Dhaka Mail Logo

ইসলাম

মুসআব ইবনে উমাইর (রা.): ইসলামের প্রথম দূত

ধর্ম ডেস্ক

১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম

মক্কার অভিজাত পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। সুন্দর পোশাক, দামি সুগন্ধি আর স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন ছিল তাঁর। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর সেই জীবন ছেড়ে তাঁকে বেছে নিতে হয় ত্যাগের পথ। পারিবারিক বাধা, বন্দিত্ব ও দেশত্যাগের মতো কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্যেও তিনি ঈমানের ওপর অবিচল ছিলেন।

পরে রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে মদিনায় পাঠান। সেখানে তাঁর কাজ ছিল মানুষকে কোরআন শেখানো, ইসলামের দাওয়াত দেওয়া এবং নতুন মুসলিম সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করা। তিনি মুসআব ইবনে উমাইর (রা.), যিনি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম দূত হিসেবে পরিচিত।

বিলাসী জীবন ছেড়ে সত্যের সন্ধানে

মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) ছিলেন কুরাইশের বনু আবদুদ্দার শাখার সন্তান। তাঁর উপনাম ছিল আবু আবদুল্লাহ। সাহাবিদের জীবনীগ্রন্থে তাঁর অভিজাত জীবন, সুন্দর পোশাক ও সুগন্ধি ব্যবহারের কথা উল্লেখ রয়েছে। তিনি ছিলেন মক্কার পরিচিত ও সুদর্শন তরুণদের একজন।

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছানোর পর তিনি তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। একসময় ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করে ইসলাম গ্রহণ করেন।

তখন মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করা সহজ ছিল না। নতুন ধর্মবিশ্বাসের কারণে অনেক মুসলমানকে পরিবার ও গোত্রের বিরোধিতার মুখে পড়তে হতো। মুসআব (রা.)-এর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। তাঁর ইসলাম গ্রহণের খবর জানাজানি হলে পরিবার তাঁকে আটকে রাখে বলে জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘উম্মাহর আমানতদার’ আবু উবাইদা (রা.)

কিন্তু এসব বাধা তাঁকে ঈমান থেকে সরাতে পারেনি। পরে নির্যাতিত মুসলমানদের একটি দলের সঙ্গে তিনি হাবশায় হিজরত করেন। কিছু সময় সেখানে থাকার পর মক্কায় ফিরে আসেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচিত পরিবেশের বাইরে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জীবনযাপনের সুযোগ করে দেয়।

কেন তাঁকে মদিনায় পাঠালেন রাসুলুল্লাহ (স.)

নবুয়ত লাভের পর রাসুলুল্লাহ (স.) হজের মৌসুমে মক্কায় আসা বিভিন্ন গোত্রের মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। এ সময় ইয়াসরিবের কয়েকজন মানুষের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। ইয়াসরিবই পরে মদিনা নামে পরিচিত হয়। তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করে নিজ শহরে ফিরে যান এবং সেখানে ইসলামের কথা প্রচার করতে থাকেন।

পরের বছর আকাবার প্রথম বাইআতে মদিনার ১২ জন ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে ইসলামের অঙ্গীকার করেন। তাঁদের ইসলামের শিক্ষা দেওয়ার জন্য একজন শিক্ষক প্রয়োজন ছিল। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে তাঁদের সঙ্গে মদিনায় পাঠান।

সেখানে তাঁর দায়িত্ব ছিল মানুষকে কোরআন শেখানো, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা বোঝানো এবং আল্লাহর পথে আহ্বান করা। এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি মদিনায় ইসলামের শিক্ষা প্রচারের প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। সাধারণত এ কারণেই তাঁকে ইসলামের প্রথম দূত বলা হয়।

তাঁর দাওয়াতে বদলে যেতে থাকে মদিনা

মদিনায় পৌঁছে মুসআব (রা.) আসআদ ইবনে জুরারাহ (রা.)-এর সহযোগিতায় ইসলামের শিক্ষা প্রচার করতে থাকেন। তিনি মানুষকে কোরআন শোনাতেন, ইসলামের বিধান বোঝাতেন এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন।

তাঁর দাওয়াতের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো উসাইদ ইবনে হুদাইর (রা.) ও সাদ ইবনে মুআজ (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ। তাঁরা ছিলেন মদিনার প্রভাবশালী নেতা। তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ফলে তাঁদের গোত্রের মানুষের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছানোর পথ সহজ হয়।

আরও পড়ুন: হজরত তালহা (রা.): উহুদের ময়দানে নবীজির ঢাল হয়েছিলেন যেভাবে

মুসআব (রা.)-এর প্রচেষ্টায় মদিনায় ইসলামের বিস্তার ঘটতে থাকে। তাঁর পাশাপাশি সেখানকার প্রথম মুসলমানেরাও দাওয়াতের কাজে ভূমিকা রাখেন। এভাবে মদিনায় মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠার ভিত্তি আরও মজবুত হয়।

পরবর্তী সময়ে আকাবার দ্বিতীয় বাইআতে মদিনার বহু মানুষ অংশ নেন। তাঁরা রাসুলুল্লাহ (স.)-কে মদিনায় আসার আমন্ত্রণ জানান এবং তাঁকে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেন। এই ঘটনা হিজরতের পথ সুগম করে। মুসআব (রা.)-এর দাওয়াতি কাজ তাই মদিনায় ইসলামের শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নতুন মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠার ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।

শিক্ষক ও দাঈ হিসেবে অবদান

মুসআব (রা.)-এর দায়িত্ব ছিল মানুষের কাছে ইসলামের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া। তিনি কোরআন শেখানোর পাশাপাশি নতুন মুসলমানদের ধর্মীয় দিকনির্দেশনা দিতেন। তাঁর কাজ থেকে বোঝা যায়, মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করতে জ্ঞানের পাশাপাশি ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও আন্তরিকতাও প্রয়োজন।

মদিনায় দায়িত্ব পালনের পর মুসআব (রা.) রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে বদর ও উহুদের যুদ্ধে অংশ নেন। সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী, উহুদের যুদ্ধে তিনি মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহক ছিলেন।

উহুদের ময়দানে শাহাদাত

উহুদের যুদ্ধে মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) শহীদ হন। তাঁর শাহাদাতের ঘটনা সাহাবিদের ত্যাগের এক মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্ত।

খাব্বাব (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, মুসআব (রা.) শহীদ হলে তাঁকে কাফন দেওয়ার জন্য একটি চাদর ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যেত, আর পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে পড়ত। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) মাথার দিক ঢেকে দিতে এবং পায়ের দিকে ইযখির ঘাস রাখতে নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি: ১২৭৬)

একসময় যিনি মক্কায় স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের জন্য পরিচিত ছিলেন, তাঁর কাফনের জন্যও পর্যাপ্ত কাপড় পাওয়া যায়নি। তাঁর জীবনের এই পরিবর্তন দেখায়, দুনিয়ার সম্পদ ও আভিজাত্যের চেয়ে ঈমান ও দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব কত গভীর হতে পারে।

মুসআব (রা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা

মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-এর জীবন শেখায়, সত্য গ্রহণ করতে সাহস লাগে, আর সেই সত্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজন জ্ঞান, ধৈর্য ও প্রজ্ঞা। তিনি মদিনায় গিয়ে কোরআন শিখিয়েছেন, মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন এবং নতুন মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

তাঁর জীবন আরও দেখায়, পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্য ও সামাজিক মর্যাদাই মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থাকা এবং দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার মধ্য দিয়েও একজন মানুষের মর্যাদা প্রকাশ পায়।

মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) মদিনায় গিয়েছিলেন ইসলামের শিক্ষা পৌঁছে দিতে। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, দাঈ এবং দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গকারী সাহাবি।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ১২৭৬; আল-ইসতিআব: ৪/১৪৭৪; উসদুল গাবাহ: ৪/৪০৫