জ্ঞান ও যোগ্যতা প্রয়োজন। তাই প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষে নিজে নিজে ইজতিহাদ করা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: বিভেদ ভুলে যেভাবে ঐক্য গড়তে বলে ইসলাম
ইজতিহাদি মতভেদ কেন হয়? কখনো কোনো হাদিস একজন আলেমের কাছে পৌঁছায়নি। কখনো কোনো দলিলের অর্থ বুঝতে বা প্রয়োগ করতে আলেমদের মধ্যে পার্থক্য হয়েছে। আবার কখনো একাধিক দলিলের মধ্যে সমন্বয় কিংবা কোনো বিধানের প্রযোজ্যতা নির্ধারণেও তাঁদের ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ থাকে।
অতএব, কোনো বিষয়ে আলেমদের মতভেদ থাকলেই ধরে নেওয়া যায় না যে তাঁদের কেউ জেনেশুনে সত্য গোপন করছেন কিংবা নিজের ইচ্ছামতো ধর্মীয় বিধান দিচ্ছেন। একইসঙ্গে সব মতভেদকে গ্রহণযোগ্য মনে করাও ঠিক নয়। মতভেদের ধরন ও সংশ্লিষ্ট দলিল বিবেচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
ইজতিহাদের ক্ষেত্রে একজন যোগ্য আলেম আন্তরিকভাবে দলিল পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেও তাঁর সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো বিচারক ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছলে তিনি দুটি পুরস্কার পাবেন। আর ইজতিহাদ করে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছলে তিনি একটি পুরস্কার পাবেন। (সহিহ বুখারি: ৭৩৫২)
এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে, যে কেউ ধর্মীয় বিষয়ে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিলেই সওয়াব পাবে। এখানে যোগ্য ব্যক্তির জ্ঞান, গবেষণা ও আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে। অজ্ঞতা, খেয়ালখুশি কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের ভিত্তিতে দেওয়া মতামতকে এর মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া যায় না।
ইজতিহাদি মতভেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া যায় বনু কুরাইজার ঘটনায়।
আহযাব যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে রাসুলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের বলেছিলেন, বনু কুরাইজায় পৌঁছানোর আগে কেউ যেন আছরের নামাজ আদায় না করেন। পথে আছরের ওয়াক্ত হয়ে গেলে সাহাবিদের একদল নির্দেশটির আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করে সেখানে পৌঁছে নামাজ আদায় করেন। অন্যদল মনে করেন, দ্রুত সেখানে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়াই ছিল নির্দেশটির উদ্দেশ্য। তাই তাঁরা পথেই আছরের নামাজ আদায় করেন।
আরও পড়ুন: সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলামি প্রচারণা: ইনফ্লুয়েন্সার না আলেম?
ঘটনাটি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জানানো হলে তিনি কোনো দলকে তিরস্কার করেননি। (সহিহ বুখারি: ৯৪৬)
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, কোনো নির্দেশের অর্থ ও উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে আন্তরিক ব্যাখ্যাগত পার্থক্য হতে পারে। তবে এ উদাহরণ দেখিয়ে সব ধরনের মতভেদকে সঠিক বলা যাবে না। কোন মতভেদ গ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারণে দলিল ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান প্রয়োজন।
নামাজের কিছু পরিচিত মাসয়ালায় আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। যেমন, রুকুতে যাওয়ার আগে ও রুকু থেকে ওঠার সময় হাত তোলা, ইমামের পেছনে মুক্তাদির সুরা ফাতিহা পড়া, আমিন আস্তে বা জোরে বলা এবং হাত বাঁধার স্থান নির্ধারণের মতো বিষয়।
এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন আলেম তাঁদের বোঝাপড়া অনুযায়ী কোরআন-সুন্নাহর দলিল পর্যালোচনা করে মত দিয়েছেন। এসব মতভেদকে কেন্দ্র করে একে অন্যকে অপমান করা কিংবা সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে শত্রুতা তৈরি করা উচিত নয়। কোনো মতের পক্ষে দলিলের শক্তি নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন হলে তা জ্ঞান ও শালীনতার সঙ্গে করা উচিত।
সাধারণ মুসলমানের পক্ষে প্রতিটি মাসয়ালার দলিল বিশ্লেষণ করে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। তাই যাঁরা জানেন না, তাঁদের জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞাসা করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।’ (সুরা নাহল: ৪৩)
এ নির্দেশনার আলোকে সাধারণ মুসলমানের উচিত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগ্য, বিশ্বস্ত ও দায়িত্বশীল আলেমের পরামর্শ নেওয়া। শুধু জনপ্রিয়তা, আবেগপূর্ণ বক্তব্য কিংবা নিজের পছন্দের সঙ্গে মিল থাকার কারণে কাউকে নির্ভরযোগ্য আলেম হিসেবে বেছে নেওয়া উচিত নয়।
আরও পড়ুন: যাচাই না করে তথ্য ছড়ালেই সে মিথ্যাবাদী, হাদিসের কঠোর হুঁশিয়ারি
প্রথমত, নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন। যাঁর ধর্মীয় জ্ঞান, সততা ও দায়িত্বশীলতার ওপর আস্থা রাখা যায়, তাঁর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় মাসয়ালা জেনে নিন।
দ্বিতীয়ত, মতভেদ দেখেই আলেমকে অবিশ্বাস করবেন না। কোনো বিষয়ে একজন আলেমের মতের সঙ্গে অন্য আলেমের মত না মিললেই তাঁদের কাউকে অসৎ বা ধর্মবিরোধী মনে করা ঠিক নয়। আগে বুঝতে হবে, মতভেদটি কী ধরনের এবং এর পেছনে কী দলিল রয়েছে।
তৃতীয়ত, নিজের সুবিধামতো ফতোয়া বেছে নেবেন না। কোনো মত কঠিন মনে হওয়ায় বারবার আলেম বদলে নিজের পছন্দের সিদ্ধান্ত খোঁজা দায়িত্বশীল ধর্মীয় আচরণ নয়। প্রয়োজন হলে একাধিক যোগ্য আলেমের বক্তব্য শুনুন। তবে উদ্দেশ্য যেন সত্য জানা হয়, নিজের ইচ্ছাকে বৈধতা দেওয়া নয়।
চতুর্থত, মতভেদকে ঝগড়ার কারণ বানাবেন না। কোনো মাসয়ালায় দ্বিমত থাকলে শালীনভাবে আলোচনা করুন। অন্যের নিয়ত নিয়ে মন্তব্য, গালাগাল কিংবা অপমানজনক ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
আলেমরাও মানুষ। তাঁদের ভুল হতে পারে। তাই কোনো আলেমের প্রতিটি বক্তব্য প্রশ্নাতীত, এমন ধারণা যেমন সঠিক নয়, তেমনি একটি ভুলের কারণে তাঁকে অপমান করা কিংবা গোটা আলেমসমাজকে দোষারোপ করাও ন্যায়সংগত নয়।
কোনো বক্তব্যে ভুল মনে হলে প্রথমে তা সঠিকভাবে বুঝতে হবে। এরপর নির্ভরযোগ্য দলিলের আলোকে যোগ্য আলেমের কাছে যাচাই করে ভুল প্রমাণিত হলে শালীন ভাষায় সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত। সমালোচনার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সত্য স্পষ্ট করা, ব্যক্তিকে হেয় করা নয়। একইভাবে কোনো আলেমের অনুসারী হওয়া মানে তাঁর প্রতিটি মতের পক্ষে অন্ধভাবে অবস্থান নেওয়া নয়। দলিলের প্রতি শ্রদ্ধা ও ব্যক্তির প্রতি শালীনতা- দুটিই বজায় রাখা প্রয়োজন।
ইসলাম বৈধ ইজতিহাদি মতভেদের সুযোগ স্বীকার করে। তবে সেই মতভেদকে কেন্দ্র করে দলাদলি, শত্রুতা ও সংঘাত তৈরি করাকে সমর্থন করে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না।’ (সুরা আনফাল: ৪৬)
চার মাজহাবের মধ্যেও বহু শাখাগত মাসয়ালায় মতপার্থক্য রয়েছে। এসব মতভেদের পেছনে দলিল ও ব্যাখ্যাগত আলোচনা আছে। তাই কোনো মাজহাব বা আলেমের অনুসরণ করার কারণে অন্য মুসলমানকে অযথা আক্রমণ করা উচিত নয়। একইসঙ্গে নিজের অনুসৃত মতের পক্ষে দলিল ও জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা গ্রহণের মানসিকতাও থাকা প্রয়োজন।
মোটকথা, আলেমদের মতভেদকে কেন্দ্র করে অবিশ্বাস, বিদ্বেষ ও বিভেদ ছড়ানোর পরিবর্তে দলিলভিত্তিক জ্ঞানচর্চা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। যোগ্য আলেমদের ইজতিহাদি মতপার্থক্যকে যথাযথভাবে বোঝা এবং মতভেদসত্ত্বেও শালীনতা বজায় রাখাই হতে পারে এ ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বশীল অবস্থান।
তথ্যসূত্র: সুরা নাহল: ৪৩; সুরা আনফাল: ৪৬; সহিহ বুখারি: ৯৪৬, ৭৩৫২