ধর্ম ডেস্ক
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
রাগের সময় মানুষ অনেক কথা বলে ফেলে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় হয়তো কখনোই বলত না। মুহূর্তের উত্তেজনায় বলা একটি বাক্য পরে ভুলে যাওয়া সম্ভব হলেও, সেই কথা যাকে বলা হয় তার মনে দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে কাছের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া কটু কথা অনেক সময় সম্পর্কে এমন ক্ষত তৈরি করে, যা শুধু ‘সরি’ বললেই পুরোপুরি মুছে যায় না। ইসলাম মানুষের রাগকে অস্বীকার করেনি, তবে রাগের সময় জিহ্বা সংযত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
রাগের সময় মানুষ সাধারণ অবস্থার মতো শান্তভাবে চিন্তা করতে পারে না। তখন নিজের কষ্ট, ক্ষোভ বা অপমানের অনুভূতিই বেশি প্রাধান্য পায়। ফলে এমন কিছু কথা মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে।
কথার এই ক্ষত চোখে দেখা যায় না। শরীরের আঘাতের মতো এর কোনো দৃশ্যমান চিহ্নও থাকে না। কিন্তু অপমান বা কষ্টের অনুভূতি মানুষের মনে বারবার ফিরে আসতে পারে। বিশেষত কথাটি যদি কারও চেহারা, সামর্থ্য, পরিবার বা ব্যক্তিগত দুর্বলতার মতো সংবেদনশীল জায়গায় আঘাত করে, তাহলে ক্ষত আরও গভীর হতে পারে।
রাগ কমে গেলে বক্তা হয়তো কথাটি ভুলে যান, কিন্তু যিনি শুনেছেন, তাঁর কাছে তা দীর্ঘদিনের স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে। তাই ‘রাগের মাথায় বলেছি’-এই কথা ভুলের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু আঘাতের প্রভাব পুরোপুরি মুছে দেয় না।
আল্লাহ বলেন, ‘যারা সচ্ছলতায় ও অভাবে আল্লাহর পথে ব্যয় করে, যারা রাগ দমন করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহসিনদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৩৪)
আরও পড়ুন: রাগ নিয়ন্ত্রণ করলে আল্লাহ যে পুরস্কার দেবেন
রাগকে অনেকে শক্তির বহিঃপ্রকাশ মনে করেন। অথচ রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে। প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি: ৬১১৪)
কোরআনে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর একটি ঘটনাও এসেছে। তাঁর পিতা তাঁকে পাথর মেরে হত্যার হুমকি দিলে তিনি উত্তেজিত না হয়ে শান্তভাবে বলেছিলেন, ‘আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।’ (সুরা মরিয়ম: ৪৭)
আরেক আয়াতে রাগ সংবরণ ও ক্ষমা করাকে মুমিনদের গুণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (সুরা শুরা: ৩৭)
১. সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেবেন না
কেউ কষ্টের কথা বললেও রাগের মুহূর্তে পাল্টা কথা না বলাই নিরাপদ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ক্রুদ্ধ হলে সে যেন নীরব থাকে।’ (মুসনাদে আহমদ: ৬৯৩)
রাগের সময় চুপ থাকা অনেক সময় এমন একটি কথা বলা থেকে বাঁচাতে পারে, যার জন্য পরে অনুতপ্ত হতে হবে।
২. অবস্থান পরিবর্তন করুন
রাগের সময় দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়তে এবং তাতেও রাগ না কমলে শুয়ে পড়তে নির্দেশনা এসেছে। (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮২)
আরও পড়ুন: খিটখিটে মেজাজ দূর করতে নবীজির পরামর্শ
৩. আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করুন
সুলায়মান ইবনে সুরাদ (রা.) বর্ণনা করেন, দুজন ব্যক্তি ঝগড়া করছিলেন। তাঁদের একজনের মুখ রাগে লাল হয়ে গেলে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আমি এমন একটি কথা জানি, যদি সে তা বলে, তাহলে তার এই অবস্থা দূর হয়ে যাবে।’ এরপর তিনি ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতান’ পড়ার কথা বলেন। (সহিহ বুখারি: ৩২৮২)
আল্লাহ তাআলাও বলেন, ‘যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা আপনাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন।’ (সুরা আরাফ: ২০০)
৪. পরে শান্তভাবে কথা বলুন
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলে রাগ কমে যাওয়ার পর শান্তভাবে কথা বলা ভালো। তখন অভিযোগ বা অপমানের বদলে নিজের কষ্টের জায়গাটি পরিষ্কার করে বলা যায়। এতে সমস্যার সমাধানের সুযোগও বাড়ে।
৫. ভুল হলে ক্ষমা চান
রাগের সময় কষ্টদায়ক কথা বলে ফেললে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এতে বলা কথার আঘাত পুরোপুরি মুছে না গেলেও সম্পর্কের ক্ষত সারানোর পথ তৈরি হতে পারে।
রাগ সংবরণে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনে রয়েছে অসাধারণ দৃষ্টান্ত। একবার এক বেদুইন রুক্ষভাবে তাঁর চাদর ধরে টান দিয়ে কিছু দাবি করেন। এতে তাঁর গলায় দাগ পড়ে যায়। তবু নবীজি (স.) রাগান্বিত না হয়ে হেসে তাকে চাহিদামতো জিনিস দেওয়ার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি)
এক সাহাবি তাঁর কাছে উপদেশ চাইলে তিনি বারবার বলেছিলেন, ‘রাগ করো না।’ (সহিহ বুখারি: ৬১১৬)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১৮)
রাগের সময় এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেই মুহূর্তে নীরব থাকা অনেক সময় এমন একটি কথা বলা থেকে বাঁচাতে পারে, যার জন্য পরে অনুতপ্ত হতে হয়।
রাগ চলে যায়, কিন্তু রাগের সময় বলা কথা থেকে যায়। তাই রাগের মুহূর্তে জিহ্বা সংযত রাখা জরুরি। কথা বলার আগে একটু থেমে যাওয়া ও প্রয়োজনে নীরব থাকা অনেক অনুতাপ থেকে বাঁচাতে পারে।
তথ্যসূত্র: সুরা আলে ইমরান: ১৩৪; মরিয়ম: ৪৭; সুরা শুরা: ৩৭; আরাফ: ২০০; সহিহ বুখারি: ৩২৮২, ৬০১৮, ৬১১৪, ৬১১৬; আবু দাউদ: ৪৭৮২