Dhaka Mail Logo

ইসলাম

কর্মজীবীদের জন্য ছোট ছোট আমল

ধর্ম ডেস্ক

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম

কর্মজীবনের ব্যস্ততায় অনেকেরই দীর্ঘ সময় নিয়ে ইবাদত করার সুযোগ হয় না। অফিসের কাজ, যাতায়াত, মিটিং ও নানা দায়িত্বের চাপে ইবাদতের জন্য আলাদা সময় বের করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ব্যস্ততার মাঝেও এমন কিছু আমল করা যায়, যেগুলোর জন্য বাড়তি সময়ের প্রয়োজন হয় না। কাজের ফাঁকে, যাতায়াতের পথে কিংবা অবসরের কয়েক মিনিটেও এসব আমল করা সম্ভব।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত: ৫৬)

তাই কর্মব্যস্ততার মাঝেও সুযোগ অনুযায়ী আল্লাহকে স্মরণ করা এবং নেক আমলের চেষ্টা করা উচিত।

দোয়ার অভ্যাস করা

কর্মব্যস্ততার মধ্যেও নিজের প্রয়োজন, পরিবার, জীবিকা, সুস্থতা ও হেদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা যায়। কাজের ফাঁকে কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে দোয়া করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।

বিশেষ করে যাতায়াতের সময়, কাজ শুরুর আগে কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া একজন মুমিনের সুন্দর অভ্যাস হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (স.) বিভিন্ন সময় ও পরিস্থিতিতে দোয়া করেছেন এবং সাহাবাদেরও দোয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন।

আরও পড়ুন: দোয়া করার সময় ৫টি বিষয় মাথায় রাখবেন

জিহ্বা জিকিরে সজীব রাখা

কাজের বিরতি, হাঁটাচলা কিংবা যাতায়াতের সময় সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ইস্তেগফার ও দরুদ পাঠ করা যায়।

এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে আঁকড়ে ধরার মতো কোনো আমলের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘সর্বদা তোমার জিহ্বা যেন আল্লাহর জিকির দ্বারা সজীব থাকে।’ (সুনানে তিরমিজি: ৩৩৭৫)

হাদিসে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইইন ক্বাদীর’ একশবার পাঠের বিশেষ ফজিলতের কথা এসেছে। একইভাবে ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ একশবার পাঠেরও বড় ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। (সহিহ বুখারি: ৩২৯৩, ৬৪০৫)

নামাজ যথাসময়ে আদায় করা

কর্মব্যস্ততার কারণে অনেক সময় নামাজে দেরি হয়ে যায়। কেউ কেউ আবার তাড়াহুড়ো করে নামাজ আদায় করেন। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ের ফরজ।’ (সুরা নিসা: ১০৩)

তাই কর্মস্থলে দিনের শুরুতেই নামাজের সময়গুলো মাথায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় বিরতি নিশ্চিত করা উচিত। কাজের চাপ যতই থাকুক, ফরজ নামাজকে দিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করলে সময়মতো নামাজ আদায় করা সহজ হয়।

আরও পড়ুন: অফিসে সময়মতো নামাজ আদায় সম্ভব না হলে করণীয় কী

সুযোগমতো কোরআন তেলাওয়াত ও শ্রবণ

কাজের ধরন ও পরিবেশ অনুমতি দিলে বিরতির সময় কোরআন তেলাওয়াত করা যায়। তেলাওয়াতের সুযোগ না থাকলে মনোযোগ দিয়ে কোরআন তেলাওয়াত শোনাও উপকারী হতে পারে।

আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (স.) উটের পিঠে আরোহিত অবস্থায়ও কোরআন তেলাওয়াত করেছেন। (সহিহ বুখারি: ৫০৪৭)

কোরআনের একটি হরফ পাঠের বিনিময়ে দশটি নেকি পাওয়ার কথাও হাদিসে এসেছে। (সুনানে তিরমিজি: ২৯১০)

তবে কর্মস্থলে কোরআন তেলাওয়াত বা শ্রবণের কারণে যেন অর্পিত দায়িত্বে অবহেলা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

সালাম, হাসিমুখ ও উত্তম আচরণ

সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হলে সালাম দেওয়া, হাসিমুখে কথা বলা এবং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াও নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের সঙ্গে তোমার হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও তোমার জন্য সদকা।’ (সুনানে তিরমিজি: ১৯৫৬)

কর্মস্থলে সুন্দর আচরণ শুধু পারস্পরিক সম্পর্কই ভালো রাখে না, একজন মুসলিমের উত্তম চরিত্রও প্রকাশ করে।

গিবত ও অহেতুক সমালোচনা থেকে বিরত থাকা

কর্মস্থলের অবসরের আড্ডায় অনেক সময় সহকর্মীদের নিয়ে আলোচনা গিবত, পরনিন্দা কিংবা অহেতুক সমালোচনায় পরিণত হয়। তাই এমন আলোচনা থেকে নিজেকে বিরত রাখা জরুরি।

কথা বলার আগে ভেবে দেখা উচিত, কথাটি প্রয়োজনীয় ও উপকারী কি না। ভালো কথা বলা সম্ভব না হলে নীরব থাকা একজন মুমিনের জন্য নিরাপদ পথ।

আরও পড়ুন: গিবতের গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে এই ৫টি কাজ করুন

আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নেওয়া

কর্মব্যস্ততার কারণে অনেক সময় বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। অথচ আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৫)

প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কথা বলা সম্ভব না হলেও একটি ফোন কল, খোঁজ নেওয়া কিংবা প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো সম্পর্ক ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দায়িত্ব আমানতের সঙ্গে পালন করা

একজন কর্মজীবী মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। সময়ের অপচয়, কাজে ফাঁকি দেওয়া কিংবা মানুষের অধিকার নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৮৯৩)

তাই ইবাদতের পাশাপাশি কর্মস্থলের দায়িত্বও সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে। কর্মস্থলে দায়িত্বশীলতা, সততা ও আমানতদারিতাও একজন মুমিনের চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দিনশেষে আত্মজিজ্ঞাসা ও ইস্তেগফার

দিনের ব্যস্ততা শেষে ঘুমাতে যাওয়ার আগে কয়েক মুহূর্ত নিজের দিনটি পর্যালোচনা করা যেতে পারে। আজ কী ভালো কাজ করেছি, কোথায় ভুল হয়েছে, কারও সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছি কি না-এসব বিষয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা আত্মসংশোধনের একটি কার্যকর অভ্যাস। ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে ইস্তেগফার করা এবং পরদিন আরও ভালোভাবে চলার সংকল্প করা যেতে পারে।

ব্যস্ততার মাঝে দোয়া, জিকির, নামাজ ও উত্তম আচরণের মতো নেক আমল করা যায়। পাশাপাশি দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করাও ইবাদতের অংশ। ছোট ছোট আমলেই কর্মজীবন হতে পারে আরও অর্থবহ।