Dhaka Mail Logo

ইসলাম

জুমার আগে অতিরিক্ত আজান চালু করেছিলেন কে?

ধর্ম ডেস্ক

০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৬ পিএম

জুমার দিন মুসলমানদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ দিনের ফজিলত সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। পবিত্র কোরআনে ‘আল-জুমুআ’ নামে একটি স্বতন্ত্র সুরা রয়েছে। এ সুরায় জুমার আজান হলে আল্লাহর স্মরণের দিকে এগিয়ে যেতে এবং বেচাকেনা ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রায় সব মসজিদেই জুমার দিন দুটি আজান দেওয়া হয়। প্রথম আজানটি সাধারণ ওয়াক্তিয়া নামাজের আজানের মতো দেওয়া হয়। এরপর ইমাম খুতবা দেওয়ার জন্য মিম্বরে বসলে দ্বিতীয় আজান দেওয়া হয়। তবে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সময়ে দুই আজান দেওয়ার প্রচলন ছিল না। মুসলমানদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় খলিফা উসমান (রা.) অতিরিক্ত আজান চালু করেন। সহিহ বুখারিতে এ ঘটনার বিবরণ রয়েছে।

প্রথম যুগে জুমার আজান

রাসুলুল্লাহ (স.), আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-এর সময়ে জুমার দিন ইমাম মিম্বরে বসার পর আজান দেওয়া হতো। এরপর খুতবা দেওয়া হতো এবং নামাজের আগে ইকামত দেওয়া হতো।

সায়িব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.), আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-এর সময়ে জুমার দিন ইমাম মিম্বরে বসার পর আজান দেওয়া হতো। উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে গেলে তিনি অতিরিক্ত আজানের ব্যবস্থা করেন। (সহিহ বুখারি: ৯১২)

এই হাদিস থেকে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সময়ে জুমার খুতবার আগে আলাদা আজান দেওয়া হতো না। ইমাম মিম্বরে বসার পর আজান দেওয়া হতো। আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-এর সময়েও এ নিয়ম চালু ছিল।


কেন অতিরিক্ত আজান চালু করেছিলেন উসমান (রা.)?

উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে মানুষকে জুমার নামাজের সময় সম্পর্কে আগেভাগে জানানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে তিনি খুতবার আগে অতিরিক্ত আজান দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

হাদিসে এসেছে, উসমান (রা.) ‘জাওরা’ নামক স্থানে এ আজান দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জাওরা ছিল মদিনার বাজারের একটি স্থান। (সহিহ বুখারি: ৯১২)

বর্তমানে জুমার যে প্রথম আজান দেওয়া হয়, সেটিই উসমান (রা.)-এর চালু করা অতিরিক্ত আজানের ধারাবাহিকতা। আর ইমাম মিম্বরে বসার পর দেওয়া দ্বিতীয় আজানটি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর যুগেও প্রচলিত ছিল।

আরও পড়ুন: জুমার দিন বেচা-কেনা নিষিদ্ধের আয়াত দ্বারা কি প্রথম আজান উদ্দেশ্য?

অতিরিক্ত আজান কি সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত?

উসমান (রা.) ছিলেন খোলাফায়ে রাশেদার অন্যতম। মুসলিম সমাজের প্রয়োজন বিবেচনায় তাঁর চালু করা এ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (স.) খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নত অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ‘তোমরা আমার সুন্নত এবং আমার পরের হেদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নত আঁকড়ে ধরবে।’ (সুনান আবু দাউদ: ৪৬০৭)

এ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নতের পাশাপাশি খোলাফায়ে রাশেদার অনুসরণীয় সুন্নত আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উসমান (রা.)-এর চালু করা অতিরিক্ত আজানকে বুঝতে হলে এ নির্দেশনার পাশাপাশি এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হবে।

জুমার আজানের পর বেচাকেনার বিধান

জুমার আজান হওয়ার পর বেচাকেনা ছেড়ে আল্লাহর স্মরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ পবিত্র কোরআনে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও। এটা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা উপলব্ধি করো।’ (সুরা জুমুআ: ৯)

এ আয়াত অনুযায়ী, যাদের ওপর জুমার নামাজ ফরজ, তাদের জন্য আজানের পর বেচাকেনা ছেড়ে নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন: দেশের সব মসজিদে জুমার নামাজের নতুন সময় নির্ধারণ 

তবে কোন আজান থেকে বেচাকেনা বন্ধের বিধান কার্যকর হবে, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, খুতবার আগের প্রথম আজান থেকেই বেচাকেনা ছেড়ে জুমার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। অধিকাংশ আলেমের মতে, ইমাম মিম্বরে বসার পর দেওয়া আজান থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়।

তাই এ বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও জুমার নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া এবং আল্লাহর স্মরণে মনোযোগী হওয়ার গুরুত্ব সবার জন্যই রয়েছে।

খুতবার সময় কথা বলা যাবে কি?

জুমার খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা মুসল্লিদের দায়িত্ব। এ সময় কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হয়। এমনকি অন্য কাউকে চুপ করতে বলাও অনর্থক কথার অন্তর্ভুক্ত।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জুমার দিন ইমাম যখন খুতবা দেন, তখন তুমি যদি তোমার সঙ্গীকে বলো, চুপ করো, তাহলেও তুমি অনর্থক কথা বললে।’ (সহিহ বুখারি: ৯৩৪; সহিহ মুসলিম: ৮৫১)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, খুতবার সময় কথাবার্তা না বলে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা উচিত। তাই এ সময় অপ্রয়োজনীয় কথা বলা, মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকা কিংবা অন্য কাজে মনোযোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

খুতবা চলাকালে নফল নামাজের বিধানেও ফিকহি আলোচনা রয়েছে। হানাফি মাজহাবে খুতবা শুরু হলে নামাজে ব্যস্ত না হয়ে খুতবা শোনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে মসজিদে প্রবেশের পর তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়া নিয়ে অন্যান্য আলেমের ভিন্ন মত রয়েছে। তাই এ বিষয়ে সব মাজহাবের বিধানকে এক করে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

খুতবার আজানের জবাব ও দোয়া

সাধারণভাবে আজান শুনলে মুয়াজজিনের কথার অনুরূপ জবাব দেওয়ার শিক্ষা হাদিসে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা যখন আজান শুনবে, তখন মুয়াজজিন যা বলে, তোমরাও তা বলো।’ (সহিহ বুখারি: ৬১১)

তবে ইমাম মিম্বরে বসার পর দেওয়া আজানের জবাব এবং আজানের পরের দোয়া পড়ার বিষয়ে ফিকহি আলোচনা রয়েছে। হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে এ সময়ে মৌখিকভাবে জবাব না দিয়ে নীরব থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খুতবা শুরু হয়ে গেলে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনাই অগ্রাধিকার পাবে।

ইমাম আজান শেষ হওয়ার পর খুতবা শুরু করতে দেরি করলে সে সময় দোয়া পড়ার সুযোগ নিয়েও ফিকহি গ্রন্থগুলোতে আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে নিজের অনুসৃত মাজহাবের নির্ভরযোগ্য আলেমের নির্দেশনা অনুসরণ করা ভালো।

তথ্যসূত্র: সুরা জুমুআ: ৯; সহিহ বুখারি: ৬১১, ৯১২, ৯৩৪; সহিহ মুসলিম: ৮৫১; সুনান আবু দাউদ: ৪৬০৭