ধর্ম ডেস্ক
০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম
বিপদে পড়া মানুষকে আমরা প্রায়ই বলি, ‘সবর করুন।’ কথাটি এত বেশি ব্যবহৃত হয় যে অনেকের কাছে সবরের অর্থ দাঁড়িয়েছে কষ্ট চেপে রেখে নীরবে সয়ে যাওয়া। অথচ কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সবরের পরিধি এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। এটি নিষ্ক্রিয়তা নয়, সক্রিয় আত্মনিয়ন্ত্রণ ও অবিচলতার নাম।
আরবি ‘সবর’ শব্দের মূল অর্থ নিজেকে সংযত, নিয়ন্ত্রিত ও দৃঢ় রাখা। আল্লামা রাগেব ইস্ফাহানি (রহ.) আল-মুফরাদাত ফি গারিবিল কোরআন গ্রন্থে সবরের সংজ্ঞা দিয়েছেন- ‘বিবেক ও শরিয়ত যা করতে বলে, নিজেকে তাতে নিয়োজিত রাখা এবং যা থেকে বিরত থাকতে বলে, তা থেকে নিজেকে বিরত রাখা।’
অর্থাৎ সবরের মধ্যে যেমন করণীয় কাজে অবিচল থাকা আছে, তেমনি বর্জনীয় বিষয় থেকে নিজেকে ফিরিয়ে রাখাও আছে।
কোরআনে সবর শব্দটি বিভিন্ন রূপে বহুবার এসেছে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) থেকে বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, এর প্রায় নব্বইটি ব্যবহারের মধ্যে বাষট্টি জায়গায় আদেশসূচক রূপ এসেছে। ইবনুল কায়্যিম (রহ.) উদ্দাতুস সাবিরিন গ্রন্থে এ তথ্য উল্লেখ করেছেন। ইবনে আশুর (রহ.) আত-তাহরির ওয়াত-তানবির-এ সংখ্যাটি সত্তরেরও বেশি বলেছেন। এত ব্যাপক উল্লেখই বোঝায়, সবর মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধরো ও ধৈর্যে অটল থাক এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও। ’ (সুরা আলে ইমরান: ২০০)
আরও পড়ুন: যেকোনো পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক থাকার দোয়া
দুনিয়া মানুষের জন্য পরীক্ষার জায়গা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন, কে উত্তম আমল করে।’ (সুরা মুলক: ২)
এই পরীক্ষার একটি রূপ বিপদাপদ। আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর সুসংবাদ দাও সবরকারীদের।’ (সুরা বাকারা: ১৫৫)
এর পরের আয়াতে সবরকারীদের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে, বিপদ এলে তারা বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব।’ (সুরা বাকারা: ১৫৬) এরপর আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘তাদের ওপর তাদের রবের পক্ষ থেকে বিশেষ করুণা ও দয়া রয়েছে, আর তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত।’ (সুরা বাকারা: ১৫৭)
না। সবর মানে আবেগহীন হয়ে যাওয়া নয়। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ছেলে ইবরাহিমের মৃত্যুতে তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘চোখ অশ্রু ঝরায়, অন্তর ব্যথিত হয়। তবে আমরা মুখে তা-ই বলি, যা আমাদের রবকে সন্তুষ্ট করে।’ (সহিহ বুখারি: ১৩০৩)
একবার কবরের পাশে কাঁদতে থাকা এক নারীকে তিনি সবর করতে বললে সে তাঁকে চিনতে না পেরে রূঢ় জবাব দেয়। পরে বিষয়টি জানতে পেরে ক্ষমা চাইলে তিনি বলেন, ‘সবর তো বিপদের প্রথম মুহূর্তে।’ (সহিহ বুখারি: ১২৮৩)
ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনেও এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। প্রিয় সন্তানের বিচ্ছেদে তিনি বলেছিলেন, ‘সুতরাং সুন্দর সবরই আমার জন্য।’ (সুরা ইউসুফ: ১৮) শোকে তাঁর চোখ সাদা হয়ে গিয়েছিল (সুরা ইউসুফ: ৮৪), তবু তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার দুঃখ ও বেদনা কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করছি।’ (সুরা ইউসুফ: ৮৬)
অর্থাৎ শোক বা কান্না সবরের পরিপন্থী নয়। সবরের পরীক্ষা হলো সেই কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর প্রতি আস্থা ও নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।
আরও পড়ুন: অপ্রীতিকর আচরণ যেভাবে মোকাবেলা করতেন নবীজি
বিপদ আসার আগেও সবরের প্রয়োজন হয়। নফস মানুষকে এমন কাজের দিকে টানতে পারে, যা আল্লাহ অপছন্দ করেন। সেই প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে গুনাহ থেকে বিরত থাকাও সবর। একইভাবে ইবাদতে অলসতা বা কষ্ট এলেও আল্লাহর বিধানে অবিচল থাকা সবরের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনার পরিবারকে সালাতের আদেশ দিন এবং নিজেও তাতে অবিচল থাকুন।’ (সুরা ত্বহা: ১৩২)
তাই সবর শুধু বিপদের সময়ের আমল নয়। প্রতিদিনের জীবনেও একজন মুমিন নফসের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, গুনাহ বর্জন এবং ইবাদতে স্থির থাকার মাধ্যমে সবরের চর্চা করেন।
সবর মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। তালুতের বাহিনী জালুতের মুখোমুখি হয়ে দোয়া করেছিল, ‘হে আমাদের রব, আমাদের ওপর সবর ঢেলে দিন, আমাদের পা অবিচল রাখুন এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন।’ (সুরা বাকারা: ২৫০)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যা তোমার উপকারে আসে, তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৬৪)
অর্থাৎ সাধ্যমতো চেষ্টা করা, আল্লাহর সাহায্য চাওয়া এবং ফলাফলের জন্য অস্থির না হওয়াও সবরের অংশ। এ কারণেই আল্লাহ তাঁর রাসুলকে বলেছেন, ‘সুতরাং আপনি সবর করুন, যেমন সবর করেছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসুলগণ, এবং তাদের বিষয়ে তাড়াহুড়া করবেন না।’ (সুরা আহকাফ: ৩৫)
আরও পড়ুন: নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হয় যেভাবে
নবী-রাসুলগণ বিরোধিতা, অপমান ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আপনার আগেও বহু রাসুলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে। তাঁরা মিথ্যা প্রতিপন্ন হওয়া ও কষ্ট পাওয়ার ওপর সবর করেছেন, যতক্ষণ না তাঁদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছেছে।’ (সুরা আনআম: ৩৪)
তবে সবর মানে অন্যায়কে মেনে নেওয়া নয়। ন্যায্য প্রতিকার চাওয়া বা জুলুম প্রতিহত করা সবরের বিপরীত নয়। সবরের শিক্ষা হলো প্রতিক্রিয়ায় সীমা অতিক্রম না করা।
কোরআনে সবরকারীদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে, তারা ‘মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করে।’ (সুরা রাদ: ২২) রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রকৃত বীর সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দেয়। প্রকৃত বীর সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।’ (সহিহ বুখারি: ৬১১৪)
কোরআন সবরকারীদের জন্য একাধিক সুসংবাদ দিয়েছে।
আল্লাহর সঙ্গ ও সাহায্য: ‘হে মুমিনগণ, সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা: ১৫৩)
স্থায়ী প্রতিদান: ‘তোমাদের কাছে যা আছে তা নিঃশেষ হবে, আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা স্থায়ী। যারা সবর করে, আমি অবশ্যই তাদের উৎকৃষ্ট কাজ অনুযায়ী প্রতিদান দেব।’ (সুরা নাহল: ৯৬)
জান্নাত ও ফেরেশতাদের অভ্যর্থনা: ‘তোমরা যে সবর করেছিলে, তার কারণে তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। কতই না উত্তম এই পরিণাম!’ (সুরা রাদ: ২৪)
দ্বিগুণ প্রতিদান: ‘এদের প্রতিদান দেওয়া হবে দ্বিগুণ, কারণ তারা সবর করেছে।’ (সুরা কাসাস: ৫৪)
নেতৃত্বের মর্যাদা: ‘তারা যখন সবর করল, তখন আমি তাদের মধ্য থেকে এমন নেতা বানালাম, যারা আমার নির্দেশে পথ দেখাত।’ (সুরা সাজদা: ২৪)
সবর অর্জনযোগ্য গুণও। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে সবর করতে চায়, আল্লাহ তাকে সবর দান করেন। আর সবরের চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত কোনো দান কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (সহিহ বুখারি: ১৪৬৯)
সবর কষ্টকে অস্বীকার করা নয়, আবার কষ্টের কাছে আত্মসমর্পণও নয়। এটি বিপদে স্থিরতা, প্রবৃত্তির সামনে সংযম, ইবাদতে অবিচলতা, চেষ্টায় ধারাবাহিকতা এবং রাগের মুহূর্তে আত্মনিয়ন্ত্রণের সমন্বিত রূপ।
সবরকারী কাঁদতে পারেন, দোয়া করতে পারেন, চিকিৎসা নিতে পারেন, প্রতিকার চাইতে পারেন এবং নিজের অধিকার রক্ষায় বৈধ পদক্ষেপও নিতে পারেন। তিনি শুধু বিপদের চাপে আল্লাহর প্রতি আস্থা হারান না এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেন না।
তাই সবর মানে শুধু কষ্ট সহ্য করে চুপ থাকা নয়। সবর হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিজেকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখা- বিপদে, ইবাদতে, নফসের মোকাবিলায় এবং জীবনের কঠিন সিদ্ধান্তের সময়ও।