Dhaka Mail Logo

ইসলাম

পৃথিবীতে ‘খলিফা’ কারা, কোরআন কী বলে

ধর্ম ডেস্ক

১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৭ পিএম

‘খলিফা’ শব্দটি শুনলে অনেকের মনে ইসলামি রাষ্ট্রপ্রধানের কথা আসে। কিন্তু পবিত্র কোরআনে শব্দটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। কোথাও আদম (আ.)-এর পৃথিবীতে খলিফা হওয়ার কথা বলা হয়েছে, কোথাও মানুষকে পূর্ববর্তী প্রজন্মের উত্তরসূরি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, আবার কোথাও দাউদ (আ.)-কে খলিফা করে ন্যায়বিচারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে কোরআনে।

তাহলে পৃথিবীতে ‘খলিফা’ কারা? খিলাফতের অর্থ কী, আর এর সঙ্গে মানুষের দায়িত্বের সম্পর্ক কোথায়?

আদম (আ.) ও তাঁর বংশধর

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফেরেশতাদের বললেন, নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।’ (সুরা বাকারা: ৩০)

‘খলিফা’ শব্দের সাধারণ অর্থ উত্তরসূরি বা স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আদম (আ.)-কে খলিফা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাফসিরে তাঁর বংশধরদের পৃথিবীতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। তবে শব্দটির সুনির্দিষ্ট তাৎপর্য নিয়ে তাফসিরকারদের মধ্যে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে।

মানুষ পৃথিবীর উত্তরসূরি ও পরীক্ষাধীন

কোরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষকে পৃথিবীতে খলিফা বা একের পর এক প্রজন্মের স্থলাভিষিক্ত করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তিনিই তোমাদের পৃথিবীতে খলিফা করেছেন এবং তোমাদের কাউকে কারও ওপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তা দিয়ে তোমাদের পরীক্ষা করেন।’ (সুরা আনআম: ১৬৫)

আরও পড়ুন: ৫ শ্রেণির মানুষ আল্লাহর বিশেষ বান্দা

এ আয়াত মানুষের প্রাপ্ত সম্পদ, সামর্থ্য ও মর্যাদার সঙ্গে পরীক্ষার সম্পর্ক তুলে ধরে। কেউ সম্পদ পেয়েছেন, কেউ জ্ঞান, কেউ ক্ষমতা বা নেতৃত্বের সুযোগ পেয়েছেন। এসব সুযোগ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও পরীক্ষার অংশ।

অর্থাৎ পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান শুধু ভোগ ও ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়। নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন এবং অন্যের অধিকার রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষমতার সঙ্গে ন্যায়বিচারের দায়িত্ব

দাউদ (আ.)-কে উদ্দেশ করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে দাউদ, আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলিফা করেছি। অতএব, তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার করো এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।’ (সুরা সোয়াদ: ২৬)

এ আয়াতে খিলাফতের প্রসঙ্গে ন্যায়বিচার ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ এসেছে। মানে, দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের সঙ্গে জবাবদিহি জড়িত। ক্ষমতা পেয়ে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া কিংবা মানুষের অধিকার নষ্ট করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।

ঈমান ও সৎকর্মশীলদের জন্য কর্তৃত্বের প্রতিশ্রুতি

সুরা নুরে আল্লাহ তাআলা ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদের পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করবেন, যেমন তিনি তাদের পূর্ববর্তীদের কর্তৃত্ব দান করেছিলেন।’ (সুরা নুর: ৫৫)

আয়াতটির পরবর্তী অংশে আল্লাহ দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করা, ভয়-ভীতির পরিবর্তে নিরাপত্তা দেওয়া এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করার কথা বলেছেন। এখানে ঈমান ও সৎকর্মের শর্ত স্পষ্ট।

তবে পৃথিবীতে ক্ষমতা বা প্রভাব অর্জনকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত প্রতিনিধি মনে করা ঠিক নয়। ক্ষমতা অর্জন এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করা এক বিষয় নয়।

দায়িত্ব পালনে ঈমান, জ্ঞান ও যোগ্যতা

পৃথিবীতে দায়িত্বশীল জীবন গড়তে ঈমান ও সৎকর্মের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও যোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে, তারা ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না?’ (সুরা আনকাবুত: ২)

আরও পড়ুন: জবাবদিহিতাকে যেভাবে ভয় করতেন সালাফরা

এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, ঈমানের দাবি জীবনের পরীক্ষায় প্রকাশ পায়। সততা বজায় রাখা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা একজন মুমিনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ।

কোরআনে ইউসুফ (আ.)-এর বক্তব্য এসেছে, ‘আমাকে দেশের ধনভান্ডারের দায়িত্ব দিন। নিশ্চয়ই আমি সংরক্ষণকারী ও জ্ঞানসম্পন্ন।’ (সুরা ইউসুফ: ৫৫)

এ আয়াতে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমানতদারি ও জ্ঞানের গুরুত্ব দেখা যায়। অর্থাৎ দায়িত্ব পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি সেই দায়িত্ব পালনের যোগ্যতাও অর্জন করতে হবে।

পৃথিবীতে খিলাফত ও রাষ্ট্রীয় খিলাফত কি এক?

কোরআনে ‘খলিফা’ ও ‘খিলাফত’ শব্দগুলো বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়েছে। সুরা বাকারায় আদম (আ.)-কে পৃথিবীতে খলিফা করার কথা বলা হয়েছে। সুরা সোয়াদে দাউদ (আ.)-কে খলিফা হিসেবে উল্লেখ করে মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মুসলিম শাসকদের ‘খলিফা’ উপাধি দেওয়া ইসলামি রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি স্বতন্ত্র বিষয়। আবু বকর (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিমদের প্রথম খলিফা।

তাই কোরআনে ‘খলিফা’ শব্দটির প্রতিটি প্রয়োগকে রাষ্ট্রীয় খিলাফতের অর্থে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। শব্দটির অর্থ বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট আয়াতের ভাষা, প্রেক্ষাপট ও নির্ভরযোগ্য তাফসিরের ব্যাখ্যা বিবেচনা করা জরুরি।

খিলাফত থেকে আমাদের শিক্ষা কী?

কোরআনের আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান, প্রাপ্ত সামর্থ্য ও কর্তৃত্বের সঙ্গে দায়িত্ব ও পরীক্ষার সম্পর্ক রয়েছে। আল্লাহর আনুগত্য করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও যোগ্যতা অর্জন করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।

পবিত্র কোরআনে খলিফাকেন্দ্রিক আয়াতগুলোর প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য এক নয়। তবে এগুলো মানুষের দায়িত্ব, কর্তৃত্ব ও জবাবদিহি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

পৃথিবীতে মর্যাদা বা ক্ষমতা অর্জনই সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়। আল্লাহর দেওয়া সামর্থ্য ও কর্তৃত্ব কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের উচিত ঈমান ও আমল পরিশুদ্ধ করা, জ্ঞান ও যোগ্যতা অর্জন করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও আমানতদারিকে গুরুত্ব দেওয়া।

আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের তাওফিক দিন। আমিন।

তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা: ৩০; সুরা আনআম: ১৬৫, সুরা নুর: ৫৫, সুরা সোয়াদ: ২৬, সুরা আনকাবুত: ২; সুরা ইউসুফ: ৫৫