বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

হজরত তালহা (রা.): উহুদের ময়দানে নবীজির ঢাল হয়েছিলেন যেভাবে

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৬ পিএম

শেয়ার করুন:

হজরত তালহা (রা.): উহুদের ময়দানে নবীজির ঢাল হয়েছিলেন যেভাবে

উহুদের ময়দান। চারদিকে তখন প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। একপর্যায়ে মুসলিম বাহিনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। শত্রুর আক্রমণে রাসুলুল্লাহ (স.)-ও গুরুতর আহত হন। এই কঠিন মুহূর্তে যাঁরা নবীজি (স.)-এর চারপাশে অটলভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হজরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) ছিলেন তাঁদের অন্যতম। নিজের শরীরকে তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্য ঢালের মতো করে দিয়েছিলেন।

যুদ্ধের মোড় যেভাবে ঘুরে গেল

তৃতীয় হিজরির শাওয়াল মাসে উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের শুরুতে মুসলমানরা এগিয়ে ছিলেন। একপর্যায়ে পাহাড়ের গিরিপথে দায়িত্বপ্রাপ্ত তীরন্দাজদের একটি অংশ নিজেদের অবস্থান ছেড়ে নেমে আসে। তখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে কুরাইশের অশ্বারোহী বাহিনী পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে। এতে মুসলিম বাহিনীর সারিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

এই সংকটের মধ্যে শত্রুরা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর দিকে এগিয়ে আসে। তাঁর পাশে তখন অল্প কয়েকজন সাহাবি অটল ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তালহা (রা.) ও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ছিলেন। (সহিহ বুখারি: ৩৭২২-৩৭২৩)

যে হাত অবশ হয়ে গেল

সহিহ বুখারিতে কায়েস ইবনে আবি হাজিম (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি তালহা (রা.)-এর সেই হাত দেখেছিলেন, যে হাত দিয়ে তিনি উহুদের দিন রাসুলুল্লাহ (স.)-কে রক্ষা করেছিলেন। আঘাতের কারণে হাতটি অবশ হয়ে গিয়েছিল। (সহিহ বুখারি: ৩৭২৪)

নবীজি (স.)-কে রক্ষা করতে গিয়ে তালহা (রা.) নিজের শরীরে একের পর এক আঘাত সহ্য করেন। উহুদের সেই দিনের আঘাতে অবশ হয়ে যাওয়া হাতটি সারা জীবন তাঁর আত্মত্যাগের স্মারক হয়ে ছিল।

আরও পড়ুন: উহুদ যুদ্ধ: পরাজয় নাকি শিক্ষা, কোরআন কী বলে

নবীজিকে নিরাপদ স্থানে তুললেন

তালহা (রা.) শুধু নিজের শরীর দিয়ে নবীজি (স.)-কে রক্ষা করেননি, তাঁকে নিরাপদ জায়গায় উঠতেও সহযোগিতা করেছিলেন।

জুবাইর ইবনুল আওওয়াম (রা.) বর্ণনা করেন, উহুদের দিন রাসুলুল্লাহ (স.) দুটি বর্ম পরেছিলেন। তিনি একটি পাথরের ওপর উঠতে চেয়েও উঠতে পারছিলেন না। তখন তালহা (রা.) নিচু হয়ে বসেন এবং রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর ওপর ভর করে পাথরের ওপর ওঠেন। এরপর নবীজি (স.) বলেন, ‘তালহার জন্য (জান্নাত) ওয়াজিব হয়ে গেছে।’ (জামে তিরমিজি: ৩৭৩৮)

‘সেদিনটি পুরোটাই ছিল তালহার’

উহুদের দিনের প্রসঙ্গ উঠলে হজরত আবু বকর (রা.) বলতেন, ‘সেদিনটি পুরোটাই ছিল তালহার।’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি

তালহা (রা.) ছিলেন আশারায়ে মুবাশশারার অন্যতম, সেই সৌভাগ্যবান সাহাবিদের একজন, যাঁদের জীবদ্দশাতেই জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল।

তিনি ছিলেন কুরাইশের বনু তাইম গোত্রের সন্তান এবং প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন। ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি দানশীলতার জন্যও প্রসিদ্ধ ছিলেন। বদর যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিতে না পারলেও জীবনীগ্রন্থে বর্ণিত আছে, তাঁকে বদরের অংশগ্রহণকারীদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। ৩৬ হিজরিতে জামালের যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

ভালোবাসা যখন প্রমাণিত

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা কেমন ছিল, উহুদের সেই দিনটি তার জীবন্ত উদাহরণ। বিপদের মুহূর্তে নিজের নিরাপত্তার কথা ভুলে তালহা (রা.) নবীজি (স.)-এর সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।

সত্যিকারের ভালোবাসা শুধু কথায় প্রকাশ পায় না। প্রয়োজনের মুহূর্তে ত্যাগ ও আত্মদানের মধ্য দিয়েও তার সত্যতা প্রকাশ পায়। উহুদের ময়দানে তালহা (রা.)-এর অবশ হয়ে যাওয়া হাত সেই ভালোবাসা ও আত্মত্যাগেরই এক অনন্য স্মারক হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, জামে তিরমিজি, সীরাত ইবনে হিশাম, আত-তাবাকাতুল কুবরা- ইবনে সাদ।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর