ধর্ম ডেস্ক
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম
হিজরতের ইতিহাসে গারে সওরের ঘটনা মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহ (স.) ও হজরত আবু বকর (রা.) এই গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁদের গারে সওরে অবস্থানের ঘটনা পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
তবে গারে সওরকে ঘিরে আরও একটি ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। বলা হয়, গুহায় প্রবেশের পর আবু বকর (রা.) গর্তগুলো বন্ধ করে দেন। একটি গর্তে নিজের পা রাখলে সেখানে থাকা একটি সাপ তাঁকে দংশন করে। ব্যথায় তাঁর চোখ দিয়ে পানি পড়লেও রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে ভেবে তিনি নড়াচড়া করেননি- এমন বর্ণনাই বিভিন্ন জায়গায় প্রচলিত।
প্রশ্ন হলো, সাপের দংশনের এই ঘটনা কতটা নির্ভরযোগ্য?
আবু বকর (রা.)-কে গারে সওরে সাপে দংশনের একটি বর্ণনা ইমাম বায়হাকি তাঁর ‘দালাইলুন নুবুওয়াহ’ গ্রন্থে সংকলন করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, গুহায় প্রবেশের পর আবু বকর (রা.) একটি গর্তে নিজের পা রাখেন। গর্তে থাকা সাপ তাঁকে দংশন করলে তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে। রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং আল্লাহ তাঁদের সঙ্গে আছেন বলে আশ্বস্ত করেন। (বায়হাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ: ২/৪৭৬-৪৭৭)
আরও পড়ুন: আরাফাতের ময়দান: যেখানে মানুষ শুধুই বান্দা
তবে এই বর্ণনার সনদ নিয়ে হাদিসবিশারদদের আপত্তি রয়েছে। এর সূত্রে থাকা কয়েকজন রাবির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে এটিকে সহিহ বর্ণনা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
মুহাম্মাদ ইবনুস সাইয়িদ দরবেশ হূত তাঁর ‘আসনাল মাতালিব’ গ্রন্থে গারে সওর নিয়ে প্রচলিত কয়েকটি অতিরিক্ত ঘটনার সমালোচনা করেছেন। সেখানে আবু বকর (রা.)-কে সাপে দংশনের ঘটনাসহ কিছু বর্ণনাকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই সতর্ক অবস্থান হলো- সাপের দংশনের ঘটনাটি কিছু পুরোনো গ্রন্থে বর্ণিত হলেও সহিহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। এটিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা বা সহিহ হাদিস হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
সাপের দংশনের বর্ণনার সঙ্গে সময়ের সঙ্গে আরও কিছু কাহিনি যুক্ত হয়েছে। কোথাও গুহার নির্দিষ্ট গর্ত বন্ধ করার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। আবার কোথাও সাপটির সঙ্গে নবীজি (স.)-এর সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা কিংবা আরও কিছু বিস্ময়কর ঘটনার কথা বলা হয়।
আরও পড়ুন: হিজরতের রাতের নীরব নায়ক আলী (রা.)-এর কোরবানি
এসব অতিরিক্ত কাহিনির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই দুর্বল সূত্রে বর্ণিত একটি ঘটনাকে পরবর্তী সময়ে যুক্ত হওয়া বিভিন্ন গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে হিজরতের নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরা সমীচীন নয়।
সাপের ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও গারে সওরের মূল ঘটনা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন তারা দুজন গুহায় ছিল, তখন সে তার সঙ্গীকে বলেছিল, তুমি চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা তাওবা: ৪০)
সহিহ হাদিসেও রাসুলুল্লাহ (স.) ও আবু বকর (রা.)-এর হিজরতের সময় গারে সওরে অবস্থানের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা সেখানে তিন রাত অবস্থান করেন। এ সময় অনুসরণকারীরা গুহার কাছাকাছি পৌঁছে গেলে আবু বকর (রা.) আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তারা নিচের দিকে তাকালে তাঁদের দেখে ফেলতে পারে। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে বলেন। (সহিহ বুখারি: ৩৯০৫)
ইসলামের ইতিহাসের কোনো ঘটনা মানুষের কাছে যতই আবেগময় ও জনপ্রিয় হোক, তা বর্ণনার ক্ষেত্রে সূত্রের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে নবীজি (স.) ও সাহাবিদের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ঘটনা বলার সময় সহিহ, দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনার পার্থক্য জানা প্রয়োজন।
আবু বকর (রা.)-এর মর্যাদা ও রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা প্রমাণের জন্য সাপের এই গল্পের প্রয়োজন নেই। হিজরতের পুরো যাত্রায় নবীজি (স.)-এর সঙ্গী হওয়া এবং বিপদের মুহূর্তে তাঁর পাশে থাকাই তাঁর ত্যাগ ও মর্যাদার বড় প্রমাণ।
তাই গারে সওরের সাপের ঘটনাটি উল্লেখ করতে হলে সেটিকে সহিহ হাদিসে প্রমাণিত ঘটনা নয়, দুর্বল সূত্রে বর্ণিত একটি ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করাই অধিক সতর্ক। আর গারে সওরের নিশ্চিত শিক্ষা হলো- বিপদের মুহূর্তেও আল্লাহর ওপর আস্থা হারানো যাবে না।
তথ্যসূত্র: সুরা তাওবা: ৪০; সহিহ বুখারি: ৩৯০৫; বায়হাকি, ‘দালাইলুন নুবুওয়াহ’: ২/৪৭৬-৪৭৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/২২৩; সিলসিলাতুজ জায়িফাহ: ৩/৩৩৯