ধর্ম ডেস্ক
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৪ পিএম
বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই একে অপরের কিছু অভ্যাস ভালো লাগে, কিছু বিরক্তিকর মনে হয়। একজন বেশি কথা বলেন, অন্যজন স্বল্পভাষী। একজন গোছানো, অন্যজন কিছুটা স্বতঃস্ফূর্ত। একজন মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারেন, অন্যজন নিরিবিলি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এসব পার্থক্য দাম্পত্য জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা।
সমস্যা তৈরি হতে পারে তখনই, যখন একজন সঙ্গী মনে করতে শুরু করেন- জীবনসঙ্গীকে তার মতোই হতে হবে। ‘আমি যেভাবে করি, তুমিও সেভাবে করো’, ‘আমি হলে এমন করতাম না’- এ ধরনের প্রত্যাশা ধীরে ধীরে সম্পর্কে চাপ তৈরি করতে পারে। অথচ ইসলাম দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, দয়া ও পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা দিয়েছে।
আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।’ (সুরা রুম: ২১)
ভালোবাসার সম্পর্কের উদ্দেশ্য সঙ্গীর ব্যক্তিত্ব মুছে তাকে নিজের অনুরূপ করে তোলা নয়। দুজন ভিন্ন মানুষ ভালোবাসা ও দয়ার মাধ্যমে কীভাবে একসঙ্গে শান্তিপূর্ণ জীবন গড়বেন, সেটিই দাম্পত্যের সৌন্দর্য।
আরও পড়ুন: সংসারে সন্দেহ ঢুকলে যা করতে বলেছেন ইসলাম
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হলে তার অন্য একটি স্বভাব পছন্দ করবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১৪৬৯)
একজন মানুষের সব স্বভাব সঙ্গীর পছন্দের হবে-এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তাই কোনো একটি অভ্যাস অপছন্দ হলেই পুরো মানুষটিকে বদলে ফেলার চেষ্টা না করে তার ভালো দিকগুলোও দেখা প্রয়োজন।
যে বিষয়টি বিরক্তিকর মনে হচ্ছে, তার পাশাপাশি হয়তো এমন অনেক গুণ রয়েছে, যা পরিবারে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও প্রশান্তি তৈরি করছে।
কোনো আচরণ অন্যায় হলে, হারাম কাজে নিয়ে গেলে, অন্যের অধিকার নষ্ট করলে বা দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে বাধা দিলে তা সংশোধনের চেষ্টা প্রয়োজন। কিন্তু ব্যক্তিগত রুচি, স্বভাব বা বৈধ পছন্দ নিজের মতো নয় বলেই সেটিকে ভুল ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
আরও পড়ুন: স্বামী-স্ত্রী কে কোন পাশে ঘুমানো সুন্নত?
এমনকি নিজের পরিবারে যেভাবে সবকিছু হয়ে এসেছে, সেটিকেও একমাত্র মানদণ্ড ধরে জীবনসঙ্গীকে একইভাবে চলতে বাধ্য করার চেষ্টা অযথা সংঘাত তৈরি করতে পারে।
এখানে একটি প্রশ্ন কাজে আসতে পারে- ‘আমি কি সত্যিই কোনো অন্যায় সংশোধন করতে চাই, নাকি শুধু চাই সে আমার মতো হোক?’
এই পার্থক্য বোঝা গেলে দাম্পত্য জীবনের অনেক অপ্রয়োজনীয় বিরোধ এড়ানো সম্ভব
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি এক সফরে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করে একবার তাঁকে পেছনে ফেলেছিলেন। পরে আরেকবার দৌড় প্রতিযোগিতায় রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে ছাড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘এটি আগেরটির বদলা।’ (সুনান আবু দাউদ: ২৫৭৮)
দাম্পত্য সম্পর্ক শুধু দায়িত্ব পালন ও ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সম্পর্ক নয়। সেখানে হাসি, বন্ধুত্ব, আনন্দ ও পারস্পরিক স্বাচ্ছন্দ্যেরও জায়গা আছে।
সঙ্গীকে সবসময় ‘সংশোধন করার মানুষ’ হিসেবে দেখলে সম্পর্কের এই স্বাভাবিক বন্ধুত্বের জায়গাটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।’ (সুরা নাহল: ১২৫)
আয়াতটি দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের সাধারণ নীতি তুলে ধরে। সেই নীতির আলোকে দাম্পত্য জীবনেও কোনো ভুল নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা ও সুন্দর পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সংশোধনের প্রয়োজন হলেও অপমান, কটূক্তি বা বারবার তুলনা না করে সম্মানজনকভাবে কথা বলা উচিত। সবার সামনে সঙ্গীর ভুল তুলে ধরা কিংবা অন্যের সঙ্গে তুলনা করা অনেক সময় সংশোধনের চেয়ে ক্ষোভই বাড়িয়ে দেয়।
দাম্পত্যে কোনো বিষয় নিয়ে আপত্তি থাকলে সেটি কীভাবে বলা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই কথা সম্মানের সঙ্গে বলা হলে যে ফল হতে পারে, অপমানের সঙ্গে বললে তার ফল সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
দাম্পত্যের সৌন্দর্য দুজনের হুবহু এক হয়ে যাওয়ায় নয়, ভিন্নতা নিয়েও একে অপরকে সম্মান ও বোঝার মধ্যে। জীবনসঙ্গীকে নিজের প্রতিচ্ছবি বানানো নয়, ভালোবাসা ও দয়ার সঙ্গে একে অপরের শান্তি, সহায়তা ও প্রশান্তির কারণ হয়ে ওঠাই দাম্পত্যের লক্ষ্য।
তথ্যসূত্র: সুরা রুম: ২১; সুরা নাহল: ১২৫; সহিহ মুসলিম: ১৪৬৯; আবু দাউদ: ২৫৭৮